উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ুক

দেশে বিনিয়োগে একধরনের মন্দা চলছে। গত দুই বছরে ব্যাংক খাতে শিল্পঋণের চাহিদা কমাটা তারই প্রকাশ। চাহিদা কমলেও এককভাবে শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ বেশি। এর পরেই রয়েছে ব্যবসা খাত, আমদানি ঋণ, নির্মাণ খাত ও ভোক্তাঋণ। সব মিলিয়ে ব্যাংকঋণের অর্ধেকেরও বেশি (৫৮ শতাংশ) যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত এ খবর অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ বেড়ে গেলে তা অর্থনীতির গতিকে মন্থর করে দেয়। উৎপাদনশীল খাতে বিতরণ হলে ঋণের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়। এতে আয় বেশি হয়, বেশি লোকের কর্মসংস্থান হয়। রফতানিমুখী শিল্পে ঋণ দিলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে। যেসব পণ্য আমদানি হয়, সেগুলো স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা গেলে আবার বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে। আমাদের আয়ের বড় উৎস রেমিট্যান্স। কিন্তু রেমিট্যান্সের অর্থও উৎপাদনশীল খাতে কম ব্যবহার হয়।

সরকারও ব্যাংকঋণ নেয়। বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের ঋণ বাড়ছে। কিন্তু সরকার তো ব্যবসায়ী নয়। সরকারের নেওয়া ঋণও ব্যবহার হয় অনুৎপাদনশীল খাতে। ঋণ নিয়ে রাস্তাঘাট সংস্কার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ প্রভৃতিতে ব্যয় করে সরকার। তা অবশ্য পরোক্ষভাবে উৎপাদনশীল খাতে অবদান রাখে। সরকারের চেয়ে ব্যক্তিখাতে ঋণের ব্যবহারই যথাযথ হয়। সরকার অন্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। বিদেশি সংস্থা থেকে বা কর বাড়িয়েও সেটা করতে পারে সরকার। সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়ে গেলেও ব্যক্তিনির্ভর উৎপাদনশীল খাতে ঋণ কমে যেতে পারে। সেটা ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণ করা চাই।

ব্যাংক খাতে গত আট বছরের ঋণপ্রবাহ পর্যালোচনায় দেখা যায়, মেয়াদি ও চলতি মূলধন ঋণ উভয় ক্ষেত্রেই বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই ঋণপ্রবাহ বেশি। বৃহৎ অঙ্কের এসব ঋণ ঝুঁঁকিও তৈরি করছে। নির্দিষ্ট খাত ও শিল্পগ্রুপের কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। ব্যাংক খাতের জন্যও এটি ভালো নয়। তাই ঋণ বিতরণে তাদের বৈচিত্র্য আনতে হবে। বড় ঋণগ্রহীতাদের অনেকে প্রভাব খাটিয়ে কম সময়ে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই ঋণ পেয়ে যান। ঋণ পরিশোধেও অনিয়ম করেন তারা। খেলাপিও হন কেউ কেউ।

ঋণ আদায় তথ্য হালনাগাদ, স্বচ্ছতার সঙ্গে নজরদারিসহ সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিতরণ বাড়বে। এজন্য কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতে ঋণ বিতরণ বাড়াতে হবে। যথাসময়ে ঋণ পরিশোধকারীকে প্রণোদনা, কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। করা যেতে পারে সিআইপি। প্রান্তিক ও স্বল্পদক্ষ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে, এমন খাতেও ঋণ বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ালেই হবে না, সেটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেই আমাদের আশা।