উদ্বেগ আইনটির দুর্বলতা ও প্রয়োগ নিয়ে

প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে বিতর্ক চলছে অনেক দিন ধরে; বিশেষত চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি মন্ত্রিসভায় এর খসড়া অনুমোদনের পর থেকে। প্রযুক্তিনির্ভর এ বিশ্বে এমন একটি আইন আগেই আমাদের প্রয়োজন ছিল, এটা অস্বীকার করা যাবে না। দেশে-বিদেশে সাইবার ক্রাইম বেড়েছে ও বাড়ছে। বাংলাদেশ নিজেও এতে আক্রান্ত হয়েছে। হ্যাকিংয়ে সমূহ না হলেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের রিজার্ভ। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে উগ্রবাদ, মাদকসহ নানা অপরাধের উপাদান। ফলে এটি যে সুনিয়ন্ত্রণে আনা দরকার, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাই বিতর্ক থাকার কথা নয়। তবে এ আইনের ২১, ২৫ ও ২৮ নম্বর ধারা নিয়ে ১১টি দেশের কূটনীতিক উদ্বেগ জানিয়েছিলেন গত ২৫ মার্চ। সাংবাদিকদের আপত্তি ৮, ২১, ২৫, ২৯, ৩২ ও ৪৩ ধারা নিয়ে। এও শোনা যাচ্ছে, প্রস্তাবিত খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে নাকি আইনটি থেকে বাদ পড়া বিতর্কিত ৫৭ ধারাটি যুক্ত হবে সেখানে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের সদস্যরা বৈঠক করেছেন একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে, কয়েক দফায়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার এ পরিষদের সঙ্গে আইনমন্ত্রীর বৈঠকের খবর শেয়ার বিজ ছেপেছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা: ছয়টি ধারা নিয়ে সম্পাদকদের উদ্বেগ’ শিরোনামে। তাতে বক্তাদের এমন মন্তব্য প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে সাংবাদিকদের অবস্থান স্পষ্ট করেÑ‘আমরা এই ধারাগুলোকে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী মনে করছি। এ ধারাগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্র ব্যাহত করবে’। একইভাবে ইতিবাচক মনে হয়েছে আইনমন্ত্রীর জবাব। তিনি বলেছেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হচ্ছে সাইবার ক্রাইম প্রতিহত করার জন্য; সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের জন্য নয়। সে ক্ষেত্রে এই আইনে যদি কোনো দুর্বলতা বা ত্রুটি থাকে, তবে সেগুলো যেন পরিবর্তন ও সংশোধন করা যায়, সেভাবেই আইনটি প্রণয়ন করা হবে’। আমরা তার এ বক্তব্যে আশাবাদী হতে চাইব।
প্রস্তাবিত আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণাত্মক ভয়ভীতি দেখায়, তাহলে তাকে ৩ বছরের জেল ও ৩ লাখ টাকা জরিমানাসহ উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। ২৯ ধারার বিধান অনুসারে, মানহানিকর তথ্য দিলে হবে ৩ বছরের জেল ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। এদিকে ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি বেআইনিভাবে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে কোনো ধরনের তথ্য-উপাত্ত যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তি হবে এবং এ অপরাধের শাস্তি ১৪ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। বুঝতে কারও কষ্ট হওয়ার কথা নয়, সাংবাদিকদের আপত্তিটা আসলে কোথায়। এখানে সরলভাবে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’র যে সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, তাতে গণমাধ্যমকর্মী তো বটেইÑসচেতন কোনো নাগরিককে ফাঁদে ফেলাও কঠিন নয়। এখানে আরেকটি বিষয় যুক্ত। ধারাটি প্রচ্ছন্নভাবে হলেও তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান। তদুপরি আলোচ্য ধারাগুলো বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে তথা অন্যায়ভাবে ব্যবহার হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। সম্পাদক পরিষদের আপত্তিও সম্ভবত এখানে যে, আইনের সুযোগে যেন ফাঁদ পাতা না হয়! এ অবস্থায় আইন প্রণেতা ও নীতিনির্ধারকদের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বলতে চাই, কোনো ধরনের মৌলিক দুর্বলতা যেন দরকারি এ আইনটিতে রয়ে না যায়। এটি প্রয়োগের বেলায়ও যেন যথেষ্ট সতর্কতা ও ন্যায্যতা অবলম্বন করা হয়। কেননা এতে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়ে বিতর্ক বেড়ে উঠলে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক।