ঈদের আগে পোশাকশ্রমিকদের বেতন বোনাস নিয়ে অসন্তোষ কেন?

আবদুল মকিম চৌধুরী: এবারের ঈদুল ফিতর হবে ১৬ বা ১৭ জুন। ঈদের আগে কর্মদিবস ১৪ জুন পর্যন্ত। অথচ বেতন-বোনাস পরিশোধের বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা নেই পোশাকমালিকদের। কোনো কোনো মালিক নাকি ঈদের পর বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ফলে এবারও ‘যথারীতি’ বেতন পরিশোধ নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ হতে পারে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য নয়, এমন কারখানায়ই প্রতিবছর সমস্যা হয় বলে দাবি করেন সংগঠন দুটির নেতারা। তারা এসব কারখানার বিষয়ে সরকারকে জানাতে পারেন, কিংবা এগুলোর তালিকা করতে পারেন।
পোশাকশ্রমিকদের জন্য ঈদ আদৌ আনন্দের বার্তা আনে না। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাদের। ২০ রোজার মধ্যে বোনাসটা দেওয়া হলে অন্তত ঈদটা তাদের স্বস্তির হতো। পোশাকমালিকেরা সব সময়ই কর্মীদের ঠকান। ঈদ এলেই তাদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচিত হয়। খাঁটি ব্যবসায়ী হতে হলে এ প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে।
ঈদ এলেই পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে খবর আসে গণমাধ্যমেরাজধানীর কারওয়ান বাজারের এফডিসি লেভেল ক্রসিং সংলগ্ন বিজিএমইএ ভবনের সামনে প্রায়ই অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। পথচারী ও উৎসুক জনতা মালিকদের বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। একইপথে আসা যাওয়ার সুবাদে আমিও এটি প্রত্যক্ষ করি। নিরীহ পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে এমন ব্যবহার কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে কিছু বলেছিও। সেখান থেকে কয়েকটি তথ্য তুলে ধরছি।
১ অক্টোবর ২০১৬ মৃন্ময় ফ্যাশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল, ২ অক্টোবর কুশিয়ারা কম্পোজিট নিট ইন্ডাস্ট্রিজ, ৪ অক্টোবর ফারিশা কম্পোজিট নিটওয়্যার ৫ অক্টেবর অনন্ত অ্যাপারেলস ৮ অক্টোবর জিনসকেয়ার লিমিটেড ১০ অক্টোবর হানিওয়েল গার্মেন্টস। এগুলোর স্বত্বাধিকারী যথাক্রমে আবুল ফজল হান্নান, মাহমুদুস সামাদ কয়েস (এমপি সিলিট ৩), গোলাম মোহাম্মদ খোকন খান, শরীফ জহির, শফি উল্লাহ ও মশিউর রহমান জয়। ২৪ আগস্ট ২০১৪ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে বিজিএমইএ সেরা রপ্তানিকারক পুরস্কার নেন সাসকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিজিএমইএর পরিচালক শেখ আতিয়ার রহমান দীপু। ৮২ দিনের মাথায় ১৬ নভেম্বর বিজিএমইএ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে আকুতি মিনতি করছে তার কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা।
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে বিজিএমইএ ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন তুং হাই ফ্যাশনের শ্রমিকরা। ২৪ এপ্রিল বিক্ষোভ করেন আনাম গার্মেন্টের শ্রমিকেরা (এটির মালিক সাবেক ফুটবলার ইমতিয়াজ সুলতান জনি)। ২৫ মে ২০১৭ ক্লাক্সটন অ্যাপারেলস অ্যান্ড টেক্সটাইলের শ্রমিকেরা (মালিক এ কেএম সানাউল হক) ১৭ আগস্ট ২০১৭ বিক্ষোভ করেন প্যারাডাইস হাই-ডিজাইন লিমেটেডের শ্রমিকেরা। (এদিনই একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হয় ‘অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে