মত-বিশ্লেষণ

ঋণের শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি

মোশারফ হোসেন: সম্প্রতি ঋণ শ্রেণিকরণের সময় বাড়িয়ে পরিপত্র জারি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যাপারে ব্যাংকটি কিছুটা উদারতা অবলম্বন করেছে। এতে করে ব্যাংকিং বিষয়ের পণ্ডিত ব্যক্তি থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ ও জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তকে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই সমালোচনা করছেন। তাই শ্রেণিকরণের বিষয়টি ব্যাংকারদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। এ বিষয়ে অনেকের মধ্যেই অস্পষ্টতা লক্ষ করলাম। তাই এ বিষয়ে একটু বিশদ আলোকপাতের প্রয়োজন অনুভব করছি।
আমানতকারীদের আমানতের সুরক্ষাকল্পে এবং ব্যাংকের আগ্রাসী বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণে তথা ঋণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রদান ও আদায়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিপালনীয় বিধানের আওতায় নিয়ে আসে। তারই একটি ‘ঋণ শ্রেণিকরণ’ ও তদানুসারে ‘প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি/সংস্থান)’ সংরক্ষণ। ঋণ প্রদানকালে ব্যাংক যেন যাচাই-বাছাই করে সঠিক খাতে, সঠিক ব্যক্তিকে, সঠিক পদ্ধতিতে ঋণ প্রদান করে এবং বিতরণ করা ঋণ আদায়কল্পে নির্দিষ্ট কাঠামো ও পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে ব্যাংক যেন ত্বরিতকর্মা থাকে সে কারণে ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। একই কারণে ঋণখেলাপের স্ট্যাটাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে প্রভিশন সংরক্ষণের হারও। ফলে অনাদায়ী ঋণের অনাদায়ী অবস্থার উল্লম্ফলন ও পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে প্রভিশনের পরিমাণও, যা চাপ তৈরি করে ব্যাংকের আয়ের ওপর, ঋণ সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ সক্ষমতার ওপরও। কারণ, প্রভিশন সংরক্ষণের কারণে ব্যাংকের আয়ের একটি বড় অংশ অলস অর্থ হিসেবে পড়ে থাকে ‘প্রভিশন রিজার্ভ’ হিসেবে, যা ব্যাংক ভোগ বা খরচ করতে পারে না, লভ্যাংশ হিসাবে বণ্টন করে দিতে পারে না শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে, নিতে পারে না রিটেইল্ড আর্নিংস হিসেবে মূলধন খাতে, এমনকি তা ঋণ হিসেবেও দিতে পারে না কাউকে, করতে পারে না লাভজনক কোনো খাতে (ট্রেজারি বিল, বন্ড) বিনিয়োগ। উল্টো আয় বিবেচনায় এই প্রভিশনের ওপরও ৪০ শতাংশ হারে কর গুনতে হয় ব্যাংকগুলোকে (পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে সাড়ে ৩৭ শতাংশ)! তাই প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা যেন অনেকটাই ব্যাংকের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়ার শামিল।
ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতা পঙ্গুকরণে খেলাপি ঋণের বিধ্বংসী ভূমিকা বুঝতে বর্তমান সময়ে সব শ্রেণির ব্যাংকারকেই ঋণের শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখা উচিত। তা না হলে ঋণের অসুখ অনুযায়ী চিকিৎসা তথা আদায় কার্যক্রম উপেক্ষিত হবে। অন্যদিকে সঠিক নিয়মে ও হারে প্রভিশন সংরক্ষণ না করার কারণে জরিমানা ও শাস্তিও গুনতে হতে পারে। একইভাবে ভুল হিসাবায়নের জন্য বেড়ে যেতে পারে প্রভিশনের পরিমাণ, যা কমিয়ে দিতে পারে ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা। তাই প্রভিশনের হিসাবায়ন বুঝতেই হবে ব্যাংকারকে। তবে প্রভিশনিং বুঝতে প্রথমেই বুঝতে হবে ঋণের শ্রেণিকরণ।
যে কোনো ঋণ মঞ্জুরির আগে অথবা পরে সংশ্লিষ্ট ঋণের জামানত (জামানতযুক্ত/জামানতবিহীন), খাত (কৃষি/এসএমই), মেয়াদ (স্বল্পমেয়াদি/দীর্ঘমেয়াদি), লেনদেনের ধরন (চলতি/ওডি), ঋণগ্রহীতা (চাকরিজীবী/ব্যবসায়ী), পরিশোধ পদ্ধতি (চাহিবামাত্র/এককালীন/নির্ধারিত কিস্তিভিত্তিক/অনির্ধারিত কিস্তিভিত্তিক), উদ্যোগের আকার (ক্ষুদ্র/মাঝারি), উদ্যোগের ধরন (ব্যবসা/সেবা/শিল্প), উদ্যোক্তার লিঙ্গ (নারী উদ্যোক্তা/পুরুষ উদ্যোক্তা), ঋণের উদ্দেশ্য (স্থায়ী মূলধন/চলতি মূলধন) প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় ঋণটিকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিভুক্ত করতে হয়। এই শ্রেণিভুক্তির ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট ঋণটি একটি নির্দিষ্ট ঋণপণ্যের আওতাভুক্ত হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে ঋণের সুদ, পরিমাণ, পরিশোধের সময়, অন্যান্য শর্তাবলি নির্দিষ্ট হয় এবং বিতরণ পরবর্তী সময়ে প্রভিশনের হারও নির্ধারিত হয়। তবে ব্যাংকভেদে ঋণের ধরনে অভিন্নতা আনয়নের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যাংক ঋণ ও অগ্রিমকে চারটি ভাগে ভাগ করেছে যথা: ‘চলতি’, ‘তলবি’, ‘স্থায়ী মেয়াদি’, ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ’। অর্থাৎ কোনো ব্যাংক একটি ঋণ অনুমোদন করতে চাইলে ওই ঋণটিকে ওই চার ধরনের ঋণের যে কোনো একটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটি এক ধরনের ঋণ শ্রেণিকরণ, যা সাধারণত ঋণ মঞ্জুরির আগেই ব্যাংকারকে নির্ধারণ করে ফেলতে হয়। আবার মঞ্জুরি-পরবর্তী সময়ে বিতরণ করা সব ঋণ ও অগ্রিমকে তাদের মেয়াদ-উত্তীর্ণের কাল, আদায়ের গুণগত মান এবং অন্তর্নিহিত প্রাসঙ্গিক ঝুঁকি (জামানত, ডকুমেন্টেশন, লেনদেন, মুনাফা, তারল্য, নগদ প্রবাহ প্রভৃতি) বিবেচনায় বিভিন্ন শ্রেণিভুক্ত (যথা: স্ট্যান্ডার্ড, এসএমএ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল, ব্যাড/লস) করার প্রক্রিয়াও এক ধরনের ঋণ শ্রেণিকরণ বা ঋণ শ্রেণিবিন্যাসকরণ (লোন ক্লাসিফিকেশন)। ঋণ শ্রেণিকরণ বলতে পরবর্তী আলোচনায় আমরা ঋণ বিতরণ-পরবর্তী এই বিভাজনগুলোকেই বুঝব।
