ঈদের খুশির সেই রঙিন দিনগুলো…

কাজী সালমা সুলতানা: শৈশব-কৈশোরে ঈদের যে আনন্দ, তার তুলনা চলে না কোনো বয়সের সঙ্গেই। সে স্মৃতি এখনও কাতর করে। যদি ফিরে পেতাম সেই আনন্দমুখর দিনগুলো!
সমবয়সী ভাইবোনদের মধ্যেও কে রোজা রেখেছে, কে সাহরি খেয়েছে, কে সাহরি খেয়েও রোজা রাখেনি এটা নিয়েও ছিল আলোচনা। এর আড়ালে লুকিয়ে থাকত ঈদের আনন্দ।
ঠিক কবে থেকে রোজা রাখা শুরু করেছি, তা এখন মনে নেই। তবে ছোট দুই ভাইয়ের সঙ্গে একটা প্রতিযোগিতা থাকত কে বেশি রোজা রাখল। ছোটরা রোজা রাখলে দুর্বল হয়ে যাবে, কষ্ট হবে এ কারণে বড়রা রোজা ভাঙার জন্য নানা কৌশল করতেন। ছোট মামা বলতেন, সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত না খেয়ে থাকলে একটা রোজা হয়! আর দুপুর থেকে ইফতার পর্যন্ত আরেকটি রোজা…! তার অর্থ, ছোটদের জন্য দিনে দুটো রোজা! এভাবে রোজা রেখেও ভাইদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা হতো। সমবয়সী আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে খেলার সময় রোজা নিয়েও গর্ব করতাম। তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। সে বয়সে ১০-১২টি রোজা রাখতাম। ঈদের দিন মামারা এলে জানতে চাইতেন কে ক’টি রোজা রেখেছি। এ সংখ্যা হিসাব করে মজা করতে সেলামির টাকা কম-বেশি করতে চাইত।
আমি বেড়ে উঠেছি একটি যৌথ পরিবারে। ঢাকার টিকাটুলিতে দাদার বাসা। ওখানেই দাদি, তিন ফুফু, তিন চাচা, আমরা দুই ভাই, দুই বোন আর আব্বা-আম্মা বাস করতেন। আমাদের চার ভাইবোন আর ফুফুদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বেশি ছিল। রমজান মাসে সাহরি খাওয়া ছিল আরেকটি লোভনীয় বিষয়। ছোটবেলায় কেউ সাহরির সময় ডাক দিতে চাইত না। তারপরও ঠিক সময়ে উঠে পড়তাম। আম্মার কাছে গিয়ে বসলে দিতেন দুধ-কলা-ভাত। খাওয়া শেষে দাদি-মা-ফুফুরা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। আজান দিলেই দাদি বা কখনও কখনও মায়ের কাছে বলতাম রোজার নিয়ত বলে দেওয়ার জন্য। তারা উচ্চস্বরে বলতেন, আর আমি তা অনুসরণ করতাম। রমজান মাসের প্রথম দিন থেকেই গণনা শুরু হতো ঈদের আর কত দিন বাকি। রোজা যত কমে আসে, ঈদের আনন্দও ততই বাড়তে থাকে।
আমাদের ছোটবেলায় দর্জির দোকানে গিয়ে নতুন জামা-কাপড় বানাতাম না। আমার দুই ফুফু কাপড় কিনে এনে রাত জেগে পোশাক তৈরি করতেন। বাসায় সেলাই মেশিন ছিল। ফুফুরা ছিলেন আধুনিক ও ফ্যাশন-সচেতন। ৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়েও বিভিন্ন ম্যাগাজিন সংগ্রহ করে পোশাকের ডিজাইন ঠিক করে দিতেন। অথবা দোকানে গিয়ে জামার ডিজাইন দেখে কাগজে এঁকে আনতেন। ওই নতুন কাপড় সেলাই নিয়ে চলত আরেক উৎসব। কাপড় কাটা ও সেলাই করার সময় ছিল রাত ৯টার পর। ছোট ফুফুই আমাদের দুই বোনের
জামা-কাপড় বানিয়ে দিতেন। রুমাল ছাঁটের ঘের দেওয়া ফ্রক, শর্টকামিজ, স্কার্ট প্রভৃতি ডিজাইনের পোশাক বানিয়ে দিতেন। ঈদের আগে কেউ যেন জামা-কাপড় দেখতে না পায়, সে জন্য যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা হতো। কাপড় কাটার পর টুকরো কাপড়গুলো সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলতাম। জামা বানানোর সময় কাছাকাছি অন্য কাপড় রাখা হতো, যাতে করে কেউ চলে এলে সঙ্গে সঙ্গে লুকিয়ে রাখতাম। ঈদের দিন নতুন জামা পরতে হবে। তাই কোনোভাবেই জামা-কাপড় কাউকে দেখানো যাবে না!
চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় এক ঈদে আম্মা আমার জন্য নীল রঙের শার্টিনের একটি জামা করে দিয়েছিলেন। ওই জামাটি আমার খুবই প্রিয় ছিল। সে সময় বছরে দুই ঈদে নতুন জামা-কাপড়ের রীতি ছিল না। ঈদুল ফিতরে নতুন জামা পরা হতো। ঈদের দু-তিন দিন পর ওই জামাটা আম্মা পরিষ্কার করে স্যুটকেসে তুলে রাখতেন। কোরবানির ঈদের আগের রাতে আবার জামাটা বের করে দিতেন। আমাদের কারোরই তিন-চারটির বেশি জামা-কাপড় ছিল না। এসব নিয়ে কোনো অস্থিরতা বা প্রয়োজনও অনুভব করতাম না। ঈদের আগের রাতে ছোট ফুফু নকশা করে মেহেদি পরিয়ে দিতেন। বাসাতেই মেহেদি গাছ ছিল। বেশি লাল হওয়ার জন্য বাটা মেহেদিতে পানের খর মেশানো হতো। শেষ রোজার পরদিন ঈদ। এ খুশিতে ঠিকমতো ইফতার করা হতো না। মুখে পানি দিয়ে ছুটতাম কোথায় ঈদের চাঁদ দেখা দিয়েছেÑতা জানতে। আর দেখতে পেলে তো আনন্দের
সীমা থাকত না।
ঈদের দিন বাড়ির বড়রা যেতেন নামাজ পড়তে। আমাদের আয়োজন চলত সেমাই-ফিরনি-জর্দা থাওয়া আর নতুন পোশাক পরা নিয়ে। নামাজ পড়ে ফিরলেই শুরু হতো সেলামি আদায় করা। ঈদের দিন বাসার বাইরে যাওয়া আমাদের নিষেধ ছিল। চাচার অঘোষিত নির্দেশ। তার যুক্তি ছিল, এ দিন বাসায় আত্মীয়-স্বজনরা আসবেন। বাইরে গেলে তারা ফিরে যাবেন। এক সময় বাড়ি ভরে যেত আত্মীয়-স্বজনে। হৈ-হল্লা আর নতুন জামার আনন্দের মাঝে শেষ হয়ে যেত ঈদের আনন্দ।