কারখানা মালিকেরা’ শীর্ষক প্রতিবেদন)। ২৮ আগস্ট লিনডা ফ্যাশনস লিমিটেডেরা শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। তারা এসেছেন আশুলিয়ার ফ্যাস্টাসি কিংডম অ্যামিউজমেন্ট পার্কের পাশে সমির প্লাজা শপিং কমপ্লেক্স ভবনে অবস্থিত কারখানা থেকে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার নাসিম আহমেদ। ১৮ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ করেন টেক্স টেক লিমেটেডের শ্রমিকেরা। তার এসেছেন গাজীপুর সদর উপজেলার মালেকের বাড়ি থেকে।
নুরে আলম সিদ্দিকীর প্রতিষ্ঠান ডরিন ফ্যাশনসের শ্রমিকরা দুই দিন ধরে বিজিএমইএ ভবনের সামনে অবস্থান করেন বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে। ২৮ অক্টোবর ২০১৪ সেখানে একজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। তার কাছে কারখানা মালিকের নাম জানতে চাইলে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, উনি হাজার কোটি টাকার মালিক, অথচ শ্রমিকের বেতন দিচ্ছেন না।
গত ৩১ মে রামপুরার আশিয়ানা গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। কয়েকজন শ্রমিক জানালেন কয়েক মাসের বাকি। আজ বেতন দেওয়ার কথা ছিল। বেতন নিতে এসে দেখেন কারখানা বন্ধ। কর্তৃপক্ষের কেউ নেই। গত এপ্রিলে এ কারখানার শ্রমিকেরা বিজিএমইএ ভবনের সামনে বিক্ষোভ শেষে ফিরে যাওয়ার পথে ভবনের কর্মীদের অতর্কিত হামলার শিকার হন। পোশাক শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠা করার জন্য চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫০০ একর জমি বরাদ্দ পাচ্ছে বিজিএমইএ। এ উপলক্ষে সমঝোতা চুক্তি সই অনুষ্ঠান হয় গত ২১ মার্চ রাজধানীর র‌্যাডিসন ব্ল– হোটেলে। এখানে দেওয়া বক্তব্যে বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলামকে ডিএনসিসির মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করতে আহ্বান জানান সংগঠনের সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআইর সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, অনেকে বলে থাকেন সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা নাকি বেশি হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করতে পারবে না। রাজনীতিবিদেরা ব্যবসা করতে পারবে না। এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। আমরা হল-মার্ক বা অন্য খারাপ ব্যবসায়ীর কথা বলছি না, আমরা খাঁটি ব্যবসায়ীদের কথা বলছি। অর্থনীতি বিনির্মাণে যে অবদান রাখছি, তার স্বীকৃতি প্রতিটা জায়গা থেকে চাই। আমাদের উৎসাহিত করেন, আমরা আপনাদের সুন্দর একটি বাংলাদেশ উপহার দেব। একই দিন রাজধানীর গুলশানে স্পেকট্রা কনভেনশন সেন্টারে এক অনুষ্ঠানে ‘গার্মেন্টস শ্রমিকের অধিকার: ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
প্রতিবেদনে পোশাক শ্রমিকদের বঞ্চনা এবং বিভিন্ন অনিয়মের বেশ কিছু তথ্য উঠে আসে। এতে দেখা যায়, বেশিরভাগ শ্রমিকেরই আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র বা চুক্তিপত্র নেই। শ্রম আইন অনুযায়ী আগের মাসের মজুরি পরের মাসের সাত কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। ঢাকা ও গাজীপুর এলাকায় পোশাক কারখানার ৫২ শতাংশ শ্রমিক মাসের প্রথম সপ্তাহে মজুরি পান না। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় এ হার ৫৯ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া নানা অজুহাতে শ্রমিকদের মজুরি কর্তন করে কারখানা কর্তৃপক্ষ। অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকেরা বুঝতে পারেন না কেন তাদের মজুরি কাটা গেল। ঢাকা ও গাজীপুরের ২৯ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের ৪০ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি কর্তনের ঘটনা ঘটে। ১৬ শতাংশ কারখানায় অতিরিক্ত কাজকে ‘ওভারটাইম’ হিসেবে গণ্য করা হয় না। এমন অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের খাঁটি ব্যবসায়ী বলতে আপত্তি আমাদের।
বিশিষ্ট আইনজ্ঞ প্রয়াত গাজী শামসুর রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা এমন যখন ধনী গরিবে মামলা হয় তখন গরিব নিঃস্ব হয়, যখন গরিবে গরিবে মামলা হয় তখন দুজনই নিঃস্ব হয়, আর যখন ধনী ধনীতে মামলা হয় তখন আইনই নিঃশেষ হয়ে যায়।’ এ সুবিধা-সীমাবদ্ধতার সুযোগ ষোলো আনা সদ্ব্যবহার করছেন শিল্প মালিকরা।
কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি শ্রমিকদের ঠকান যেসব মালিক, তারা সবাইকে ঠকান। একজন শ্রমিক বারো ঘণ্টা কারখানায় কাজ করেন। মালিকের সঙ্গে তার প্রতিদিন কয়েকবার দেখা হয়। বেতন বকেয়া থাকলে নানাভাবে আকুতি মিনতি করেন। এতে মালিকদের মন গলে না। যারা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা যথাসময়ে পরিশোধ করেন না তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিল যেমন বিদ্যুৎ, টেলিফোন, গ্যাস, পানির বিল প্রভৃতি সময়মতো পরিশোধ করেন না। রাষ্ট্রীয় এসব সংস্থার কর্মীরা তো প্রতিদিন বিলের জন্য তাগিদ দেয় না। বরং অসাধু কর্মচারীদের কিছু ধরিয়ে দিয়ে মাসের পর মাস বিল বকেয়া রাখেন পোশাকমালিকদের কেউ কেউ। সেবা সংস্থার জমা হয়ে যাওয়া কয়েক লাখ টাকা ঈদের আগে পরিশোধ করেন। শ্রমিকদের বোঝানো হয়, এজন্য বেতন পরিশোধ করা যায়নি। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে কারাখানা বন্ধ হয়ে গিলে শ্রমিকদেরই বড় ক্ষতি।
শ্রমিকদের ঠকানোর বিষয়ে শিল্পমালিকদের মধ্যে দলমত নির্বিশেষে অভাবিত ঐক্য বিদ্যমান। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের মধ্যে ভাগাভাগি নিয়ে যতই দ্বন্দ্ব-বিরোধ থাকুক না কেন, শ্রমিক ঠকানোর ব্যাপারে তারা এক ও অভিন্ন।
২০০৬ সালের ২৩ মে ঢাকার তেজগাঁও, মিরপুর-পল্লবী, কাফরুল, সাভার, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এবং গাজীপুরের জয়দেবপুর ও টঙ্গীতে তৈরি পোশাক কারখানায় ব্যাপক ভাংচুর হয়। এর প্রতিবাদে শিল্পমালিকরা রাজপথে শুয়ে থাকেন। পরদিন এ নিয়ে একটি ছবি একটি জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়। ক্যাপশন ছিল, ‘তারা জানেন না কী তাদের অপরাধ, শতকোটি টাকার বিনিয়োগ-দেশ গড়ার স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ। রাজপথে শুয়ে গার্মেন্ট মালিকদের প্রতিবাদ’।
গার্মেন্ট মালিকরা জানেন না, তাদের কী অপরাধÑএটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। গার্মেন্টশিল্পে শ্রমিকদের মানুষ মনে করা হয় না। ওই সময় শ্রমিকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছে আন্দোলনকারীরা।
