ধারাবাহিক

ইনট্রিনসিক ভ্যালু, বুক ভ্যালু ও বাজারদর

মিজানুর রহমান শেলী: ব্যবসায় মূল্য আর বাজারদরের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক থাকা চায়। এই সম্পর্ক সাধারণত সব ট্রেডেড কোম্পানির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ তেমন কোনো কোম্পানিই একটানা দীর্ঘদিনের সফলতা দেখাতে পারার ইতিহাস নেই। কিন্তু বার্কশায়ার এখানে ব্যতিক্রম। বার্কশায়ারের এই সফলতা কেবল বার্কশায়ারের নয়। বরং তা সব মালিক ও শেয়ারহোল্ডারদের গর্বের বিষয়। বিনিয়োগকারীদের এখানে কৃতজ্ঞ হওয়ার কিছু রয়েছে। যৌক্তিকতা বা ন্যায্যতাই হলো এই সফলতার গোপনীয়তা। এটা শৃঙ্খলাকে নির্দেশ করে থাকে। নিয়মানুবর্তিতাই পারে একটি সফলতাকে দীর্ঘায়িত করতে। তাছাড়া কখনও কখনও সফলতা হাতে ধরা দিলেও স্থায়ীত্ব লাভ করে না।
যাােহক আমাদের এই সফলতা যে কোনো বিনিয়োগকারীকেই আকৃষ্ট করে থাকে। বিনিযেগে উৎসাহ জুগিয়ে থাকে। এক কথায় তা বিনিয়োগ বান্ধব।
এই সফলতাটি নিশ্চয় বিরল। একঝাঁক তরুণ শেয়ারহোল্ডারদের হাত ধরেই মূলত এই ঐতিহাসিক সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এর সঙ্গে আমরা একটি বিরল ডেমোগ্রাফিক্স বা জনমিতিও অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি:
চোখের দেখায় মনে হয় আমাদের সব শেয়ারহোল্ডারই ব্যক্তিক, কোনোভাবেই তারা কোনো ইনস্টিটিউশনের সঙ্গে জড়িত নয় কিংবা কোনো ইনস্টিটিউশনাল আচরণ তাদের নেই। কিন্তু এরকম একটি কাঠামো আর অন্য কোনো পাবলিক কোম্পানিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে আমাদের মতো এমন একটি আকারে কোনো কোম্পানি এমনটি দাবি করতে পারে না। এমন কোনো নিদর্শন নেই।
যাহোক, এবার আমি এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় বেন গ্রাহামের কথায় আসতে চায়। তিনি ৪০ বছর আগে আমাদের একটি গল্প শুনিয়েছিলেন। এই গল্পটির মূল কথা ছিল, এমন যে একটি বিনিয়োগকারী পেশাদার কেন এমন আচরণ করে, যে আচরণ আমরা বার্কশায়ারের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আমরা পাচ্ছি। যাহোক, গল্পটাতে আসা যাক:
একজন তেলের খনি অনুসন্থানকারী ঘুরছিলেন আর ঘুরছিলেন। তিনি কোনো স্বর্গীয় কিছু পেয়ে যাবেন এমন নেশায় চারদিকে ঘুরছিলেন। হঠাৎ একদিন তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সেইন্ট পিটারের। সেইন্ট পিটার তাকে কোনো ভালো খবর দিলেন না। বরং একটি খারাপ খবরের মুখোমুখি হতে হলো তাকে।
সেইন্ট পিটার বলেলেন, ‘তুমি এখানে বসবাস করার যোগ্য। কিন্তু তুমি দেখতে পাচ্ছ, এই আবাসিক এলাকাটি কোনো তেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী মানুষের জন্য উš§ুক্ত নয়। তুমি এখানে স্বাধীনভাবে তোমার এই কাজ করতে পারবে না। আর এই আইন এখানে জোরালোভাবে মেনে চলা হয়। এর বাইরে তোমাকে যাওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই, খোলা থাকবেও না।’ লোকটি তখন চিন্তুায় পড়ে গেলেন। তিনি এক মুহূর্তের জন্য বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন। এরপর তেল অনুসন্ধানকারী এই লোক প্রশ্ন করলেন, যদি আমি এখানকার বর্তমান অধিবাসীদের মাত্র চারটি শব্দ বলি। তবে কি তিনি থাকতে পারবেন? এই প্রস্তাবটি সেইন্ট পিটারের কাছে বেশ যুতসই মনে হলো। মনে হলো এই চারটি শব্দ বললে এখানে তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা কিংবা কোনো ক্ষতির কারণ সৃষ্টি হবে না। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার হাত বাড়িয়ে দিলেন আর চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘এই জাহান্নামেও আজ তেল আবিষ্কার হলো’।
