আয়কর আদায় ও ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন

আমাদের রাজস্ব আয়ের বড় একটি খাত আয়কর। প্রতিবছরই আয়কর আদায় বাড়াতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এজন্য ২০১০ সাল থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়কর মেলার আয়োজন করছে। আজ থেকে চলতি বছরের মেলাটি শুরু হচ্ছে। এর শুরুর বছর দুটি স্টলে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সেবা নেয়; কর আদায় হয় ১১৩ কোটি টাকা। গত বছর ১৬৭ স্টলে সেবা নিয়েছেন ১১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৯ জন; রাজস্ব আয় হয়েছে দুই হাজার ২১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এ মেলা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে বলা চলে।
আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া আয়কর মেলা নিয়ে গতকালের শেয়ার বিজে ‘সপ্তাহব্যাপী আয়কর মেলা শুরু আজ’ শিরোনামে খবর ছাপা হয়েছে। এতে বলা হয়, আগামী ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানী ছাড়াও সব বিভাগীয় শহরে মেলা চলবে। এছাড়া জেলা শহরে চার দিন, ৩২ উপজেলায় দু’দিন ও ৭০ উপজেলায় একদিন ভ্রাম্যমাণ আয়কর মেলা অনুষ্ঠিত হবে। বিষয়টি ইতিবাচক বটে। প্রতি বছরই মেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সহজে রিটার্ন দাখিল ও আয়কর প্রদানের সুযোগ পাচ্ছে। সব উপজেলায় এ আয়োজন করা গেলে আরও করদাতা নিবন্ধিত হতেন বৈকি। এতে বাড়তি রাজস্ব আয়েরও একটা স্থায়ী বন্দোবস্ত হতো। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি গুরুত্বসহ বিবেচনা করবেন আশা করি।
মেলায় ব্যাপক সাড়া মিললেও সার্বিক আয়কর আদায় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে হতাশার চিত্রও কিন্তু রয়েছে। এবার করদাতাদের উৎসাহ ও স্বীকৃতি প্রদানের অংশ হিসেবে ১৪১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘ সময় আয়কর প্রদানকারী করদাতা ট্যাক্স কার্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৭-১৮ করবছরে ৫১৫ করদাতাকে দেওয়া হয়েছে সম্মাননা। এতে একটি বিষয় আবার স্পষ্ট, প্রতি বছর শীর্ষস্থানীয় করদাতার তালিকায় ঘুরেফিরে একই ব্যক্তি স্থান পাচ্ছে। এ তালিকার বাইরের অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কিন্তু বেশ পরিচিত ও অধিক মুনাফা অর্জনকারী বলে ধারণা। বারবার এ চিত্র সামনে এলেও এর সুরাহা কিন্তু হচ্ছে না। যারা প্রশ্নবিদ্ধ আয় করেন, তাদের মধ্যে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতাও বেশি। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কর্মরত, এমনকি স্বল্প আয়ের মানুষ নিয়মিত কর দিয়ে চলেছে। এক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। এজন্য করদাতাদের সম্মাননার পাশাপাশি কর ফাঁকি দেওয়াদের তালিকা করে তা প্রকাশ এবং তাদের কর প্রদানে বাধ্য করতে হবে। সে সঙ্গে বকেয়া করও আদায় করতে হবে।
যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের বাইরে আরও অনেকেরই কিন্তু আয়কর প্রদানের যোগ্যতা রয়েছে। তাদের উৎসাহিত করতে কর প্রদান ব্যবস্থা আরও সহজ করতে হবে। এক্ষেত্রে অনলাইন কিংবা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। এছাড়া কর আদায়ে নিয়োজিত এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ বিস্তর। কর প্রদান করতে গিয়ে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। এগুলো বন্ধ করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেই বিশ্বাস। মনে রাখা দরকার, ফাঁকি রোধের পাশাপাশি করদাতার সংখ্যা বাড়ানো গেলে তা হবে স্থায়ী রাজস্ব আয়ের একটি ব্যবস্থা।
অবশ্য যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, বিনিময়ে তারা কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যয় এবং অপচয়েরও অভিযোগ রয়েছে। এর অবসান না হলে এবং কাক্সিক্ষত সেবা না পেলে জনগণ কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হতে পারে। বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকার আরও সতর্ক ও ন্যায়সংগত অবস্থান গ্রহণের পাশাপাশি করের অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করবে বলেই আমরা আশা করি।