পোশাক মালিকরা কেবল বেতন-ভাতায় শ্রমিকদের ঠকাচ্ছেন না। ভবন ধসে, আগুনে পুড়ে তাদের দায়িত্বহীনতার শিকার হন শ্রেিমকেরা। ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল সাভারের বাইপাইলে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ভবন ধসে নিহত হন ৬৩ জন শ্রমিক এবং মারাত্মক আহত হন ৮০ জন শ্রমিক। ঘটনার পর বিজিএমএইএর তৎকালীন সভাপতি আনিসুল হক বলেছেন, ‘ঘটনার একটু আগে মালিক অফিসে ছিলেন, তিনিও মারা যেতে পারতেন। আর ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকদের বেতনের জন্য রাখা ৩০ লাখ টাকার কোনো হদিস নেই। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, দুটি বক্তব্যের একটিও সত্য ছিল না। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিকের প্রাণহানি হয়। আহত হয় সহস্রাধিক শ্রমিক। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক মারা যায় এবং আহত হয় আড়াই হাজারের বেশি শ্রমিক। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছে শত শত শ্রমিক।
বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইডের ‘অবিস্মরণীয়, অমার্জনীয়: রানা প্লাজা’ শীর্ষক জরিপের তথ্যমতে রানা প্লাজা ধসে যেসব শ্রমিক আহত হয়েছিলেন, তাঁদের ৪২ শতাংশ শ্রমিক এখনও বেকার। গত বছরের ২২ এপ্রিল প্রকাশিত এ তথ্য মিথ্যা আখ্যা দিয়ে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, ‘…কোনো শ্রমিক যোগাযোগ করলে ব্যবস্থা নেব। রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা তহবিলে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পড়ে আছে।’
২০১৬ সালের ডিসেম্বরে টানা শ্রমিক অসন্তোষ চলার পর কঠোর অবস্থানে যায় বিজিএমইএ। ঘোষণা দেয়, কারখানা বন্ধ থাকায় বেতন পাবেন না শ্রমিকেরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, কারখানা নয়, শ্রমিকদের সঙ্গে ‘চিটিং’ বন্ধ করতে হবে।’
ঈদুল আজহায় ত্যাগের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে গার্মেন্ট মালিকরা লাখ টাকা খরচ করে কুরবানি দেন। এদেরই কেউ আবার ‘মুনাফা হয়নি, শিপমেন্ট হয়নি’ অজুহাত দেখিয়ে কর্মীদের বেতন বোনাস। মালিকের ঈদ-আনন্দ কতটা সার্থক, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। নিরীহ শ্রমিকরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীদের ‘মালিক’ বলেই জানে। নিজের পরিবারে বা অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আলোচনার সময় নিয়োগকর্তাকে ‘আমাদের মালিক’ বলে উল্লেখ করে তারা। এ মালিকেরা কতটা ‘মনিব’ হয়ে উঠতে পেরেছেন, আত্মসমালোচনার সময় এসেছে।
পোশাক কারখানায় ভাঙচুর হলেই নাশকতার গন্ধ খোঁজেন মালিকেরা। কিন্তু তারাই নাশকতার মূল হোতা। ঠিকমতো বেতন দেওয়া হয়, শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন হয় না, কর্মপরিবেশ বিদ্যমান আছে, এমন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কখনও হামলা-ভাঙচুর হওয়ার দৃষ্টান্ত নেই। মালিকরা প্রভাব, ক্ষমতা, দলীয় পরিচয় আর অর্থ দিয়ে হাতে রাখেন রাষ্ট্রযন্ত্রসহ বিভিন্ন সংস্থাকে।
২০০৭ সালে ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে বেতন বোনাস না পেয়ে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীরা শ্যামলী সেনাক্যাম্পে অভিযোগ জানায়। সেনাবাহিনীর একটি দল ওই প্রতিষ্ঠানে যায়। ডেকে আনা হয় মোহাম্মদপুর থানার তৎকালীন ওসিকে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও ডেকে আনা হয়। ওসি তাকে বললেন, ‘কারখানা আপনার, শ্রমিকরাও আপনার। আমাদের কাছে যেহেতু অভিযোগ গেছে এবং তা সত্য। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দিয়ে দিন।’ স্বত্বাধিকারীরা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে বাধ্য হন।
