প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ইসলামি ব্যাংকিং তত্ত্বাবধানে প্রয়োজন পৃথক ডেপুটি গভর্নর

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের পরিসর অনেক বেড়েছে। প্রথাগত অনেক ব্যাংকের তুলনায় ভালো করছে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলো। কিন্তু সে তুলনায় শরিয়াহ্ভিত্তিক নীতি-সহায়তাও পর্যাপ্ত নয়। এই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দক্ষ জনবলও গড়ে উঠছে না। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নির্দিষ্ট একজন ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে দেশের শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম তত্ত্ব¡াবধায়নের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে ‘ইসলামিক ব্যাংকিং অপারেশনস অব ব্যাংকস’ শীর্ষক বার্ষিক পর্যালোচনা কর্মশালায় বক্তারা এ পরামর্শ দেন।
কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং বিআইবিএম নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। সব ধরনের কমপ্লায়েন্স বজায় রেখে এবং শরিয়াহ্র মূল নীতি বজায় রেখে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, সব শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক বা শাখায় শরিয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে শরিয়াহ্ বোর্ড করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উম্মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। এ সময় তারা বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ২৫ শতাংশ দখল শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর হাতে। অথচ নীতিসহায়তার ক্ষেত্রে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। প্রথাগত ব্যাংকগুলো যেভাবে শাখা সম্প্রসারণ করতে পারে, ইসলামী ব্যাংকগুলোকে সেভাবে দেওয়া হয় না। দীর্ঘদিন ধরে সুকুক চালুর দাবি জানানোর পর সম্প্রতি আংশিকভাবে সেটা চালু হয়েছে। এ কারণে বক্তারা দেশের শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নির্দিষ্ট একজন ডেপুটি গভর্নরকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ও অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। তিনি ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধির চেয়ে কমপ্লায়েন্সের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করার জন্য ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেন।
কর্মশালায় বক্তারা প্রথাগত ব্যাংকের কর্মীদেরও শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার পরামর্শ দেন। তারা শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার জন্য বিশেষ সার্টিফিকেশন কোর্স চালু করার পরামর্শও দেন। এসব সার্টিফিকেটধারী অভিজ্ঞ ব্যাংকার পদোন্নতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ পাবেন। বক্তারা শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও লক্ষ রাখার পরামর্শ দেন।
এক্সিম ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া বলেন, ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শরীয়াহ্ পুরোপুরি মেনে চলতে হবে। এখানে আংশিক পরিপালনের সুযোগ নেই। তিনি ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর জোরারোপ করেন।
কর্মশালায় গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক মো. আলমগীর। এ সময় তিনি বলেন, দেশে আটটি ব্যাংক পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামি ব্যাংকিং করছে। এছাড়া প্রথাগত ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং শাখা ও ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে আমানতের দিক দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলো কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। ২০১৭ সালে এ খাতের আমানতের ৯৫ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ ছিল পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর দখলে। ২০১৮ সালে সেটা কমে ৯৪ দশমিক ২২ শতাংশ হয়।
গবেষণায় আরও দেখানো হয়, ইসলামি ব্যাংকগুলোর ঋণ বা বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার অনেক ওপরে রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ আমানত অনুপাত (আইডিআর) ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আমানতে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করেছে ৯৮ টাকা। তবে প্রথাগত ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং শাখার আইডিআর ৮২ শতাংশ এবং উইন্ডোগুলোর আইডিআর ছিল ৭৯ শতাংশ।
ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আইডিআর নির্ধারণ করে দিয়েছে ৮৯ শতাংশ।
গবেষণা দলে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন বিআইবিএমের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মহব্বত হোসেন, বিআইবিএমের সহকারী অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ এবং এক্সিম ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব শরিয়াহ্ সেক্রেটারিয়েট আবুল কাশেম মো. সাইফুল্লাহ।
অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন বিআইবিএমের মুজাফফর আহমেদ চেয়ার প্রফেসর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা, বিআইবিএমের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব, পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি প্রমুখ।
পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং সর্বজনীন ব্যাংকিং। পুরো বিশ্বে ইসলামি ব্যাংকিং সমাদৃত। ইসলামি ব্যাংকিং হলো সম্পদভিত্তিক অর্থনীতি। সেন্ট্রাল শরিয়াহ্ কাউন্সিল মেনে নিয়ে ইসলামি ব্যাংকিং পরিচালনা করতে হবে। ইসলামিক ব্যাংকিংয়ে আরও নতুন নতুন পণ্য এনে গ্রাহকদের কাছে আরও জনপ্রিয় করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি বলেন, ইসলামিক ব্যাংকিং এখন ধর্মীয় বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ নেই। অনেক বিদেশি ব্যাংক ইসলামিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে সাফল্য পেয়েছে। সুতরাং দক্ষতার সঙ্গে ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের সুযোগ রয়েছে।

সর্বশেষ..