ঋণ শ্রেণিকরণ এবং প্রভিশনিং বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে মাস্টার সার্কুলার (বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৪/২০১২) জারি করে। ওই মাস্টার সার্কুলারের পর আরও ১১টি সার্কুলারের (বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৯/২০১২, ০৫/২০১৩, ১৬/২০১৪, ০৮/২০১৫, ১২/২০১৭, ১৫/২০১৭, ০১/২০১৮, ০৭/২০১৮, ১৩/২০১৮, ০৩/২০১৯ এসিএফআইডি সার্কুলার লেটার নং ০১/২০১৩) মাধ্যমে ওই মাস্টার সার্কুলারের বিভিন্ন ধারা ও উপধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকের ঋণ শ্রেণিকরণ প্রভিশনিং-সংক্রান্ত বিষয়ে সম্পূর্ণ এবং সর্বশেষ বিধান জানতে একজন ব্যাংকারকে এই ১২টি সার্কুলারের প্রায় সবগুলোই ঘেঁটে দেখতে হয়; ফলে সর্বশেষ কার্যকর বিধান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে গিয়ে অনেক সময় ব্যাংকারকে কিছুটা দ্বন্দ্বের মধ্যেও পড়ে যেতে হয়। কিন্তু শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিংয়ের এ বিষয়টি অত্যন্ত সহজ করে দেওয়া যেত, যদি সবগুলো সার্কুলার সমন্বিত করে সর্বশেষ সার্কুলারটি প্রকাশ করা হতো।
ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিংয়ের মাস্টার সার্কুলারে সব ঋণ ও অগ্রিমকে তাদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য (যা নিবন্ধনের শুরুতেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে) বিবেচনায় চার ভাগে চলতি ঋণ, তলবি ঋণ, স্থায়ী মেয়াদি ঋণ, স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণে ভাগ করা হয়েছে। বিতরণের পূর্বেই ঋণের এই বিভাজন করে ফেলা হয়। নিন্মে এই চার ধরনের ঋণের কিছুটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
চলতি ঋণ: চলতি ঋণে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে (এক্সপায়ারি ডেট) অনুমোদিত সীমার (লিমিট) মধ্যে ইচ্ছেমত লেনদেন (যতবার খুশি টাকা জমা বা উত্তোলন) করা যায়। যেমন: ক্যাশ ক্রেডিট (সিসি) ও ওভারড্রাফট (ওডি) ঋণ। নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে (সাধারণত এক বছর) ঋণটি সুদসহ পরিশোধ করে বন্ধ করে দিতে হয় অথবা ঋণের শর্ত পরিপালনসাপেক্ষে নতুন মেয়াদে নবায়ন করে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
তলবি ঋণ: যেসব স্বল্পমেয়াদি ঋণ নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে (কয়েকদিন বা কয়েক মাস, যেমন ৯০ দিন, ১২০ দিন, ১৮০ দিন) অথবা ব্যাংক কর্তৃক দাবিমাত্র পরিশোধযোগ্য, সেসব ঋণকে তলবি ঋণ বলে। প্রচ্ছন্ন দায় বা সম্ভাব্য দায় (কন্টিনজেন্ট লায়াবিলিটি) অথবা অন্য কোনো দায়ের বিপরীতে সৃষ্ট বাধ্যতামূলক ঋণও (নিয়মিত ঋণ হিসেবে পূর্বানুমোদন ব্যতীত সৃষ্ট ঋণ) তলবি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। যেমন: ফোর্সড লোন অ্যাগেইনস্ট মার্চেন্ডাইজ, পেমেন্ট অ্যাগেইনস্ট ডকুমেন্ট, ফরেন বিলস পারচেজড, ইনল্যান্ড বিলস পারচেজড প্রভৃতি। যেসব ঋণ পরিশোধের জন্য কোনো নির্ধারিত কিস্তি (ফিক্সড ইনস্টলমেন্ট সাইজ) বা নির্ধারিত পরিশোধসূচি (ফিক্সড রি-পেমেন্ট শিডিউল) থাকে না; অর্থাৎ ঋণগ্রহীতা ঋণের মেয়াদকালে সময় সময় যে কোনো অঙ্ক জমা দিয়ে (টোকেন পেমেন্টস পিরিয়ডিক্যালি) অথবা মেয়াদান্তে সুদসহ এককালীন পরিশোধ (পেমেন্ট ইন অ্যা সিঙ্গেল গো) করতে পারেন, সেসব ঋণও তলবি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। টাইম লোন (বুলেট লোন) ও ফাইন্যান্সিয়াল অবলিগেশনের বিপরীতে এককালীন বিতরণ করা নবায়ন-অযোগ্য ওভারড্রাফট ঋণও তলবি ঋণ।
