ইউরোপীয় পণ্যে ট্রাম্পের শুল্কারোপে নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধের শঙ্কা

শেয়ার বিজ ডেস্ক : ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো থেকে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে শুল্ক বসিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), মেক্সিকো ও কানাডাও পাল্টা শুল্কারোপের পরিকল্পনা করছে। ইইউ ইতোমধ্যে মার্কিন পণ্যের একটি তালিকা করেছে, যার ওপর পাল্টা শুল্কারোপ করবে তারা। এ তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হার্লে ডেভিডসন মোটরসাইকেল থেকে খাদ্যপণ্যও রয়েছে। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) অভিযোগ করার পরিকল্পনাও করেছে ইইউ। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধের দামামা আবার বাজতে শুরু করল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মার্চেই আমদানি করা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামে শুল্কারোপের কথা ঘোষণা করেছিলেন। মধ্যস্থতার মাধ্যমে চাইলে কোনো কোনো দেশকে ছাড় দেওয়া যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়ে ইইউ, মেক্সিকো, কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশের ওপর তা কার্যকর করতে কিছু সময়ের জন্য স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী উইলবার রস জানান, কানাডা, মেক্সিকো ও ইউরোপের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় স্থগিতাদেশের মেয়াদ আর বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। গতকাল শুক্রবার থেকেই ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামজাত বিভিন্ন পণ্য রফতানিতে শুল্ক দিতে হবে বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।
প্রতিবেদনমতে, যেসব পণ্যের ওপর শুল্ক বসছে তার মধ্যে ধাতবপাতে মোড়ানো ইস্পাত, সø্যাব, কয়েল, অ্যালুমিনিয়াম রোল, টিউবসহ উৎপাদন, নির্মাণ ও তেলশিল্পে ব্যবহার করা কাঁচামাল রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলে যে কোনো সময় যে কারও ওপর থেকে এই শুল্ক প্রত্যাহার বা কমাতে পারেন বলেও জানিয়েছেন রস।
ট্রাম্প প্রশাসনের এ ঘোষণার পর ইইউ, মেক্সিকো, কানাডাসহ বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে। মার্কিন কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরাও মিত্রদেশগুলোর ওপর বাড়তি শুল্ক চাপানোর সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া এ সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন দেশ ও জোটগুলো এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক বসানোরও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মার্কিন শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় আগামী ১ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত, দই, হুইস্কি ও রোস্টেড কফির মতো ভোগ্যপণ্যের ওপর পাল্টা শুল্কারোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। মেক্সিকোর অর্থ মন্ত্রণালয়ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ইস্পাতের ওপর শুল্ক বসানোর চিন্তা করছে। শূকরের মাংস, আপেল, আঙ্গুর, ব্লুবেরি ও পনিরও ওই তালিকায় থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে তারা।
ইইউ যেসব মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্কারোপের চিন্তা করছে তার মধ্যে ঢালাই লোহা থেকে শুরু করে শিম পর্যন্ত নানা ধরনের পণ্যের দীর্ঘ তালিকা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অভিযোগ দায়েরেরও ঘোষণা দিয়েছে ২৮টি ইউরোপীয় রাষ্ট্রের এই জোট।
মার্কিন প্রশাসনের শুল্কারোপের ঘোষণার পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ফোনে ডোনাল্ট ট্রাম্পকে এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর ‘যথোপয্ক্তু জবাব দেবে’ বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্প বলছেন, মার্কিন ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদকরা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা তাদের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে বলেই আমদানিতে শুল্ক বসাতে হচ্ছে। ট্রাম্পের এই যুক্তি উড়িয়ে দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। তিনি বলেন, কানাডাকে এখন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করছে, এটা অবিশ্বাস্য।
ব্রিটেনের বাণিজ্যমন্ত্রী লিয়াম ফক্স বলেছেন, আমদানি করা ইস্পাতে যুক্তরাষ্ট্র যে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে তা ‘স্পষ্টতই অদ্ভুত’। ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে ‘সংরক্ষণবাদ’ হিসেবেও অ্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। আমরা যদি আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রর সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে পাল্টাপাল্টির পথে হাঁটি, তাহলে তা খুবই দুঃখজনক হবে।
মেক্সিকোরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজ ভিদেগারাই বলেছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। বাণিজ্য, অভিবাসন, নিরাপত্তাসহ সব বিষয়েই মেক্সিকো নিজের স্বার্থ রক্ষায় সম্ভাব্য সবকিছু করবে বলেও মন্তব্য তার।
যুক্তরাষ্ট্র গত বছর ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্য আমদানি করেছিল, যার প্রায় অর্ধেকই (২৩ বিলিয়ন ডলার) এসেছিল ইইউ, কানাডা ও মেক্সিকো থেকে। এ কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত মার্কিন আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের।