ধারাবাহিক

ইনট্রিনসিক ভ্যালু, বুক ভ্যালু ও বাজারদর

মিজানুর রহমান শেলী: একটি মজাদার হিসাবরক্ষণ-সংক্রান্ত তামাশাই একে বলতে হবে। আমাদের নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলোর বার্ষিক আয় বা আর্থিক ফলাফলে প্রতিবেদন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ হোল্ডিংসে মালিকানাপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনের মধ্যকার পার্থক্য আসলেই আমাদের অবাক করেছে। আমরা আসলেই বর্তমানে আমাদের ব্যবসার পরিধিকে বাড়িয়ে নিতে পেরেছি। আমরা আমাদের ব্যবসার জীবনের শুরুতে যে সফলতা পেতাম, তা ওই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আসলেই ছিল স্বস্তিকর এবং আরামদায়ক। আমরা সে সময় অনেক প্রশংসাও কুড়িয়েছি বটে। কিন্তু দিনে দিনে অবস্থার এত বেশি পরিবর্তন হয়ে গেছে, আমাদের আগের দিনের সফলতার মানদণ্ডকে আজকের দিনে কোনোভাবেই মানদণ্ড হিসেবে নিতে পারি না। আমাদের সামান্য শেয়ার কেনা কোম্পানি থেকেই আজ যে পরিমাণ লাভ করি তা সেই সময়ের সার্বিক ব্যবসার সফলতার চেয়ে ঢের বেশি।
হিসাবরক্ষণের একটি আইন বা কানুন রয়েছে। এটা খবরদারি করতে বেশ পটু। এটা সব সময়ের জন্য আমাদের নজরদারির মধ্যে রেখে দেয়। দেখে, আমাদের আয়ের খাত কোথায়। তারা এটা নিশ্চিত করতে চাই যে, আমরা যেন সব সময়ের জন্য ডিভিডেন্ড থেকে আয় করি। আর এ ডিভিডেন্ড বলতে যেসব কোম্পানিতে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ স্থায়ী শেয়ার রয়েছে সেসব কোম্পানি আমাদের ইচ্ছামাফিক, যা দেয় তাকে বোঝানো হয়েছে।
কিন্তু তারা সার্বিক ব্যবসায় যে লাভ করছে তাতে করে পুরোপুরি হিসাব-নিকাশ করে যে পরিপূর্ণ আয় হয় তার সমানুপাতিক পরিমাণকে বোঝায় না। অর্থাৎ ডিভিডেন্ড হিসাব করে যা হয় তার পরিপূর্ণ অর্থ আমরা নিতে পারি না। আমরা কেবল ওই কোম্পানি আমাদের প্রাপ্য ডিভিডেন্ড থেকে যে পরিমাণ অর্থ ইচ্ছে করে, পরিশোধ করে তা পেয়ে থাকি। এটা একেবারে ন্যূনতম আয়ের সীমারও নিচে। উল্লেখ্য, এই সামান্য আয়ও আজকের দিনে এত বেশি, যা ১৯৮৭ সালের সার্বিক ব্যবসার আয়ের চেয়ে অনেক কম।
অর্থাৎ ১৯৮৭ সালে আমরা ১০০ মিলিয়ন ডলারের মতো সার্বিক আয় করতাম। আর আজকের দিনে ওইসব শেয়ারের কোম্পানিগুলো আমাদের তার চেয়ে ঢের বেশি পরিশোধ করছে। অন্যদিকে আমরা আরও কিছু বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই: হিসাবরক্ষণের এই নীতিমালা আমাদের ক্যারিং ভ্যালুও নির্ধারণ করে দেয়। তারা মূলত সেসব কোম্পানি বা ব্যবসার ক্যারিং ভ্যালু নির্ধারণ করেন, যেগুলো কোনো না কোনো বিমা কোম্পানির মালিকানায় চলে। তারা যেভাবে নির্ধারণ করেন সেভাবেই চলতে হয়। উল্লেখ্য, এ বিষয়টি অবশ্যই আমাদের ব্যালান্স শিটে উল্লেখ করতে হবে। এর বিকল্প নেই। বিশেষ করে আমাদের বর্তমানের বাজারদরের যে দশা তার ভিত্তিতে এটি উল্লেখ না করলে নানান সংকট তৈরি হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, হিসাবরক্ষণের এসব নীতিমালা আমাদের মেনে চলে কী লাভ হচ্ছে? আমরা এর কি পরিণতি উপভোগ করছি। অবশ্য পাঠকের মনে যে কোনো উপায়েই এই প্রশ্ন আশা স্বাভাবিক। তবে যেসব ম্যানেজার ও বিনিয়োগকারী চিন্তাশীল এবং শিখতে চাই নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের জন্য এই প্রশ্নের পেছনে ছোটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তাদের জন্য বলতে চাই। হ্যাঁ, এখানে কিছু না কিছু ফলাফল রয়ে যায়: এখানে আমি আবার জিএএপি অ্যাকাউন্টের কথা নিয়ে আসতে চাই। জিএএপি অ্যাকাউন্ট আমাদের নেট সম্পদের ওপর প্রতিবিম্ব তৈরি করে দেয়। এটা আমাদের যে কোনো ব্যবসার জন্য যুগোপযোগী আন্ডারলাইয়িং ভ্যালু। সাধারণত আমরা এগুলোর আংশিক মালিকানা গ্রহণ করে থাকি। কিন্তু এটা কখনও আমাদের আন্ডারলাইয়িং আয়ের ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। কার্যত তারা আমাদের আয়ের অ্যাকাউন্টে কোনো ধরনের আন্ডারলাইয়িং আয়ের প্রভাব দেখায়নি।
