উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংক খাতে যখন আমানতে সুদের হার কমানোর প্রতিযোগিতা চলছে, তখন উল্টো পথে হাঁটছে দেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী বিদেশি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (এনবিপি)। খেলাপি ঋণে জর্জরিত প্রায় ‘দেউলিয়া’ হওয়ার পথে ব্যাংকটি তাদের মূলধন ঘাটতি পূরণে আমানতের সুদের হার বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এদিকে আমানতের সুদের হার বাড়ানোর কারণে অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠেছেন ব্যাংকটির প্রতি। কিন্তু আমানতের সুদের হার বাড়ালেও এখানে আমানত রাখা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে দেশি আমানতকারীদের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা জারি করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।

দেশের ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক সময়ের আমানতের সুদের হার পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যাংকের আমানতের সুদহার চার থেকে পাঁচ শতাংশের মধ্যে। বিদেশি ব্যাংকগুলোয় এ হার আরও কম। এক থেকে সর্বোচ্চ চার শতাংশ। এর বিপরীতে এনবিপি’র আমানতের গড় সুদ হার হচ্ছে আট দশমিক ১৬ শতাংশ। আর আমানতে এ উচ্চহারের সুদের কারণে ব্যাংকটিতে আমানত রাখতে আকৃষ্ট হচ্ছেন আমানতকারীরা।

এনবিপি’র বিষয়ে জানতে চাইলে কান্ট্রি ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ ব্যাপারে প্রধান কার্যালয়ের কড়া নিষেধ আছে বলে তিনি জানান।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিপি’র একজন কর্মকর্তা জানান, পাকিস্তান এয়ারলাইনস ছাড়া আমানতকারীদের মধ্যে সবাই বাংলাদেশি। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকটি ৭৫০ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করেছে, যা আনুপাতিক হিসাবে এনপিবি’র ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করেন ওই ব্যাংক কর্মকর্তা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোতেও এনবিপি উচ্চ সুদহারে আমানত সংগ্রহ করেছে। কার্যক্রম শুরুর কয়েক বছর পর থেকেই এনবিপি’র ঋণ খেলাপি হতে শুরু করে। বাড়তে থাকে ক্ষতির পরিমাণ। গত ১২ বছর ধরে এ ব্যাংক ধারাবাহিক ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকটির তহবিল ব্যয়ও অন্যান্য বিদেশি ব্যাংকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

জানা যায়, বর্তমানে এনবিপি’র টিকে থাকার একমাত্র সঞ্চালক প্রধান কার্যালয় থেকে মূলধন সংগ্রহ। ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই বছরে এনবিপি পাকিস্তানের প্রধান কার্যালয় থেকে ১৬২.৪২ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে মূলধন ঘাটতি মিটিয়েছে।

এদিকে আমানতের সুদহার বেশি হলেও বর্তমানে ব্যাংকটির ঋণের সুদহার এক শতাংশের নিচে এবং স্প্রেড (আমানত ও ঋণের সুদহারের তফাত) ঋণাত্মক। চলতি বছরের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী এনবিপি’র স্প্রেড ঋণাত্মক সাত দশমিক ২৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে একই সময়ে স্প্রেডের হার ছিল ঋণাত্মক পাঁচ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০১৫ সালে ছিল ঋণাত্মক দুই দশমিক ৫৭ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে ব্যাংকটিতে ইতিবাচক স্প্রেড লক্ষ করা যায়, যার পরিমাণ দশমিক ২৯ শতাংশ। এনবিপি বাংলাদেশে পরিচালিত একমাত্র ব্যাংক, যেখানে ঋণাত্মক স্প্রেডের নমুনা দেখা যায়।

বর্তমানে এনবিপি কেবল আমানতের বিপরীতে স্ব স্ব আমানতকারীদেরই ঋণ দিচ্ছে। নতুন ঋণদান বন্ধ রেখেছে দুই বছর ধরে। এনবিপি’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।

উল্লেখ্য, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান বাংলাদেশে চারটি শাখার মধ্য দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ব্যাংকটির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত চার বছরের বেশি সময় ধরে শ্রেণীকৃত ঋণের হার বেড়ে গেছে। খেলাপি ঋণের হার ২০১৩ সালে ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৬ সালের শেষে ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এনবিপি’র ব্যালান্স শিট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৬ সালের শেষে তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হাজার ৪২৬ কোটি টাকার ঋণ পোর্টফোলিও রয়েছে। এ পোর্টফোলিওর ৯৮ শতাংশ ঋণ শ্রেণীকৃত। অন্যদিকে এর মূলধন বা শেয়ারহোল্ডার ইক্যুইটির পরিমাণ ৬৮০ কোটি টাকা।

এ অবস্থায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনবিপি’র আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএম’র সুপার নিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকে মূলধন রাখাটাই যথেষ্ট নয়। যে ব্যাংকের স্প্রেড নেতিবাচক, ব্যাংক খাতে আমানতের গড় সুদহার থেকে যে ব্যাংককে অনেক বেশি হারে টাকা নিতে হচ্ছে, তার মানে হচ্ছে এর অবস্থা সঙ্গীন। ব্যাংকটির আয় নেগেটিভ। বছরের পর বছর ক্ষতির মধ্যে আছে। আমানতকারীদের জন্য এ ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ। আমানতকারীদের নিরাপত্তা রক্ষা করা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম ম্যানডেট।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা। এ ব্যাংককে ব্যাংকিং করতে দেওয়া উচিত হবে না।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কিছু মূলধন এসেছে আর কিছু বাকি আছে। মূলধন ঘাটতি পুনর্ভাবন করছে বলেই এনবিপি’র বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা অনুষদের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘২০১৬ সালে ব্যাংকটির ঋণ ও অগ্রিম পোর্টফোলিওর ৯৮ শতাংশের বেশি শ্রেণীকৃত। এ শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী নিয়মমাফিক প্রভিশন সংরক্ষণ করেনি। তা করলে ব্যাংকের সার্বিক ইক্যুইটি ঋণাত্মক হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে মূলধন অপর্যাপ্ততার কারণে পুনঃমূলধন আনয়ন ব্যতিরেকে বাংলাদেশে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা ব্যাংকটির জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। এনবিপি’র বাংলাদেশ কার্যক্রম দেউলিয়াপনার সম্মুখীন হবে। এ অবস্থায় আমানতকারীরা তাদের আমানত হারাবে।’

তিনি বলেন, ‘আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে ব্যাংকটিকে দেউলিয়া বলা যেতে পারে। এর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এ ব্যাংকটি টিকে থাকার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই এদেশে।’

ন্যাশন্যাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা জানান, ‘ব্যাংকটি অনসাইট ও অফসাইট সুপার ভিশনের তদারকিতে আছে। সময় সময় নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে।’