ইয়াবার ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত হোক দেশ

তৌহিদুর রহমান: বাংলাদেশে তরুণ সমাজের মধ্যে মাদকের ভয়াল থাবা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দীর্ঘদিনের। বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকমহল যেমন উদ্বিগ্ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকেও এ নিয়ে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে মাদকের ছোবল থেকে এদেশের যুবসমাজকে রক্ষার। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এতে কাজ হচ্ছে সামান্যই। চারপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু মানুষরূপী ভয়ঙ্কর মাদক ব্যবসায়ীর বিষাক্ত ছোবলে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে আমাদের যুবসমাজ।

মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল, হেরোইন, মরফিন থেকে শুরু করে হালের সিসা বার সবকিছুই যুবসমাজের বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়াবা। লাখ লাখ ইয়াবার চালান ধরা পড়ছে। তবুও থামছে না মাদক ব্যবসায়ীদের ভয়ঙ্কর দৌরাত্ম্য। সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে জড়িয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু খবরও শঙ্কাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ও জনপ্রিয় পর্যটন স্পট সর্বদক্ষিণের ইউনিয়ন ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। সেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে আর সমুদ্রের হাতছানিতে ছুটে যান। আশঙ্কার কথা হলো, সেখানকার ঝাউবাগান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আড়াই বস্তা ইয়াবা! বস্তার সংখ্যা শুনে সামান্য কিছু মনে হলেও ব্যাপারটা মোটেও খাটো করে দেখার মতো কিছু না।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ওই আড়াই বস্তাতে ইয়াবা ছিল পাঁচ লাখ! ভাবা যায়? এই পাঁচ লাখ নিঃসন্দেহে পাঁচ লাখ বার সেবন করা হতো। যার একটি বড় অংশই দেশের যুবসমাজ হতে পারত, সেটা সচেতন মানুষ মাত্রই অনুধাবন করতে পারবেন। এর দামও নেহাত কম নয়। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী যা আনুমানিক প্রায় ২৫ কোটি টাকা! দেশের শীর্ষস্থানীয় পর্যটন স্পটে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের এ ঘটনা আমাদের সবার আশঙ্কাকে নিঃসন্দেহে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই টেকনাফ থেকে ১১ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩৪ কোটি টাকা!

শুধু এই একটি খবরই নয়। প্রায় প্রতিদিনই এখন গণমাধ্যমে ইয়াবা-সংশ্লিষ্ট কোনো না কোনো খবর থাকছেই। কোথাও হাজার হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের খবর, ঘটছে খুনের ঘটনাও। সঙ্গে নানা ধরনের সামাজিক অবক্ষয়ের খবর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ইয়াবা আসক্তির খবরও আমাদের নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমের আরও একটি খবর ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ নারায়ণগঞ্জে এক পুলিশ কর্মকর্তা আটক হয়েছেন। মাদক রাখার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো ও মামলা দেওয়ার কথাও শিকার করেছে পুলিশ। কতটা ভয়ঙ্কর বিষয়? যারা রক্ষা করবেন, তাদেরই কেউ কেউ বিপথে চলে যাচ্ছেন। আরও একটি খবর হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার ছয় পুলিশ সদস্য ২০০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করে মাত্র ৪০ কেজি উদ্ধার দেখিয়েছেন। বাকি ১৬০ কেজি গায়েবের চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। পুলিশের তৎপরতায় তা উদ্ধার হয়েছে। তবে পালিয়ে গেছেন ওই ছয় পুলিশ সদস্য।

ইয়াবার চালানের জন্য এখন নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে কক্সবাজার, দেশের পার্বত্য তিন জেলা ও বিশাল সমুদ্রসীমা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে যে স্থানটির নাম সেটি হলো কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা। সেখানকার ইয়াবা চোরাচালান এমন ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইয়াবা নাম শুনলেই এখন টেকনাফের কথাই স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। এছাড়া ভারতীয় সীমান্তবর্তী কিছু এলাকাও ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার খবর আসছে। পরে তা নানা মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। আর এসব ইয়াবার সিংহভাগই আসছে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে।

আকারে খুবই ছোট হওয়ায় দেশে ইয়াবার ব্যবসা ধারণার চেয়েও দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া বেশ কিছু স্থানে ইয়াবা তৈরির যন্ত্রপাতিও উদ্ধার করা হয়েছে। এর থেকে প্রমাণিত হচ্ছে, ইয়াবার চোরাচালানই শেষ কথা নয়, এখন দেশেও তৈরি হচ্ছে এই মাদক! আর দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে ইয়াবার বিশাল সাপ্লাই চেইনও। ফোন দিলেই দোরগোড়ায় পৌঁছে যায় ভয়ঙ্কর এ মাদক। খুব সহজে মেলায় সব বয়সী মানুষই এ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তবে এতে সবচেয়ে বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে বেকার যুবসমাজ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও গবেষকরা জানাচ্ছেন, ইয়াবা একসময় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ হিসেবেই পরিচিত ছিল। গত শতাব্দীর শুরুর দিক থেকেই এটি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনীতে ক্লান্তি দূরকারক বা আরও অনেক রোগের ক্ষেত্রে ব্যবহƒত হতো। পরবর্তী সময়ে এটি সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার জন্য মাদক হিসেবে ব্যবহার শুরু করে মাদকসেবীরা। তবে বেশকিছু দুর্ঘটনার পর অধিকাংশ দেশেই এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ইয়াবায় আসক্ত হলে প্রাথমিকভাবে নিদ্রাহীনতা, শ্বাসকষ্ট বা হƒদরোগের কারণ হতে পারে। অনেকের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, কেউবা হতাশায় ডুবে গিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এছাড়া নিয়মিত সেবন করলে এটা শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ডেকে আনে। অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে রাস্তায় দুর্ঘটনায়ও পতিত হন।

