আয়কর আহরণে আরও উদ্যোগী হোক এনবিআর

‘দ্বিতীয় দিনেও মেলায় ভিড়: ৫৫১ কোটি টাকা আয়কর আহরণ’ শিরোনামে গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত প্রতিবেদন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। এতে বলা হয়, করদাতা ও সেবাগ্রহীতাদের ভিড় এবং পদচারণে মেলা ছিল উৎসবমুখর। মুক্তিযোদ্ধা, নারী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ করদাতাদের জন্য ছিল আলাদা বুথ। করদাতাদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন রুটে ১৫টি শাটল বাসের ব্যবস্থা করা হয়। গত দুবছর ধরে কেন্দ্রীয়ভাবে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্মীয়মাণ রাজস্ব ভবনে মেলা অনুষ্ঠিত হলেও এবার হচ্ছে বেইলি রোডে অফিসার্স ক্লাব প্রাঙ্গণে।
আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ভিত্তিতে আয়কর আদায় করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে আয়কর নিয়ে সাধারণ মানুষের ভীতি ও অনীহা রয়েছে। রয়েছে অজ্ঞতাও। এ অবস্থায় রাজস্ব প্রদানে সর্বসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর বিভিন্ন পর্যায়ে আয়কর মেলার আয়োজন করছে এনবিআর।
বুধবার মেলার দ্বিতীয় দিনে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আয়কর মেলায় করদাতাদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। কোনো রকম হয়রানি ছাড়াই নির্ভয়ে ও স্বাচ্ছন্দ্যে রিটার্ন জমা দিয়ে রসিদ নিচ্ছেন তারা। আয়কর দিতে গিয়ে কেউ যেন কোনো প্রকার ভীতির সম্মুখীন না হন, সে বিষয়ে সর্বদা সচেতন থাকতে আয়কর কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন তিনি।
উন্নত দেশগুলোয় স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই আয়কর দেয় করযোগ্য ব্যক্তিরা। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ কর প্রদান থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। এর দায় অবশ্য এড়াতে পারে না এনবিআর। আয়কর মেলায় যে ধরনের সেবা দেন এনবিআর কর্মীরা, বছরের অন্য সময় তেমন নিবেদিতপ্রাণ নন তারা।
প্রতিবছরই নিয়মিত ও যথানিয়মে সর্বোচ্চ কর দেওয়ায় নির্দিষ্ট সংখ্যক করদাতাকে পুরস্কৃত ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয়। তবে এ তালিকায় সেরা বলে পরিচিত ব্যবসায়ীদের নাম সাধারণত থাকে না। যারা কর দেন, তারাও ঠিকমতো কর দেন না বলে আলোচনা রয়েছে। আবার নিয়মানুযায়ী আবেদন করেও কর্মকর্তাদের খুশি না করে করদাতা শনাক্তকরণ সংখ্যা (টিআইএন) পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
আয়করকে বলা হয় জাতীয় উন্নয়নের অক্সিজেন। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহে এনবিআর বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের মোট কর-রাজস্বের ৫০ শতাংশের বেশি আয়করের মাধ্যমে আহরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশের বেশিরভাগ মানুষকে করজালে নিয়ে আসার জন্য করনীতিও পরিবর্তন করা হয়েছে। কর না দিলে দণ্ড, জরিমানা, বেতন বন্ধসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ধনাঢ্যরা আয়কর প্রদানে আইনজীবী ও কর বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেন। আয়কর বিভাগের সঙ্গে দেন-দরবার করেন আইনজীবী ও কর বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ পেশাজীবী ও কর্মজীবীদের অবশ্য সে সুযোগ নেই। এনবিআর কর্মী বা এ বিষয়ে জানাশোনা লোকদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় তাদের।
আয়কর প্রদানে জটিলতা ও হয়রানি চলতে থাকায় আয়কর বন্ধের পক্ষেও কথা বলছেন অনেকে। তারা বলছেন, সরকারি-আধা সরকারি কর্মচারীরা সরকার প্রদত্ত নানা সুবিধা পায়; যেমন পেনশন সুবিধা সম্প্রসারণ, গৃহঋণের আয়োজন এবং তা কম সুদে। বিনা পয়সার গাড়ির ব্যবস্থাও হয়েছে। কিন্তু দুই লাখ ৫০ হাজার এক টাকা যাদের বার্ষিক আয়, তাদের অবশ্যই কর দিতে হবে, যদিও ন্যূনতম হারে।
আয়কর প্রদানে জটিলতা ও বৈষম্যে ক্ষুব্ধ অর্থনীতিবিদ ড. আর এম দেবনাথ তো প্রশ্ন তুলেছেন ‘কী হয় আয়কর তুলে দিলে?’ তার যুক্তি, করযোগ্য সবাই কর দেয় না। ভ্যাট, শুল্ক ফাঁকিও দেওয়া হচ্ছে বিপুল। তাই আয়কর তুলে দিলেই সুবিচার প্রতিষ্ঠা হয়।
আয়কর মেলায় উপচেপড়া ভিড় দেখে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কারণ নেই। আয়কর আহরণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে, এমনটি মনে করার যুক্তিও নেই। এর একটা বড় কারণ, মেলায় যে সেবা দেন এনবিআর কর্মীরা, অফিসে তেমন সেবা পাওয়া যায় না তাদের কাছ থেকে। মানুষ যাতে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কর দেন, সে লক্ষ্যেই নিবেদিত হতে হবে এনবিআরকে।