ইস্পাত খাতে আগ্রাসীবিনিয়োগ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: বর্তমানে দেশের ছোট-বড় আড়াইশ মিলের ইস্পাত পণ্য উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ টন। এর বিপরীতে বছরে চাহিদা ৫০ লাখ টনের মতো। গত কয়েক বছরে এ খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধিও হয়নি, কিন্তু আগাম সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তারা ইস্পাত কারখানা সম্প্রসারণ ও নতুন নতুন মিল স্থাপনে আগ্রাসী বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে পড়েছেন। তবে বাজার চাহিদা ও বিনিয়োগ সঠিকভাবে কাজে লাগানো না গেলে এ খাতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি ছোট ছোট ইস্পাত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ছোট উদ্যোক্তারা।
ইস্পাতশিল্পে মূলত দুই ধরনের পণ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে আছে ফ্ল্যাট স্টিল (সিআই শিট ও সিআর কয়েল) এবং লং স্টিল (এমএস রড/টিএমটি বার)। এ খাতে সক্রিয় আড়াইশ’রও বেশি প্রতিষ্ঠান। তবে দেশের মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশি মেটায় শীর্ষ পাঁচ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হলো আবুল খায়ের স্টিল, বিএসআরএম, কেএসআরএম, জিপিএইচ, আরএসআরএম।
তথ্যমতে, একক কোম্পানি হিসেবে ইস্পাত খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের স্টিলস রি-রোলিং মিলস। লং স্টিলে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১৪ লাখ টন। এছাড়া বিএসআরএম গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন ১৪ লাখ টন। আর দেশের অন্যতম বৃহত্তম কবির স্টিল রি-রোলিং (কেএসআরএম) মিলের বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা আট লাখ মেট্রিক টন, রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস (আরএসআরএম) লিমিটেডের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা এক লাখ ৮৭ হাজার টন এবং জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা এক লাখ ২০ হাজার টন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে দেশের ইস্পাতের বাজার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত ৪০ শতাংশ চাহিদার নেপথ্যে রয়েছে সরকারের উন্নয়নযজ্ঞ। এদিকে বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ মেট্রিক টন হলেও এখন পর্যন্ত চাহিদা প্রায় অর্ধেক। তবে আগামীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল, ছোট-বড় সেতু, শিল্প স্থাপনাসহ অনেক প্রকল্পের কাজে গতি আসবে। এছাড়া মেট্রোরেল ও পদ্মা সেতুর কাজ চলছে। এতে মাথাপিছু রডের ব্যবহার ২৬ কেজি থেকে ৫০ কেজিতে উন্নীত হবে। এছাড়া আবাসন খাত চাঙা এবং ভারতের সেভেন সিস্টার রাজ্যগুলোতে রফতানি বাড়লে ২০৩০ সালে ইস্পাতের চাহিদা দাঁড়াবে এক কোটি ৮০ লাখ টনে। এতে ইস্পাতশিল্পের প্রবৃদ্ধি পাঁচ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সুযোগ আছে।
এ সম্ভাবনাগুলো মাথায় রেখে বছর দুয়েক আগে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বড় ধরনের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে কাজ শুরু করে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড। এতে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। সব ঠিক থাকলে এ প্লান্টটি ২০১৯ সালের মার্চ মাসে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাবে। এতে এমএস বিলেটের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ১০ লাখ আট হাজার টনে। আর এমএস রডের উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে সাত লাখ ৬০ হাজার টনে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা যায়, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কুনমিং আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি লিমিটেড বাংলাদেশের ইস্পাতশিল্পে ২৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ অর্থ ব্যয়ে তারা বছরে ২০ লাখ টন উৎপাদনক্ষমতার একটি স্টিল মিল প্রতিষ্ঠা করবে। এ জন্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) কুনমিং স্টিলকে প্রায় এক হাজার একর জমি ইজারা দিচ্ছে।
একই এলাকায় চট্টগ্রামের পিএইচপি গ্রুপ ৪৪০ একর জমিতে একটি ইস্পাত কারখানা স্থাপনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে। এছাড়া আরও কয়েকটি গ্রুপ ইস্পাত খাতে বিনিয়োগ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কোম্পানি ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, পিএইচপি গ্রুপকে বরাদ্দকৃত মিরসরাইয়ে মোট ৫০০ একর জায়গার মধ্যে ৪৪০ একর জমিতে একটি ইস্পাত কারখানা স্থাপন করা হবে। পিএইচপি স্টিল ওয়ার্কস লিমিটেড সেখানে তিন বছরে মোট ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই মিলের উৎপাদন সক্ষমতা প্রথম ধাপে ১৫ লাখ টন, দ্বিতীয় ধাপে সেটি ৩০ লাখ টনে যাবে। এ কারখানায় মৌলিক স্টিল পণ্য উৎপাদন করা হবে। বর্তমানে আমাদের কারখানাগুলোতে ইন্টারমিডিয়ারি স্টিল পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। তবে নতুন কারখানার উৎপাদিত পণ্য দেশের বাজারে সরবরাহ করার পাশাপাশি ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, ঘানা, কেনিয়াসহ আফ্রিকার অন্যান্য দেশে রফতানি করা হবে।
ইস্পাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের একাধিক বিক্রয় ও বিপণন কর্মকর্তারা বলেন, ওয়ার্ল্ড স্টিল অ্যাসোসিয়েশনের জরিপে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বর্ধনশীল দেশ। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে মাথাপিছু রডের ব্যবহারের পরিমাণ ২৯ কেজি, শ্রীলঙ্কায় ৩৫ কেজি ও ভারতে ৬৫ কেজি। অথচ আমাদের দেশে এ হার মাত্র ২৬ কেজি। আমাদের ১৬ কোটি এবং ভারতের সেভেন সিস্টার রাজ্যগুলোতে প্রায় ১৪ কোটি লোকের বসবাস। এছাড়া নিরাপত্তার কারণে এখন মানুষ ভালো ইস্পাত ব্যবহার করছে, দিনে দিনে যার ব্যবহার আরও বাড়ছে। এ কারণে অনেক ম্যানুয়াল মিল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বাজার সম্ভাবনা আছে বলে তো এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে ব্যবসা মানে ঝুঁকি নেওয়া।
এ বিষয়ে বিএসআরএম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক তপন সেনগুপ্ত শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমান সরকারের নেওয়া সব ধরনের প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়িত হলে অবশ্যই বাণিজ্যসহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে। আর দেশের যত বেশি শিল্পায়ন হবে তত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে। তবে বিবেচনা করা উচিত, যে খাতে আমাদের এখনও অনেক ঘাটতি আছে, সেসব খাতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। আর ইস্পাত খাতে যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তা চিন্তার বিষয়। কারণ আমাদের এ শিল্প পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ায় কাঁচামালের আন্তর্জাতিক দর, বিনিময় মূল্যহার, পোর্ট সক্ষমতাসহ নানা বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। এছাড়া ভারতের সেভেন সিস্টারের বাজার পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে নেই, কারণ ভারতে আমাদের চেয়েও অনেক কম খরচে উৎপাদন করা হয় এবং ট্রানজিট সুবিধা আছে। সুতরাং এ বিষয়ে আরও ভাবতে হবে।