সঙ্গে সঙ্গে সেই আবাসিক এলাকার সিংহ দোয়ার খুলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তেল অনুসন্ধানকারী লোকটি তার দলবল নিয়ে এক যোগে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেতরে প্রবেশ করতে থাকল। এমনকি নি¤œ অঞ্চলগুলোর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার জন্য দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলল। সেইন্ট পিটার এসব কিছু দেখেশুনে খুবই অভিভূত হয়ে গেলেন। তারপর সেইন্ট পিটার আবারও ওই তেল অনুসন্ধানকারীকে আমন্ত্রণ করলেন, যাতে করে তিনি ভেতরের কোনো জায়গায় অবস্থান নেন এবং নিজেকে একটু আরামদায়ক জায়গায় মানিয়ে নিতে পারেন। তেল সন্ধানকারী এরপর বিশ্রাম নিলেন।
এরপর তিনি লোকটি বললেন, না আমাকে এখানে আরাম করলে চলবে না। বরং আমাকে অধিবাসীদের মধ্যে যেতে হবে। তাদের তরুণ বালকদের সঙ্গে আমার কথা বলতে হবে এবং যত সব গুজব আমাকে দূর করতেই হবে। আসলে যা কিছু রটে তার কিছুটা হলেও বটে।
এবার ১৯৯৫ সালের একটি দিকে যেতে চাই। এ সময় বার্কশায়ারের বিভিন্ন শেয়ার ৩৬ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছিল। আমি আপনাদের বলি:
১. সাম্প্রতিক সময়ে বার্কশায়ারের অর্জিত বাজার মূল্য তার অর্জিত ইনট্রিনসিক ভ্যালুকেও অতিক্রম করে গেছে। এমনকি এরপরে যত অর্জন এসেছে তা আরও বেশি বেশি সন্তুষ্টি বয়ে এনেছে। এখানে যেন যত দিন গেছে তত বেশি সন্তুষ্টি আমাদের অভিভূত করে গেছে। ২. এটা একটি উচ্চ মানের কর্মনৈপুণ্য। কিন্তু এই কর্মনৈপুণ্য কি দিনের পর দিন কোনো কাঠামো বা শৃঙ্খলা ছাড়াই চলতে পারে? এর সহজ জবাব দেওয়া যায় এভাবে যে না সফলতার নিয়ত ধারা বজায় রাখতে গেলে অবশ্যই আমাদের শৃৃঙ্খলা ও কাঠামোগত চর্চা ধরে রাখতে হবে। এই শৃঙ্খলার একটি সংজ্ঞায়ন থাকা চায়। ৩. চার্লি আর আমি এমন কোনো পরিস্থিতিতে পড়িনি বা পড়তে হয়নি যে পরিস্থিতিতে বার্কশায়ার অধঃমূল্যায়িত হয়েছে।
এর পেছনে কারণ কী? এর একমাত্র কারণ হলো, এই অর্জন ও অর্জনকে ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখার জন্য আমি কিছু আশঙ্কার জায়গা খুঁজে বের করি। এরপর সেই আশঙ্কা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু সতর্কতা জারি করি। এ সতর্কতা ছিল এক ধরনের শৃঙ্খলা। এর ফলে আমরা কী দেখলাম? আমরা দেখলাম নিয়ত ধারায় বার্কশায়ারের ইনট্রিনসিক ভ্যালু বাড়তে থাকল। এই প্রবৃদ্ধিটা স্বাভাবিক কোনো হিসাব মেলে ধরেনি। বরং এই হিসাব বা অঙ্কটি ছিল নিয়ত ধারায় সামনের দিকে বেড়ে চলা গতি। আর একটি বড় পরিসরের পরিধি নিয়ে ছড়িয়ে পড়া। কিন্তু অবাক হতে হয় এ সময় আমাদের বাজারদরের চেহারা দেখে। কেননা, যে কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গেই তার বাজারদর বেড়ে চলার হিড়িক পড়ে যায়।
কিন্তু আমাদের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এমন কোনো চরিত্র কেউ অবলোকন করেনি। বরং এই দীর্ঘ সময়ের প্রবৃদ্ধির ঢেউয়ে আমাদের বাজারদরের একেবারে সামান্য কিছু পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। কিন্তু বাজারদরের এই পরিস্থিতি দেখলে যে কেউ অনুমান করবেন যে, নিশ্চয় বার্কশায়ার ১৯৯৬ সালে একটি কর্মনৈপুণ্যতায় পিছিয়ে পড়েছিল। তারা হয়তো নিজেদের যোগ্যতাকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।
কিন্তু তা নয়। বরং আমরা ইচ্ছে করেই বাজারদরের শৃঙ্খলা বজায় রেখেছি শক্ত হাতে। আর এ কারণেই আজ অবধি আমাদের দাম ও মূল্যের মধ্যে একটি উত্তম সম্পর্ক বজায় রয়েছে। এমনকি দাম ও মূল্য কিন্তু কোনো বছরেই স্থির থাকেনি। সব সময়েই বা সব বছরেই তাতে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সম্পর্ক খুব কাছাকাছি অবস্থান করেছে। আর চার্লি ও আমি এই শৃঙ্খলাকে হদয় থেকে ভালোবাসি।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহাম।
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ।

সর্বশেষ..



/* ]]> */