স্থায়ী মেয়াদি ঋণ: দীর্ঘ মেয়াদে (সাধারণত কয়েক বছর) একটি নির্দিষ্ট পরিশোধসূচি অনুযায়ী (যেমন: ৬০টি সমান মাসিক কিস্তিতে বা ১২টি সমান ত্রৈমাসিক কিস্তিতে) পরিশোধযোগ্য ঋণ স্থায়ী মেয়াদি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে, যেমন- হাউজিং ঋণ।
স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ: বাংলাদেশ ব্যাংকের এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্টের (এসিএফআইডি) বার্ষিক ঋণ প্রকল্পের তালিকাভুক্ত স্বল্পমেয়াদি ঋণ কিংবা কৃষি খাতে বিনিয়োজিত অনধিক ১২ মাসে পরিশোধযোগ্য ঋণ স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ ১২ মাস মেয়াদে পরিশোধযোগ্য অনধিক ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত যে কোনো ক্ষুদ্রঋণ স্বল্পমেয়াদি ক্ষুদ্র ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ঋণ মঞ্জুর হলো, ডকুমেন্টেশন সম্পাদন হলো, সর্বশেষে বিতরণও হয়ে গেল। ব্যাংকারের জন্য এবার অপেক্ষা করছে ঋণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কার্যবিতরণকৃত ঋণের মনিটরিং ও আদায় কার্যক্রম। আদায় প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে ব্যাংকার লক্ষ করে দেখতে পান, তার বিতরণ করা কিছু ঋণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আদায় হচ্ছে, কিছু ঋণ আদায়ে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, কিছু ঋণ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও আদায় হচ্ছে না। তাই এ পর্যায়ে ব্যাংকারকে তার বিতরণ করা ঋণগুলোর স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে হয়। অর্থাৎ কে সুস্থ, কে অসুস্থ এবং যারা অসুস্থ, তাদের কার কি অসুখ, তা এবার প্যাথলজিক্যাল টেস্টিং করিয়ে ডায়াগনোসিস করতে হয়। শেষে কার কী দাওয়াই তা প্রেসক্রাইব করতে হয়। এ প্রক্রিয়াটিই হচ্ছে ব্যাংক ঋণের প্রচলিত শ্রেণিকরণ। এ পর্যায়ে বিতরণ করা সব ঋণকে তাদের মেয়াদোত্তীর্ণের কাল বিবেচনায় পাঁচটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়; যথা: স্ট্যান্ডার্ড, এসএমএ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল, ব্যাড/লস। আয় উৎসারী (যেসব ঋণ হতে ব্যাংকের সুদ আয় হয়) স্ট্যান্ডার্ড ও এসএমএ মানের ঋণগুলোকে ‘অশ্রেণিকৃত ঋণ বা পারফর্মিং লোন’ আর যেসব ঋণ হতে ব্যাংকের সুদ আয় হয় না, অর্থাৎ সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল ও ব্যাড/লস মানের ঋণগুলোকে ‘শ্রেণিকৃত ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন’ হিসেবে বিভাজিত করা হয়। তবে এই শ্রেণিকরণের সুবিধার্থে শুরুতেই ঋণটির পাস্ট ডিও বা ওভারডিও স্ট্যাটাস নির্ণয় করে নিতে হবে।
