উদ্যোগটি ইতিবাচক, তবে

এত দিন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। সম্প্রতি মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাসকরণের ঘটনায় তার পদোন্নতি হয়েছে মন্ত্রী হিসেবে। আর দায়িত্বটি নেওয়ার পরপরই এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রফতানির ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১ আগস্ট থেকে ইলিশসহ সব মাছ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অবশ্য পরের মাসের ২৩ তারিখেই ইলিশ ছাড়া অন্যান্য মাছের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞাটি তুলে নেওয়া হয়। এ অবস্থায় যুক্তিগ্রাহ্য কারণেই ইলিশ রফতানি বিষয়ক খবরটি গুরুত্বসহকারে পরিবেশিত হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজসহ পত্রপত্রিকায়। আমরা উদ্যোগটিকে স্বাগত জানাই এবং তার একাধিক কারণ রয়েছে।

গতকাল এ দৈনিকে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ইলিশ রফতানির অনুমতি দেবে সরকার’। সেখানে বিস্তারিত খবরে প্রতিবেদক জানিয়েছেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয় ৩ দশমিক ৯৫ লাখ টন; ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পরিমাণটি ছিল ৫ লাখ টন। এদিকে মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে, এখন প্রতিবছর দেশে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যায়, তার প্রায় ১১ শতাংশ আসে শুধু ইলিশ থেকে; আবার জিডিপিতে মাছটির অবদান নাকি ১ শতাংশের মতো। বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকার গৃহীত নানা পদক্ষেপের (মা-মাছ ধরায় নজরদারি বৃদ্ধি, মৎস্যজীবীদের প্রণোদনা প্রভৃতি) কারণে ইলিশের উৎপাদনই শুধু বাড়ছে না, অর্থনীতিতেও বাড়ছে এর অবদান। এরই মধ্যে ইলিশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস বলে আমরা জেনেছি। এখন বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রফতানি শুরু হলে অর্থনীতি তো বটেই, নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর ওপরও এর সুপ্রভাব পড়ার কথা।

স্থানীয়ভাবে ইলিশ রফতানি আরও আগে চালু হওয়া উচিত ছিল বলে অনেকের মত। প্রতিবেশী ভারতে পণ্যটির চাহিদা বরাবরই স্থিতিশীলভাবে বিদ্যমান; এর চাহিদা কমবেশি রয়েছে ইউরোপ-আমেরিকা-মধ্যপ্রাচ্যে। এদিকে বিশ্বে মোট উৎপাদিত ইলিশের সিংহভাগ আসে বাংলাদেশ থেকে। সম্প্রতি উৎস হিসেবে এ সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতীয়মান। তা সত্ত্বেও এখান থেকে বন্ধ ছিল ইলিশ রফতানি। অমন সরবরাহ সংকটে ভারতসহ আন্তর্জাতিক বাজারে ইলিশের চাহিদা কমেছে, তেমনটি কিন্তু বলা যায় না। প্রায় নিয়মিতভাবে এখান থেকে ইলিশের জোগান অব্যাহত ছিলÑপ্রধানত অনানুষ্ঠানিক পথে, এটাও সত্য। অধিক চাহিদার চাপে থাকা একটি পণ্যের অনানুষ্ঠানিক (তথা পাচারের মাধ্যমে) লেনদেন যখন বাড়ে, তখন প্রকৃতপক্ষে লাভবান হয় একটি অসাধু চক্র। ইলিশ পাচারের ঘটনায় ঠিক তেমনটিই ঘটেছে বলে অনুমান। দেখা যাচ্ছে, যারা ইলিশ ধরার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তারা দাম পাচ্ছেন না সেভাবে। অথচ পাচারের সঙ্গে জড়িতরা করছেন অস্বাভাবিক মুনাফা। এখন রফতানি সুবিধা মিললে সুবিধাবঞ্চিত স্টেকহোল্ডাররা উপকৃত হবেন বলেই বিশ্বাস। তাছাড়া জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন) স্ট্যাটাস পাওয়ার পর পণ্যটি রফতানিতে এলে তা কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ের জন্যও ইতিবাচক হবে। তবে আনুষ্ঠানিক ওই ব্যবসাটি নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে, যেন তা অভ্যন্তরীণ বাজারে কোনো কুপ্রভাব ফেলতে না পারে। অভিজ্ঞতা বলে, যে মাত্রায়ই হোকÑস্থানীয় ভোগ্যপণ্য, বিশেষত মাছের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলার সক্ষমতা রয়েছে ইলিশের। সুতরাং সতর্ক থাকা দরকার, যেন এক. ইলিশ রফতানি স্থানীয় ভোক্তার দুর্দশার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় এবং

দুই. পণ্যটি যেন যথাসম্ভব কূটনীতির বাইরে থাকে। রফতানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিষয়গুলো নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে নীতিনির্ধারকদের।