ইউরোপের নিষেধাজ্ঞায় দুবছরে বিমানের ক্ষতি ১৪০ কোটি টাকা

এয়ার কার্গোতে রফতানি

জাকারিয়া পলাশ ও হামিদুর রহমান: বন্দরের দুর্বল অবকাঠামোর কারণে সমুদ্রপথে পণ্য রফতানিতে রয়েছে নানা সমস্যা। এ কারণে ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে বিমানে পণ্য রফতানি বাড়ছে। তবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে পণ্যবাহী কার্গো বিমান সরাসরি যুক্তরাজ্যে পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। পরে জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়াও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে আকাশপথে বাংলাদেশের পণ্যবাহী কার্গো বিমান তৃতীয় কোনো দেশের বিমানবন্দরে স্ক্যান করে লন্ডনে পাঠাতে হতো। এ নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ বিমানের প্রায় ১৪০ কোটি টাকার আয় কমেছে বলে জানা গেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রকাশনা পলিসি ইনসাইটসের এক নিবন্ধে এ-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া হয়েছে। ‘এয়ার কার্গো ও বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য’ শীর্ষক এ নিবন্ধে পিআরআইয়ের গবেষক আজমিনা আজাদ বলেছেন, সমুদ্রপথের চেয়ে আকাশপথের রফতানিতে ১১ থেকে ২০ গুণ বেশি খরচ হয়। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দ্রুত পণ্য পাঠানোর জন্য রফতানিকারকরা এয়ার কার্গো ব্যবহার করেন। বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে পণ্য রফতানি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ২০১৭ সালে ইউরোপে ৮৮ হাজার টন তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে। ২০১৬ সালে রফতানি হয়েছে ৮৫ হাজার টন, যা আগের বছর ছিল ৬৬ হাজার টন। এছাড়া সবজি ও খাদ্যদ্রব্যসহ পচনশীল পণ্য রফতানিতে আকাশপথের বিকল্প নেই।
কিন্তু ২০১৬ সালের ৮ মার্চ নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে যুক্তরাজ্য ঢাকা থেকে লন্ডনে সরাসরি পণ্যবাহী উড়োজাহাজ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর কিছুদিন পরই জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়াও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেয়। ফলে রফতানি কাজে ব্যবহার করা এয়ার কার্গোগুলো তৃতীয় কোনো দেশের বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং (তল্লাশি) করার পর লন্ডনে পাঠাতে হচ্ছিল। এতে করে প্রতি কেজিতে গড়ে দুই ডলার করে খরচ বেড়েছিল। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ফেড-এক্স কর্তৃপক্ষও এ কারণে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে চার্জ বাড়িয়েছিল। হিসাব অনুযায়ী শুধু তৈরি পোশাক খাতের এয়ার কার্গোগুলো তৃতীয় দেশে স্ক্রিনিংয়ের জন্য দুই বছরে প্রায় ৩০ লাখ ডলার ব্যয় বাড়িয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ বিমান। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এয়ারকার্গোর ব্যবসা থেকে ২৪৪ কোটি টাকা আয় করেছিল। এর আগেরবার ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ খাতে বিমানের আয় ছিল ৩১৫ কোটি ডলার। সে হিসাবে শুধু ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিমানের আয় কমেছে ৭১ কোটি টাকা। পরে ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও ইউরোপে কার্গো বিমানে রফতানির পরিমাণ প্রায় সমান ধরে হিসাব করলে ৭০ কোটি টাকার বেশি লোকসান হয়েছে বিমানের। সব মিলিয়ে নিষেধাজ্ঞার দুই বছরে বিমানের লোকসান প্রায় ১৪০ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি (১৮ মার্চ) এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ফলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এরই মধ্যে এয়ার কার্গো সরাসরি লন্ডনে যাওয়া শুরু করেছে বলে বাংলাদেশ বিমান সূত্র জানিয়েছে। এয়ার কার্গো সেবায় এ অগ্রগতির ফলে দ্রুত ক্ষতি কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানি এখানও এ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়নি।
জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক শাকিল মেরাজ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের যুক্তরাজ্যে সরাসরি পণ্য পাঠানোর সুযোগ বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পণ্য রফতানিতে ব্যবসায়ীদের বাড়তি খরচ করে বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর, হংকং, থাইল্যান্ড বা দুবাই হয়ে যুক্তরাজ্যে পণ্য পাঠাতে হয়েছে। ফলে বিমানের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় বিমানে সরাসরি কার্গো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদিও অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানি এখনও প্রত্যাহার করেনি, তবে আশা করছি খুব দ্রুতই তারা প্রত্যাহার করবে। বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই।’
প্রসঙ্গত, নিষেধাজ্ঞা জারির পর যুক্তরাজ্যের পরামর্শে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০১৬ সালের মার্চেই একটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান রেডলাইন অ্যাসিউর্ড সিকিউরিটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। এ-সংক্রান্ত অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষিতে গত মাসে ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘২০১৬ সালে সিদ্ধান্তটি আমাদের নিতে হয়েছিল। কারণ আমরা জানতাম পণ্য পরিবহন কত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। কিন্তু সে সময় সন্ত্রাসীদের তরফ থেকে একটি বাস্তব ঝুঁকি ছিল। তারা বিশ্বের বহু জায়গাতেই বিমানে বোমা পেতে রেখেছিল। আমাদের মতো বাংলাদেশের সরকারও সে সময় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রয়োজনটি বুঝতে পেরেছিল। এটা আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া ছিল, কিন্তু আজ আমরা লক্ষ্যে পৌঁছেছি।’