পরবর্তী সময়ে ওই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীরা ‘সাহসী’ হয়ে উঠেন। বেতন-বোনাস প্রশ্নে আগের মতোই গড়িমসি করেন। শ্রমিকদের উদ্দেশে তাদের বক্তব্য, ‘এখন ২০০৭ সাল নয় যে বললেই পুলিশ আসবে।’ এ কথার মাধ্যমে তারা হয়তো বোঝাতে চাচ্ছেন রাজনৈতিক সরকারের আমলে ‘যা ইচ্ছে তা-ই করার’ সুযোগ রয়েছে। সরকারি সংস্থাকেও তথ্য দিতে কার্পণ্য করে বিজিএমইএ। ভ্যাট দফতরকে আমদানি-রফতানির তথ্য দিতে চায় না সংগঠনটি (শেয়ার বিজ, ১৭ মার্চ ২০১৮)।
রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে পাঁচ বছরের জন্য কাজ শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ (সংক্ষেপে অ্যাকর্ড) এবং আমেরিকান ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স সেফটি (সংক্ষেপে অ্যালায়েন্স)। শুরু থেকেই এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে বিজিএমইএ। কিন্তু ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে আশঙ্কায় জোরালো ভূমিকা নেয়নি। পরবর্তী সময়ে কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে দুই জোটকে বাদ দিয়ে নিজেরাই আলাদা প্ল্যাটফর্ম করার উদ্যোগ নেয় সংগঠনটি। ‘সম্মান’ নামে ওই উদ্যোগের পরিকল্পনাও করেছে তারা। এ ব্যাপারে সরকারের সবুজ সংকেত পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিজিএমইএ নেতারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ জুলাই ২০১৭ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করেছি, ‘সম্মান’ মালিকদের সম্মান রক্ষা করবে, শ্রমিকদের নয়। অবশ্য এখনও সম্মান কাজ শুরু করেনি।
বছর কয়েক আগে নিট পোশাক পণ্যমেলা উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তারা (শ্রমিকরা) মানবেতর জীবন যাপন করে। মালিকেরা একদিন যে বাজার করে শ্রমিকের সারা মাসের বেতনের চেয়ে তা বেশি।’
প্রধানমন্ত্রীর দিকে চেয়ে আছে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীরা। প্রধানমন্ত্রী যদি আশ্বস্ত করতেন, শ্রমিকদের ঠকায়, পাওনা বেতন চাইতে এলে শ্রমিকদের উপর মাস্তান লেলিয়ে দেয়; এমন কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর আপসহীন অবস্থান প্রতারক শিল্পমালিকদের নিবৃত্ত করবে, কোনো সন্দেহ নেই।
পোশাক শিল্প আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস। এ শিল্প অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে, অদক্ষ অল্পশিক্ষিত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখছে। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে এ খাতের উদ্যোক্তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তাদেরই কারও কারও কর্মকাণ্ড শ্রমিকবান্ধব নয়। তাদের কারণে আমাদের শ্রমিকরা ন্যায্য পাওনা থেকেই বঞ্চিত হয় না, পুরো শিল্পেরই ক্ষতি ডেকে আনে। আমরা চাই, ্ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে বেতন- বোনাস পরিশোধ করে শ্রমিক কর্মচারীদের ঈদ উদযাপন স্বস্তিকর করে তুলবেন। এটি কর্মীদের প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। মালিক-শ্রমিকের সুসম্পর্ক সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে, যা প্রকারান্তরে উভয়পক্ষের জন্য কল্যাণকর হবে।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]