পাস্ট ডিও/ওভারডিও: ঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া আর ওভারডিও/পাস্ট ডিও হওয়াকে একই অর্থ বহন করে মনে করলে ভুল হবে। কারণ শ্রেণিকরণ-সংক্রান্ত সর্বশেষ বিআরপিডি সার্কুলার নং ০৩/২০১৯ মতে, কোনো ঋণ মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেই কিংবা মাসিক কোনো কিস্তি অনাদায়ী হলেই তাকে ‘পাস্ট ডিও’ বা ‘ওভারডিও’ বলা যাবে না। শ্রেণিকরণের জন্য প্রথমে ঋণের মেয়াদোত্তীর্ণের পরবর্তী সময়কাল (কত মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ) বা অনাদায়ী মাসিক কিস্তি সংখ্যা বিবেচনায় ঋণের ওভারডিও বা পাস্ট ডিও স্ট্যাটাস নির্ধারণ করা হয়। এরপর ওভারডিও/পাস্ট ডিও হওয়ার পরবর্তী সময়কাল (কত মাসের ওভারডিও/পাস্ট ডিও) বিবেচনায় এসএমএ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল, ব্যাড/লস স্ট্যাটাস নির্ধারণ করা হয়। ‘চলতি ঋণ’ ও ‘তলবি ঋণ’ মেয়াদোত্তীর্ণের পরদিন থেকেই ওভারডিও হিসেবে বিবেচিত হবে; অন্যদিকে ‘স্থায়ী মেয়াদি ঋণ’ ও ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ওভারডিউ হবে মেয়াদোত্তীর্ণের পর ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর। স্থায়ী মেয়াদি ঋণে সম্পূর্ণ ঋণকে ওভারডিও না ধরে অনাদায়ী কিস্তির অংশই কেবল ওভারডিও হিসেবে বিবেচিত হবে; তবে শ্রেণিকৃত হলে সম্পূর্ণ ঋণের স্থিতিই শ্রেণিকৃত হিসেবে বিবেচ্য হবে।
স্ট্যান্ডার্ড: সব নিয়মিত ঋণই (এসএমএ বা শ্রেণিকৃত নয় এমন ঋণ) স্ট্যান্ডার্ড ঋণ।
এসএমএ: ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ব্যতীত যে কোনো ঋণ দুই মাস ওভারডিও/পাস্ট ডিও থাকলে (অর্থাৎ ওভারডিও হওয়ার পর আরও দুই মাস অতিবাহিত হলে) তা এসএমএ হিসেবে বিবেচিত হবে। মেয়াদ (এক্সপাইরি) বিবেচনায় ‘চলতি ঋণ’ ও ‘তলবি ঋণ’ এসএমএ হবে মেয়াদোত্তীর্ণের দুই মাস পর, ‘স্থায়ী মেয়াদি ঋণ’ এসএমএ হবে আট মাস পর। ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণে’ এসএমএ শ্রেণিমান প্রযোজ্য নয়।
সাব-স্ট্যান্ডার্ড: ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ব্যতীত অন্যান্য ঋণ তিন মাস বা ততোধিক সময়; তবে ৯ মাসের কম সময় ওভারডিও থাকলে সাব-স্ট্যান্ডার্ড মানে শ্রেণিকৃত হবে। মেয়াদ বিবেচনায় ‘চলতি ঋণ’ ও ‘তলবি ঋণ’ সাব-স্ট্যান্ডার্ড হবে মেয়াদোত্তীর্ণের তিন মাস পর, ‘স্থায়ী মেয়াদি ঋণ’ সাব-স্ট্যান্ডার্ড হবে ৯ মাস পর এবং ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ সাব-স্ট্যান্ডার্ড হবে ১২ মাস পর।
ডাউটফুল: ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ব্যতীত অন্যান্য ঋণ ৯ মাস বা ততোধিক সময়, তবে ১২ মাসের কম সময় ওভারডিও থাকলে ডাউটফুল মানে শ্রেণিকৃত হবে। মেয়াদ বিবেচনায় ‘চলতি ঋণ’ ও ‘তলবি ঋণ’ ডাউটফুল হবে মেয়াদোত্তীর্ণের ৯ মাস পর, ‘স্থায়ী মেয়াদি ঋণ’ ডাউটফুল হবে ১৫ মাস পর এবং ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ডাউটফুল হবে ৩৬ মাস পর।
ব্যাড/লস: ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ’ ব্যতীত অন্যান্য ঋণ ১২ মাস বা ততোধিক সময় ওভারডিও থাকলে ব্যাড/লস মানে শ্রেণিকৃত হবে। মেয়াদ বিবেচনায় ‘চলতি ঋণ’ ও ‘তলবি ঋণ’ ব্যাড/লস হবে মেয়াদোত্তীর্ণের ১২ মাস পর, ‘স্থায়ী মেয়াদি ঋণ’ ব্যাড/লস হবে ১৮ মাস পর এবং ‘স্বল্পমেয়াদি কৃষি ও ক্ষদ্র ঋণ’ ব্যাড/লস হবে ৬০ মাস পর। (চলবে)

ব্যাংক কর্মকর্তা
[email protected]

সর্বশেষ..