আস্থার ঋণে ধরাশায়ী সিটি ব্যাংক

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: খেলাপি ঋণসহ পাওনা আদায়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেভেন বি অ্যাসোসিয়েটসের ড্রেজার নিলামে তুলছে সিটি ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির কাছে সুদাসলে সিটি ব্যাংকের মোট পাওনা ৮৮ কোটি ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫৯৭ টাকা। অথচ বন্ধকি ড্রেজার দুটি নিলামে বিক্রি করলে ৪০ কোটি টাকাও পাওয়া যাবে না বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর পারিবারিক মালিকানাধীন রাইজিং গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেভেন বি অ্যাসোসিয়েটস। সিটি ব্যাংক সূত্রমতে, বিশ্বাসের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ দেওয়া হয়েছিল। তবে সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করায় তা খেলাপি হয়। আবার পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় পাওনা আদায় নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
প্রতিষ্ঠানটির কাছে সিটি ব্যাংকের চলতি মাসের ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুদাসলে পাওনা মোট ৮৮ কোটি ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫৯৭ টাকা। আর গত এক বছরের বেশি সময় ধরে পাওনা পরিশোধ করেননি প্রতিষ্ঠান পরিচালকরা। ফলে বন্ধকিতে থাকা দুটি ড্রেজার নিলামে বিক্রির প্রস্তুতি নেয় সিটি ব্যাংক। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্য নিলামে বিক্রির তারিখ নির্ধারণ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আর এ নিলাম কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে সিটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের চতুর্থ তলায় স্পেশাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন বিভাগে।
ড্রেজার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এফএমসি শিপইয়ার্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ১৫০ টন ও ৫০ টন ওজনের দুটি ড্রেজারের বর্তমান ক্রয়মূল্য (নতুন হলে) সর্বোচ্চ হবে ৫০ কোটি টাকা। আর নিলামে ওঠা ড্রেজারগুলো যদি ভালো থাকে, তাহলে বর্তমান মূল্য কোনোভাবেই ৩৫ কোটি টাকার বেশি হবে না। এছাড়া ড্রেজার যদি কয়েক বছর অপরিচালন অবস্থায় থাকে, তাহলে এতে অনেক ঝামেলা দেখা দিতে পারে। একই কথা বলেন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা।
এ প্রসঙ্গে সিটি ব্যাংকের চট্টগ্রাম এরিয়া ও করপোরেট ব্যাংকিং হেড কায়েস চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সাধারণত স্টকের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হয়। এ বিশ্বাস গ্রাহক নষ্ট করলে তো কিছুই করার থাকে না। এ প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে দুটি ড্রেজার বন্ধক দেওয়া আছে।’
দুটি ড্রেজার দিয়ে ব্যাংকের পাওনা আদায় সম্ভব কি নাÑএমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘হবে না। তবে উনার বাড়িটাও বন্ধকিতে আছে। সহায়ক বন্ধকি সম্পত্তি দিয়ে তো পুরো ঝুঁকি কমানো যায় না।’
সূত্র জানায়, কয়েক বছরের ধারাবাহিক লোকসান, মামলা ও ঋণভারে বিপর্যস্ত রাইজিং গ্রুপ। এ গ্রুপের প্রধান ব্যবসা ছিল ইস্পাতশিল্প ও জাহাজভাঙা শিল্প। কয়েক বছর ধরে এ খাত দুটিতে ধস দেখা দেওয়ায় গ্রুপটির অবস্থাও খারাপ হয়ে যায়। এছাড়া একের পর এক ঋণখেলাপি ও রাজনৈতিক মামলায় গ্রুপের কর্ণধাররা ব্যবসায় সময় দিতে পারছেন না। ফলে ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে পুরো গ্রুপটিই লোকসানে পড়ে। এরই মধ্যে গ্রুপটির জাহাজভাঙা, রি-রোলিংসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রুপটির বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বকেয়া ঋণ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে রাইজিং স্টিলের কাছে সাউথইস্ট ব্যাংকের পাওনা ১৪৯ কোটি টাকা, একই গ্রুপের মেসার্স সেভেন বি অ্যাসোসিয়েটসের কাছে পূবালী ব্যাংকের পাওনা ২১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, রাইজিং স্টিল লিমিটেডের কাছে এবি ব্যাংকের ৩২৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, রাইজিং স্টিলের কাছে ইসলামী ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১০৫ কোটি টাকা এবং লার্ক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেডের কাছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের (আইআইডিএফসি) ১৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা পাওনা। এছাড়া গ্রুপটির কাছে লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ও ট্রাস্ট ব্যাংকসহ ১০-১২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা রয়েছে। এসব পাওনা আদায়ে দেড় বছরে অনেক প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতে মামলা করে।
এদিকে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার হয়ে গত বছরের মে থেকেই কারাগারে আছেন আসলাম চৌধুরী। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় বেশকিছু ব্যাংকের করা মামলা ঝুলে আছে এ শিল্প গ্রুপটির কর্ণধারদের বিরুদ্ধে। নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ ফেরত না পাওয়ায় পাওনাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ায় আত্মগোপনে রয়েছেন ওই পরিবারের অন্যান্য সদস্য; যার প্রভাব পড়েছে গ্রুপটির ব্যবসায়ও। দীর্ঘদিন ধরে লোকসান ও তদারকির অভাবে এরই মধ্যে এ গ্রুপের অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে জানতে রাইজিং গ্রুপের পরিচালক আমজাদ হোসাইন চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। রাইজিং গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: কনফিডেন্স লবণ, কনফিডেন্স শু ফ্যাক্টরি, রাইজিং অ্যাডভান্সড স্টিল মিলস লিমিটেড, রাইজিং স্টিল লিমিটেড, সোনালী শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড স্টিল লিমিটেড, সেভেন বি অ্যাসোসিয়েটস (শিপইয়ার্ড), অ্যাকোয়া ফুড লিমিটেড, ফিশ প্রিজারভার লিমিটেড ও কনসেপশন সি ফুড লিমিটেড, সোনালী সিএনজি লিমিটেড, চলমান সিএনজি লিমিটেড, পতেঙ্গা রি-ফুয়েলিং ও রাইজিং সিএনজি রি-ফুয়েলিং প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।