বাংলাদেশের ইয়াবার ভয়াল থাবা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যম। যেখানে ইয়াবায় আসক্তরা জানিয়েছে, আগে মদ, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ অন্যান্য যেসব মাদক চলত, এখন তার স্থান দখল করেছে ইয়াবা। এগুলো এখন হাতে পাওয়াটাও সহজ। ফোন দিলেই বাড়ি গিয়ে ইয়াবা পৌঁছে দিয়ে আসে বিক্রেতারা। আর এ ব্যবসার সঙ্গেও অনেক যুবক জড়িয়ে পড়েছে। অনেকে সেবন করতে গিয়ে ব্যবসায় জড়িয়েছে, কেউবা আবার জড়িয়েছে বাড়তি আয়ের আশায়।

বাংলাদেশে ইয়াবার এ ভয়ঙ্কর বিস্তার নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন সব মহল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সব খানেই সমানে ছড়িয়ে পড়ছে এ মাদক। এতে শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে, সঙ্গে যুবসমাজ বিপথে যাওয়ারও বড় ধরনের পথ তৈরি হয়েছে। দেশের মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলোতেও এখন ইয়াবা আসক্ত রোগীদের ভিড়। যার বড় অংশই তরুণ থেকে বিশাল যুবসমাজ।

যুবসমাজের মধ্যে যে কোনো ধরনের মাদকের বিস্তার কোনোভাবেই ভালো খবর হতে পারে না। তরুণ ও যুবসমাজ একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। তাদের সুরক্ষিত রেখে কাজে লাগানো না গেলে একটা সময়ে গিয়ে অর্থনীতি থমকে দাঁড়াবে, বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে দেশ।

ইয়াবার মরণ ছোবল কীভাবে ছড়াচ্ছে এটা এখন সবারই জানা কথা। কোন রুট দিয়ে আসছে, কীভাবে আসছে তাও এখন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নখদর্পণে। তারপরও এটি কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। এর কারণ সম্ভবত বিপুল পরিমাণ মানুষ এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আর দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ব্যবসার ধরনও পাল্টাচ্ছে। ইয়াবার চালানগুলো আটক করার সময়ই যেগুলো লক্ষ করা গেছে।

ইয়াবা ব্যবসা রোধ করার জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার সময়। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা না গেলে এটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপর্যয় ঘটাতে পারে। ইয়াবার সঙ্গে শুধু সাধারণ বেকার যুবসমাজ বা নি¤œ আয়ের মানুষ জড়িত নয়। তাদের পেছনে রয়েছে বড় বড় রাঘববোয়াল। এ পর্যন্ত সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে অনেক বড় নামই তালিকায় এসেছে। অনেকে খুব অল্পদিনে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। পরিণত হয়েছে ইয়াবা ব্যবসার গডফাদারে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে। ধরা পড়ছে একেবারেই মাঠ পর্যায়ের ক্ষুদ্র সরবরাহকারীরা।

এসব বিষয়গুলো মাথায় রেখে সরকারকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে সক্রিয় করার পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। সঙ্গে রাঘববোয়াল বা ধরাছোঁয়ার বাইরে যারা আছে তারা যাতে ছাড় না পায় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য এটা খুবই জরুরি। এছাড়া তরুণ ও যুবসমাজ যাতে মাদকে আসক্ত না হয় সেজন্য প্রচারণা বাড়াতে হবে। ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।

তবে এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। নিজের সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে তা নজরে রাখতে হবে। সন্তান যেন বিপথে না যায় তা দেখাটা অনেকাংশেই অভিভাবকের ওপরই বর্তায়। এছাড়া তাদের হাতে যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ না যায় সেদিকটাও খেয়াল রাখা দরকার। সর্বোপরি ইয়াবার সর্বগ্রাসী ছোবলে এখন কঠিন সময় পার করছে আমাদের প্রিয় স্বদেশ। তবে এখনও খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি। এখনই সময় এ ভয়ঙ্কর থাবা থেকে দেশের মানুষকে রক্ষার। শুধু ইয়াবা নয়, সব ধরনের মাদকমুক্ত করতে হবে দেশকে। অন্যথায় আমাদের সমাজব্যবস্থা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]