উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফল হোক সবার জন্য

সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ক’বছর ধরেই আমাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। সে অনুযায়ী আমাদের অর্থনীতিও ভালো অবস্থানে থাকার কথা। তবে অর্থনীতিবিদসহ অনেকেই এর সঙ্গে পুরো একমত নন। বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়াসহ সম্পদের অসম বণ্টন, এমন নানা বিষয় নিয়ে তারা সংশয়ের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হিসাবে দারিদ্র্যের হার কমার কথাও বলা হচ্ছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ইতিবাচক সন্দেহ নেই, তবে সম্পদের সুষম বণ্টনের মতো বিষয়ও নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের চূড়ান্ত প্রবৃদ্ধি সাত দশমিক ৮৬ শতাংশ বলে গত মঙ্গলবার জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। ‘২০১৭-১৮ অর্থবছরে চূড়ান্ত প্রবৃদ্ধি ৭.৮৬ শতাংশ’ শিরোনামে প্রতিবেদন শেয়ার বিজে প্রকাশিত হয়েছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের সার্বিক দারিদ্র্য ২১ দশমিক তিন এবং অতিদারিদ্র্য ১১ দশমিক তিন শতাংশে নেমে এসেছে। খবরটি আশাব্যঞ্জক। তবে এর সুফল সবাই সঠিকভাবে পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। কারণ অর্থনীতি এত ভালো বলা হলেও গরিবের ভাগ্যোন্নয়নে তা সামান্যই ভূমিকা রাখছে বলে অভিমত অনেকের।
একটি দেশের অর্থনীতির ধারাবাহিক উন্নতিতে বেসরকারি বিনিয়োগের বড় ভূমিকা থাকে। এক্ষেত্রে অধিক বিদেশি বিনিয়োগ এলেও ভালো খবর। পরিতাপের বিষয়, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ আশানুরূপ হচ্ছে না। সরকারি বিনিয়োগের তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগকে অধিক ফলদায়ী বলে মনে করা হয়। আমাদের জাতীয় বিনিয়োগের মূল চালিকাশক্তি সরকারি বিনিয়োগ বলে মন্ত্রী স্বীকার করেছেন। এ ধরনের বিনিয়োগে দুর্নীতিসহ নানা অব্যবস্থাপনার সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগে সে সুযোগ সামান্যই। এজন্য সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে বেসরকারি বিনিয়োগে আরও নজর দেওয়া জরুরি। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি কর্মসংস্থানেও অনেক বেশি ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
মাথাপিছু আয়ও আগের বছরের তুলনায় ১৪১ ডলার বেশি হয়েছে বলে জানালেন পরিকল্পনামন্ত্রী। যদিও প্রাক্কলিত মাথাপিছু আয়ের তুলনায় এ আয় এক ডলার কম। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এর কারণ, তা অবশ্য বলেছেন মন্ত্রী। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সুফল কি সব শ্রেণির মানুষ যথাযথভাবে পাচ্ছেন? দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, গুটিকয় মানুষের হাতে রয়েছে দেশের সিংহভাগ সম্পদ। দরিদ্র আরও দরিদ্র হচ্ছে আর ধনীরা আরও সম্পদশালী। অনেকে আবার দেশের বাইরে মোটা অঙ্কের অর্থ পাচার করছেন। অর্থনীতিতে তার কুপ্রভাব পড়ছে বৈকি। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে বরাবরের মতো। এ প্রক্রিয়া থামানো জরুরি।
উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফল নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই সবার জন্য সমানাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য সম্পদের বণ্টন হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক। এজন্য যারা ধনী, তাদের সম্পদে আরও বেশি করারোপসহ নানা পদক্ষেপ নিয়ে দরিদ্রদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। এছাড়া দেশের বাইরে অর্থসম্পদ পাচারের বিষয়টিতে কঠোর হওয়া জরুরি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পদক্ষেপ। এজন্য দেশীয় কোম্পানিগুলোকে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারকেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে চীনের মতো বড় অর্থনীতির বিনিয়োগ আমাদের বেশি প্রয়োজন। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার করতে হবে। বিদেশিরা কী কারণে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত, তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎসহ অনেক খাত এগিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে এবং সম্পদের ন্যায়সংগত বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রকৃত সুফল মিলবে।