আয়কর প্রদান ও অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হোক

প্রতি বছরের মতো এবারও শীর্ষ করদাতার তালিকা প্রকাশ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তিন ক্যাটেগরিতে ট্যাক্স কার্ড পাচ্ছেন ১৪১ সেরা করদাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। অন্যবার যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ তালিকায় ছিল, এবারও ঘুরেফিরে তারাই। অথচ তালিকার বাইরের অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বেশি পরিচিত ও অধিক মুনাফা অর্জনকারী বলেই ধারণা। বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন থেকেও এর প্রমাণ মেলে। এক্ষেত্রে তাদের নাম তালিকায় না আসাটা বরাবরের মতোই বিস্ময়ের। হতাশার ব্যাপার হলো, বারবার ঘটলেও এর রহস্য উম্মোচন হচ্ছে না। আয়কর আমাদের রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। আহরিত এ অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
গতকালের শেয়ার বিজে ‘আবারও শীর্ষ করদাতা কাউছ মিয়া’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়, ব্যবসায়ী ক্যাটেগরিতে আবারও শীর্ষ করদাতার স্বীকৃতি পাচ্ছেন তামাক ব্যবসায়ী কাউছ মিয়া। এটি নতুন খবর নয়। ক’বছর ধরেই এ-সংক্রান্ত তালিকা প্রকাশের পর তিনি খবরের শিরোনাম হচ্ছেন। এ জন্য তিনি অবশ্য সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কথা হলো, কাউছ মিয়া শীর্ষ করদাতা হলেও তার থেকে বেশি ধনী ও আয় করা ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠান দেশে আরও রয়েছে। তাদের নাম তালিকায় আসছে না, যা কাম্য নয়। যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে কর দিচ্ছে না, তাদের চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশেরও সময় এসেছে মনে হয়। এতে আয়কর সম্পর্কে সচেতনতা আরও বৃদ্ধি পাবে। দেশে অবশ্য তরুণ করদাতার সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। রাজস্ব খাতে এটা দীর্ঘ মেয়াদে ভালো ফল দেবে।
কর প্রদানে দেশের অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানেরই খারাপ সংস্কৃতি অনুসরণের নজির রয়েছে। তাদের নিয়ে গণমাধ্যমে প্রায়ই প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছে না। গ্রাহকের কাছ থেকে ভ্যাট নিয়েও যেমন পরিশোধ করা হচ্ছে না, নিজেদের আয়করও যথাযথভাবে দিচ্ছে না তারা। বিভিন্ন ধরনের কর আমাদের রাজস্ব আয়ের এক একটি উৎস। কিন্তু এসব যদি ঠিকমতো পরিশোধ করা না হয়, তাহলে তা দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করবে। অবশ্য কর প্রদানে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের নির্দিষ্ট আয়ের ব্যক্তিরা বেশ এগিয়ে। যারা প্রকৃত আয়ের তথ্য গোপন করেন, তাদের অনিয়মের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতাও বেশি। এ পন্থা পরিহার করে তারা সঠিকভাবে আয়কর প্রদান করবেন বলে আমরা আশা করব।
সঠিকভাবে আয়কর আদায়ে এনবিআরের দায় রয়েছে। যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে আয়কর প্রদান করছে না; চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি তাদের কর প্রদানে বাধ্য করতে হবে সংস্থাটিকে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেরও আয়কর প্রদানের যোগ্যতা রয়েছে। তাদেরও উৎসাহিত করতে হবে। এমন লক্ষ্য অর্জনে কর প্রদান ব্যবস্থা আরও সহজ করা যেতে পারে। তাহলে আরও অনেকে কর দিতে উৎসাহিত হবেন। আগের তুলনায় কর প্রদান অবশ্য সহজ ও উৎসবমুখর হয়েছে, এটা বলা যায়। তবে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ বিস্তর। এটি কমাতে পারলে কর আদায় পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে বিশ্বাস।
নিয়মিত কর জুগিয়ে গেলেও এর বিনিময়ে নাগরিকের সেবা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন রয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয়ের অভিযোগ তো দীর্ঘদিনের। এটা চলতে থাকলে জনগণ কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হবে বা অন্তত নতুনদের আগ্রহী করা যাবে না। বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকার আরও সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করবে বলে আমরা আশা করি।