উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি

একসময় বাংলাদেশের কাচশিল্প ছিল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাচশিল্পে বাংলাদেশ স্বনির্ভর। বলা যায়, নীরব বিপ্লব ঘটেছে এ শিল্পে। এ শিল্পের অভূতপূর্ব উন্নতি ও সাফল্যের ব্যাপারে বর্তমানে কোনো দ্বিমত নেই। এ অবস্থানে আসার পেছনে উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেডের অবদান রয়েছে। দেশে কাচশিল্পের গোড়াপত্তন হয় এই উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেডের (ইউজিএসএফএল) মাধ্যমে।
প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে ১৯৫৯ সালে যাত্রা শুরু উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরির। দিনক্ষণের হিসাবে ওই বছরের ৩০ জুন প্রতিষ্ঠানটির পথচলা শুরু হয়। ১৯৬১ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে। পরে জনসাধারণের ব্যাপক অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ১৯৬২ সালের ২৭ অক্টোবর পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা হয় উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরিকে।
স্বাধীনতার পর এই প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়। তখন থেকে এটি একটি সরকারি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ও পরিচালিত হয়ে আসছে। সরকারের গৃহীত শিল্পনীতি অনুসারে ১৯১৩ সালের কোম্পানি আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির পদমর্যাদা নিয়মিতকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখন। ১৯৭২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রতিষ্ঠানটির যে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি হয়, তা ‘বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজেস ন্যাশনালাইজেশন (এমেন্ডমেন্ট) অর্ডিনেন্সের মাধ্যমে সংশোধন করে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই সফলভাবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি।
চট্টগ্রামের কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকায় প্রায় ৯ দশমিক আট একর জমির ওপর অবস্থিত কারখানাটি। এখানে প্রতিদিন প্রায় ২০১ লাখ স্কয়ার ফিট গ্লাস শিট তৈরি করা হয়। গ্লাস শিটগুলোর পুরুত্ব বা ঘনত্ব দুই মিমি থেকে ছয় মিমি। স্বচ্ছ কাচের পাশাপাশি ক্লিয়ার কালার রিফ্লেক্টিভ, মারকারিসহ নকশাদার কাচ উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি।
দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীদের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি। এখানে কর্মরত প্রায় ৩০০ কর্মী। কর্মীদের সম্পদ বিবেচনা করা হয় এখানে। তাদের জন্য আবাসিক
সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে এবং উন্নত চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে মেডিক্যাল সেন্টার। শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মেধাবী সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি কিংবা মেধাবৃত্তি চালু করা হয়েছে। এজন্য প্রতিবছর তাদের জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। কর্মীদের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। চিত্তবিনোদনের জন্য নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। খেলাধুলার ব্যবস্থা, ক্লাব, গোষ্ঠী বিমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, বোনাস, ওভারটাইম, কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন পুরস্কার, মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ প্রভৃতি বরাদ্দ রয়েছে তাদের জন্য। কর্মীদের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পণ্যের গুণগত মানের উৎকর্ষ সাধন, উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও বিক্রিমূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণ করে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা উন্নয়নে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। সংগত কারণে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকদের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন, বিপণনসহ সার্বিক কর্মযজ্ঞ সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়।
পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুনাম রয়েছে উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরির। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য কারখানা গেট সংলগ্ন ও অভ্যন্তরীণ এলাকায় বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ একটি কারখানার উৎপাদনের পূর্বশর্ত। এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বেশ সজাগ। তাদের আন্তরিকতা, প্রচেষ্টা ও সময়োচিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় সৃষ্ট যান্ত্রিক ও কারিগরি ত্রুটি তাৎক্ষণিক সমাধান করা হয়। অতিবৃষ্টি কিংবা জোয়ারের পানিতে কারখানার প্রায় সম্পূর্ণ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয় প্রায়ই। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখানে ডোলোমাইট বিন, সোডা অ্যাশ বিনসহ স্থাপনাগুলো উঁচু করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা কমানোর লক্ষ্যে ড্রেন খনন, খাল পরিষ্কার প্রভৃতি করা হয় প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও ড্রেনের সংস্কার করা হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি। প্রতিষ্ঠানটি অন্যদের তুলনায় দেশীয় কাঁচামাল বেশি ব্যবহার করে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে আমদানি-বিকল্প কাচ উৎপাদনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে থাকে। এর মাধ্যমে জাতীয় কোষাগারে শুল্ক, কর, ভ্যাট দিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।
উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরির বর্তমান ব্যবস্থাপনা টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার সুদীপ মজুমদার। তিনি প্রতিষ্ঠানটির
২১তম ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

রতন কুমার দাস