মত-বিশ্লেষণ

উন্নয়ন না সুখ, কোনটা জরুরি?

এমএফ হোসেন: তলাবিহীন ঝুড়ির কলঙ্ক থেকে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। ছয় শতাংশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (জিডিপির প্রবৃদ্ধি) বৃত্ত ভেঙে এখন সাত ছাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরে আট শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। সামাজিক অনেক সূচকে (শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার, বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি, গড় আয়ু, নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি) আমরা এখন প্রতিবেশী ভারত কিংবা পাকিস্তান থেকেও এগিয়ে। এই যে অগ্রগতি তার সুফল হিসেবে বেড়েছে মানুষের মাথাপিছু আয়। চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) এই আয় প্রাক্কলন করা হচ্ছে এক হাজার ৯৯০ ডলার।
আয় বাড়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রাতেও এসেছে পরিবর্তন। নগরজীবনে লেগেছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। পিছিয়ে নেই গ্রামীণ জনপদের মানুষও। সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন এবং তাতে ইন্টারনেট সংযোগ থাকায় পাড়াগাঁয়ের তরুণের হাতের মুঠোতেও আছে পুরো বিশ্ব। বেড়েছে শিক্ষার হার, বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ এই রাষ্ট্রের মানুষের জীবনে এসেছে বেগ, তবে লীন হচ্ছে আবেগ।
মানুষের জীবন যদি নিরাপদ না থাকে, মনে যদি সুখ না থাকে, তাহলে এই উন্নয়ন আমাদের কতটা তৃপ্তি দেবে? তাই তো উন্নয়নের সূচকের পাশাপাশি বিশ্বে চালু আছে সুখের সূচকও, যা হ্যাপিনেস ইনডেক্স নামে পরিচিত। অনেক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও এই সূচকে অগ্রগতি নেই। বরং গত বছরের চেয়ে চলতি বছর সুখের সূচকে ১০ ধাপ অবনতি হয়েছে। প্রতিবেশী ভারত কিংবা পাকিস্তান থেকে অর্থনৈতিক সূচকে এগিয়ে থাকলেও সুখের সূচকে ভুটান থেকে পিছিয়ে বাংলাদেশ।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটানই একমাত্র দেশ যারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের চেয়ে সুখের সূচককে বেশি গুরুত্ব দেয়। উন্নয়ন আপনার আয় বাড়াতে পারে, জীবনে গতি আনতে পারে; কিন্তু আপনি তাতে সুখী কি না, সে বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় ভুটান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। গৌরবের কথা হলো, তার ছাত্রজীবন কেটেছে এই দেশেই। বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি দেশ পরিচালনা করছেন, অথচ আমরা নিজেরা নিজেদের শিক্ষা কাজে লাগাতে পারছি কি?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন আলোচিত বক্তব্য হলো, দেশে স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নেই। সড়কে নামলেই আতঙ্ক ঠিকমতো বাড়ি ফেরা যাবে তো? বাংলাদেশের অর্থনীতির হালনাগাদ পর্যালোচনায় বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ২০ হাজার প্রাণ ঝরে যায়, আহত হয় অন্তত দুই লাখ মানুষ। নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত বছর শিক্ষার্থীদের আান্দোলনের পরও থেমে নেই সড়কে মৃত্যুর মিছিল ও বিশৃঙ্খলা। সবশেষ আবরারের মৃত্যু আবারও দেখিয়ে দিয়েছে সড়কে আমরা কতটা অনিরাপদ।
নারীশিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে অনন্য উদাহরণ। মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়ার পরও নারীর অগ্রগতিতে উন্নত দেশগুলোও বিস্মিত। নারীর জন্য সুযোগ-সুবিধা ও কর্মসংস্থান বাড়লেও নারীর নিরাপত্তা কি বেড়েছে? নারীর ওপর যৌন নিপীড়ন যেন এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারীরা। ছোট শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক মহিলারা পর্যন্ত ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন বলছে, ১ মে থেকে ৮ মে পর্যন্ত আট দিনে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪১ শিশু, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে পাঁচজনেরও বেশি শিশু। তাদের মধ্যে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ধর্ষণের শিকার ছেলেশিশু আছে চারজন। যৌন হায়রানির শিকার এবং পরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হলো ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী রাফিকে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০১৭ সালের প্রতিবেদন বলছে, যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতা হয়েছে এক হাজার ৮১৮টি, এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ৮১৮টি। ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হয়েছে ৪৭ নারীর এবং আত্মহত্যা করেছে ১১ জন। এদিকে এক হাজার ৫৫টি সহিংসতার বিপরীতে প্রাণ হারিয়েছে ৬২০ শিশু।