এই গেল আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারে মালিকানাধীন কোম্পানি, যেখানে আমাদের স্থায়ী অবস্থান রয়েছে, সেসব কোম্পানি থেকে আমাদের আয়ের হিসাবের কথা। এসব কোম্পানি থেকে আয়ের ক্ষেত্রে আমাদের হিসাবরক্ষণ নীতিমালা আমাদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, তা নিয়ে কথা হলো। এমনকি এই নীতিমালা আমাদের দিকনির্দেশনাও দিয়ে থাকে। এবার আমরা আমাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানির বিষয় উল্লেখ করব। এই কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এ কথায় বলতে গেলে বলতে হবে এতক্ষণ যে চিত্র আমরা অবলোকন করলাম তার ঠিক বিপরীতটা। এখানে আমাদের কোনো বাধা নেই। আমরা যা কিছু আয় করি তার পুরোটাই আমাদের আয়ের অ্যাকাউন্টে দেখা যায়। আমরা তার পুরোটাই আমাদের আয়ের অ্যাকাউন্টে রেখে দিই এবং তা খোলাখুলিভাবেই প্রদর্শন করে থাকি। কিন্তু আমরা কখনোই আমাদের সম্পদকে পরিবর্তন করি না। বিশেষ করে আমি এখানে আমাদের সম্পদের মূল্যের কথা বলছি। সম্পদের এই মূল্যমান আমরা কোনো পরিবর্তন না করেই আমাদের ব্যালান্স শিটে প্রদর্শন করে থাকি। এটা বিষয় না যে, একটি ব্যবসার মূল্য কত? আমরা যে সময় থেকে এই ব্যবসাটি কিনে থাকি তারপর থেকে এটার দাম বাড়তেও পারে আবার কমেও যেতে পাারেÑসেটা কোনোভাবেই আমাদের ব্যালান্স শিটে উপস্থাপনের সময় প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। সত্যটাই এখানে উপস্থাপিত হয়ে থাকে।
এখানে আমাদের একটি রুগ্ণ মানসিকতার বিষয়ও রয়েছে। বিশেষ করে হিসাবরক্ষণের বিষয়টি এখন একটি সিজনফ্রেনিয়ার মতো রূপ লাভ করেছে। এই সিজনফ্রেনিয়ার প্রতি আমাদের মানসিক কৌশল হলো, আমরা জিএএপি অঙ্ককে এড়িয়ে চলতে চাই। আর আমরা কেবল আমাদের ভবিষ্যৎ আয়ের সক্ষমতাকেই গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে উপস্থাপন করতে চাই। এমনকি কেবল এই ভবিষ্যৎ আয় সক্ষমতার বাইরে আমরা আর কোনো কিছুই উপস্থাপন করতে চাই না। তবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, তা আমরা আমাদের শেয়ার মালিকানা কোম্পানির ক্ষেত্রে বা নিজস্ব মালিকানা কোম্পানির ক্ষেত্রে শুধু করব; আসলে তা নয়। আমরা এই উভয় ধরনের কোম্পানির ক্ষেত্রেই একই নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠা করব। এই কৌশলটি ব্যবহার করে, আমরা আমাদের নিজেদের মতো নিজেদের আবিষ্কৃত ব্যবসায় মূল্য ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আর সে কাজটি আমরা অবশ্যই করব। আর এ ক্ষেত্রে আমরা অবশ্য আমাদের এই কৌশলকে অ্যাকাউন্টিং ভ্যালু থেকে পৃথক রাখব। এই অ্যাকাউন্টিং ভ্যালু বলতে আমি আমাদের নিয়ন্ত্রিত কোম্পানির বইয়ে উল্লিখিত ভ্যালুকে বুঝিয়েছি। এমনকি আমরা সেসব ভ্যালু থেকেও আমাদের এই কৌশলকে স্বাধীন রাখতে চাই যে, সব ভ্যালু আমাদের আংশিক অংশীদারি কোম্পানিতে কখনও কখনও বোকামি বাজার হিসেবে উঠে আসে। আমাদের আবিষ্কৃত এই ব্যবসা ভ্যালুটি এমন এক ভ্যালু, যা আমার একটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে বাড়িয়ে নেওয়ার আশা রাখি। অথবা কখনও কখনও অন্যায্য কিছু যদি চলে আসে সেটাকে নির্বাচনী কৌশলের মধ্যে রাখব। এই ন্যায্যতা হলো একটি হার, যা সামনের বছরগুলোর জন্য নির্ধারিত হয়ে থাকে।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহাম।
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ।

সর্বশেষ..



/* ]]> */