ধারাবাহিক

ইনট্রিনসিক ভ্যালু, বুক ভ্যালু ও বাজারদর

মিজানুর রহমান শেলী: প্রতিবেদন লেখার প্রয়োজনে যদিও বার্কশায়ার তার বুক ভ্যালু প্রকাশ করছে। আবার একটি ইনট্রিনসিক ভ্যালুও সেখানে উল্লেখ করছে। কিন্তু এটা সঠিক নয়। এমনকি এর কোনো পর্যাপ্ততাও আমরা দেখি না। এক কথায়, এটি একটি খসড়া কথা। চূড়ান্তভাবে ইনট্রিনসিক ভ্যালু নির্ধারণ করা যেমন সম্ভব নয়, আবার বুক ভ্যালু দিয়ে সব ধরনের কাজের সুরাহাও সম্ভব হয় না। এ জন্যই প্রতিবেদনটিকে অনেকের কাছেই একটি গল্প বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটা আসলে প্রয়োজনের তাগিদে করতে হয়। এর কোনো বিকল্প থাকে না। তবে একটি কথা সত্য যে, এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে একজন চৌকস ও জ্ঞানী বিনিয়োগকারী কিংবা কোনো ম্যানেজার বা কোনো বিশ্লেষক ঠিকই বুঝতে পারেন বার্কশায়ারের সম্ভাব্য ইনট্রিনসিক বিজনেস ভ্যালু আসলে কত। তারা মনে মনে একটি খসড়া হিসাব কষে নিতে পারেন। অর্থাৎ ইনট্রিনসিক ভ্যালু সামনের দিনগুলোয় বার্কশায়ারের জন্য ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সে বিষতে তারা একটি মানসিক পরিকল্পনা দাঁড় করাতে পারেন। হ্যাঁ, এ কথাটিকে আবার অন্যভাবেও বলা যেতে পারে, কোনো নির্দিষ্ট বছরের কোনো কোম্পানির বুক ভ্যালুর শতকরা হারের পরিবর্তন সম্ভবত ওই কোম্পানির ইনট্রিনসিক ভ্যালুর বার্ষিক পরিবর্তনের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে থাকে। আর এটা খুব যৌক্তিকভাবেই ধারণা করা যেতে পারে; কিংবা এটিকে একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়াও বলা যেতে পারে। ইনট্রিনসিক ভ্যালু আর বুক ভ্যালু অবশ্য এখানে অন্যায্য উপায়ে কাছাকাছি অবস্থানে স্থির হয়, তা নয়। বরং তারা একটি যৌক্তিক সামঞ্জস্য বজায় রেখেই এই সাদৃশ্য প্রদর্শন করে থাকে।
হ্যাঁ, এখানে একটি অফুরন্ত সুযোগ থাকে যে, আপনি যদি একটু চিন্তাশীল হয়ে থাকেন এবং কিছু না কিছু জ্ঞান লাভ করতে চান, তবে ইনট্রিনসিক ভ্যালু আর বুক ভ্যালুর মধ্যকার পার্থক্য নিয়ে ভাববেন। এই ভাবনা আপনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি দিতে সক্ষম হবে। এ জন্য আপনাকে বিনিয়োগের যে কোনো একটি প্রকরণের দিকে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করতে হবে। এটাকে অবশ্য আপনি একটি প্রশিক্ষণও বলতে পারেন। অন্তত কলেজ স্তরের একটি জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ এখানে দেওয়া সম্ভব। আপনি নিশ্চয়ই এখানে একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করবেন।
ধরুন আপনার পড়ালেখার খরচই হলো এখানে আপনার ‘বুক ভ্যালু’। আর এ খরচটি যদি আপনি খুব সূক্ষ্মভাবে বা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হিসাব করে বের করতে পারেন, তবে এখানে আপনি আপনার আয় বা লভ্যাংশও খুঁজে পাবেন। কেননা, শিক্ষার্থী এখানে তার আর্থিক লাভের কথা চিন্তা করেনি। সে কোনো চাকরি করতে যায়নি। আর্থিক সুবিধাকে পরিত্যাগ করে সে এ সময়টাকে নিজের কলেজে ব্যয় করেছে। এটা তার নির্বাচনী সুবিধা। এ সুবিধাটি সে না নিলে আর্থিক কোনো কারবারে গিয়ে সে ঠিকই আয় করতে পারত। তাহলে এই অর্থ বা মূল্য এখানে নিশ্চয়ই রয়েছে। সেটাকে খুঁজে নিতে হবে।
একইভাবে এ ধরনের চর্চার প্রয়োজনে আমরা নিশ্চয়ই পড়ালেখার গুরুত্বপূর্ণ অ-অর্থনৈতিক সুবিধা বা লাভকে এড়িয়ে চলব। কিন্তু আমরা এর আর্থিক মূল্যের দিকে গভীর দৃষ্টি দিতে থাকব।