গত বছর জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছিলেন, ২০১৪ থেকে ২০১৭Ñএই চার বছরে ধর্ষণের মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ২৮৯টি, অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে চার হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। তবে কি আমরা ধর্ষণের জনপদে বাস করছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
নারীরা আজ কোথায় নিরাপদ? গণপরিবহনে অহরহ নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কর্মস্থলেও নিরাপদ নন নারীরা। এমনকি নিজের বাড়িতেও তারা যে নিরাপদ নন, সেই খবরও মাঝে মাঝে গণমাধ্যমে উঠে আসে। বাবার দ্বারা মেয়ে ধর্ষণের মতো অভিযোগও গণমাধ্যমে আসছে। #মিটু আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা দেখেছি, সমাজের অবস্থাপন্ন নারীরাও যৌন হয়রানি কিংবা ধর্ষণের হাত থেকে নিরাপদ নন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে মেয়েরা। এমনকি পঞ্চম শ্রেণিপড়–য়া এক ছাত্রী তারই প্রধান শিক্ষকদের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভবতী হয়েছে। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও যে শিক্ষার্থীরা অনিরাপদ তা প্রমাণিত। রাজধানীর রামপুরার এক মাদ্রাসায় ছাত্রীকে ধর্ষণের পর ফাঁস লাগিয়ে বাথরুমে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটছে হত্যাকাণ্ড। পরিস্থিতি এমন যে, মানুষের জীবনের মূল্য নেই। সমাজের এমন অবক্ষয়ের পেছনের কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে কেন মানুষ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট আচরণ করছে? আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কোন ধরনের উন্নয়নের দিকে যাব আমরা কি দৃশ্যমান অবকাঠামো উন্নয়ন করব, নাকি মানুষের মনে যাতে সুখ থাকে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির উন্নয়ন করব; আমরা সুখের সূচকে নজর দেব, নাকি আয় বাড়ানোর সূচকে?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রথমে বলা হয়েছে সুখী, পরে বলা হয়েছে সমৃদ্ধ দেশ গঠন করার কথা। মানুষের মনে সুখ না থাকলে, নিজেকে স্বাধীন ভাবতে না পারলে, সঠিক নিরাপত্তা না পেলে উন্নয়ন বেশি দিন টেকসই হয় না। জাতিসংঘের বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডার (এসডিজি) নাম দেওয়া হয়েছে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট। শুধু রাস্তা করলেই হবে না, তাতে যেন কেউ দুর্ঘটনার শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু শিক্ষার হার বাড়ালেই হবে না, প্রকৃত জ্ঞানার্জন যেন হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন বাড়লেই হবে না, তার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। শিশুমৃত্যুর হার কমালেই হবে না, শিশু যেন নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই আমাদের উন্নয়ন হবে টেকসই। দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি তাই আমাদের এখন সমাজ উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে। এই উন্নয়ন দুভাবে হতে পারে। একটি মানুষের মনে প্রকৃত মনুষ্যত্ব জাগরণের জন্য নৈতিকতার শিক্ষা নিশ্চিত করা। অন্যটি এবং সবচেয়ে জরুরি হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণই সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারে। এজন্যই প্রাচীনকাল থেকে আইন-আদালত ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার প্রচলন হয়ে আসছে। সমাজকে বিনষ্ট করে এমন যে কেউ যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারবে নাÑসরকারি দল বা বিরোধী দলের সমর্থক বলে কিছু থাকবে না। অপরাধী যেই হোক তার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব হবে, এমন কাউকে আমরা সমাজের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব দেব না, যে আসলে রক্ষক হয়ে ভক্ষকের কাজ করবে। এছাড়া আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে জেঁকে বসা দুর্নীতি দূর করতে হবে। মাঠপ্রশাসনে তারাই সবার আগে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হোন। তারা যেন জনগণের রক্ষাকর্তা হিসেবে থাকতে পারেন, সেজন্য তাদের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে রাজনীতি করেছিলেন। তিনি মুক্তি দিয়েছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তিনি দেশের কল্যাণে নিজেকে সঁপে গেছেন। আজ দেশের মানুষ যদি সুখী-সমৃদ্ধ হতে পারলে জাতির জনকের আত্মাও তৃপ্ত থাকবে।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

সর্বশেষ..