প্রথমেই আমরা হিসাব করব একজন স্নাতক ডিগ্রিধারীর সারা জীবনের আয়ের ওপর। এ হিসাবটি নিশ্চয়ই একটি আনুমানিক বিষয়। তবে তার সারা জীবনের আয় থেকে পড়ালেখা চলাকালে যে আয় করেছে, সে আয়কে বিয়োগ করব। কেননা, এই আয় করতে গিয়ে সে তার পড়ালেখায় সময় দেয়নি। পড়ালেখায় এখানে একটি অভাব বা ঘাটতি ঘটে গেছে। হ্যাঁ, আর যদি এটাকে আমরা যুক্ত করি, তবে সেটা হবে আমাদের সার্বিক হিসাবের খাতায় একটি অতিরিক্ত হিসাবের খাতা। তাই এ হিসাবটাকে অতিরিক্ত হিসেবে আলাদা করে রাখাই যৌক্তিক বলে মনে হয়। তাই যে কোনো উপায়েই হোক, একজন শিক্ষার্থীর সার্বিক আয়ের পরিধি থেকে ওই আয়টিকে খুঁজে খুঁজে যে কোনোভাবেই হোক, বাদ দিতে হবে। তাহলেই কেবল ওই শিক্ষার্থীর জীবনের সঠিক মুনাফা হার খুঁজে বের করা সম্ভব হবে। তা না হলে কোনোভাবেই সেই হার বের করা সম্ভব নয় বা তার জীবনের বুক ভ্যালু নির্ণয় সম্ভব নয়। আর এটা করতে গেলে অবশ্যই আমাদের ওই শিক্ষার্থীর স্নœাতক শ্রেণির পড়ালেখা চলাকালের জীবনে ফিরে যেতে হবে। সেখানে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। যাহোক, এখানে এসে প্রাসঙ্গিকতার ধারাবাহিকতায় উল্লেখ করছি ডলারের ফলই হলো একজনের শিক্ষার ইনট্রিনসিক আর্থিক মূল্য।
এক্ষেত্রে যে কোনো শিক্ষার্থী হয়তো তার পড়ালেখার জীবনের বুক ভ্যালু আর ইনট্রিনসিক ভ্যালু বের করার প্রচেষ্টা চালাবে। সে খুব সহজেই খুঁজে পাবে তার শিক্ষাজীবনের বুক ভ্যালু ইনট্রিনসিক ভ্যালুকে ছাড়িয়ে গেছে। শুধু ছাড়িয়েই যায়নি বরং তা অতিমাত্রায় ছাড়িয়ে গেছে বহুদূর। এর মানে হলো, আজকের দুনিয়ায় পড়ালেখা হয়ে গেছে ব্যববহুল। আর সে তুলনায় তার আর্থিক মূল্য খুবই সামান্য। পড়ালেখা করে একজন শিক্ষার্থী যে বিনিয়োগ করছে বা সে যা যা কিছু পরিশোধ করছে, তার কাছে পরবর্তী জীবনে যে যা আয় করছেÑসে আয়ের কোনো মূল্য তুলনাযোগ্য নয়। একেবারেই মূল্যহীন বা সীমিত। এমনকি বলা চলেÑসে তার ব্যয় করা অর্থের মূল্যটাও ফিরে পায় না। এখানেই শেষ নয়। এ বিষয়টির আরও অনেক মাত্রা রয়েছে, সেদিক দিয়ে এটাকে মূল্যায়ন করার প্রয়াস পায়। কখনও কখনও দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থীর পড়ালেখার বুক ভ্যালুর চেয়ে তার শিক্ষাজীবনের ইনট্রিনসিক ভ্যালু অনেক বেশি। এটি কার্যত ছেড়ে যায় বহুদূর। এ ফলটি আবার মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, মূলধন খুব সুবিবেচনাভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে ব্যাপৃত বা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আর সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বুক ভ্যালুটি যা আমরা পরিষ্কারভাবে হিসাব কষে বের করে ফেলতে পারছি, সেই অঙ্ক বা হিসাবের কোনো অর্থ হয় না। কেননা, তার তেমন কোনো কার্যকারিতা নেই। এটা যেন অর্থহীন। এটা কেবল তার ইনট্রিনসিক ভ্যালুর একটি নির্দেশক।
আমি এখানে একটি মজাদার হিসাবরক্ষণ সংক্রান্ত তামাশা ব্যক্ত করতে চাই: এটা হলো আমাদের নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলের প্রতিবেদনের সঙ্গে বিশেষ কিছু কোম্পানি, যেখানে আমাদের স্থায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ হোল্ডিংস রয়েছে; সেসব কোম্পানির আর্থিক ফলের প্রতিবেদনের পার্থক্য। এই হোল্ডিংসগুলোর বাজারমূল্য নিতান্ত কম নয় বরং তা দুই বিলিয়ন ডলারের চেয়ে অনেক বেশি। তথাপিও সেসব হোল্ডিংস থেকে এখন অবধি আমাদের বা বার্কশায়ারের আয় হচ্ছে মাত্র ১১ মিলিয়ন ডলার। আর এটা নিশ্চয়ই ১৯৮৭ সালের বার্কশায়ারের ট্যাক্স পরিশোধ করার পরের আয়ের প্রতিবেদনের সমান।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ

সর্বশেষ..