ঋণ কেলেঙ্কারি ও ব্যাংক খাতের শুদ্ধাচার প্রসঙ্গ

আবদুল মকিম চৌধুরী: দিন কয়েক আগে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখায় গিয়েছিলাম অ্যাকাউন্ট খুলতে। একটি আয়নায় বাঁধাই করা একটি বোডে একটি ছড়া মুদ্রিত লাখো শহিদের রক্তে ভেজা/আমাদের এই বাংলাদেশ/শুদ্ধাচারে ঋদ্ধ হবে/দুর্নীতিকে করব শেষ। কর্মকর্তাকে জিগ্যেস করি, এটি কার লেখা। তিনি বললেন, প্রধানমন্ত্রীর বাণী হবে হয়তো। বলি, না অন্য কারও হবে। উঠে গিয়ে দেখি, ছড়াকারের নাম সাগর আশরাফ।

এ-জাতীয় ছড়া আমরা আরও ব্যবহার করি বলেই এ ফোর সাইজের একটি খাম দেখালেন ওই ব্যাংক কর্মকর্তা। তাতে মুদ্রিতÑশুদ্ধাচার ও শিষ্টাচার/সভ্য জাতির অহংকার/করলে সবাই চেষ্টা/এগিয়ে যাবে দেশটা। গতকাল (৭ ফেব্রুয়ারি) একই ধরনের একটি খাম দেখিয়ে ছড়াটি আবৃত্তি করে সহকর্মী মাজেদ বললেন, কথাগুলো খুব সুন্দর। বলি, ‘এখানে ভুল আছে। ছড়াকারের নাম নেই। এটির ছড়াকার ফারুক নওয়াজ।’

শিশুদের মধ্যে নৈতিকতা বোধ জাগ্রত করতে সরকারের ঘোষিত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের অংশ হিসেবে একটি বই প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মাহফুজুর রহমান সম্পাদিত এ বইয়ের নকশা ও চিত্রে এঁকেছেন হাশেম খান।

২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘ছড়ায় ছড়ায় শুদ্ধাচার’ নামের বইটিতে ৪৭ জন ছড়াকারের দুটি করে এবং ছয়জন ছড়াকারের একটি করে মোট ১০০টি ছড়া স্থান পেয়েছে। ছড়াগুলোতে দেশের আর্থিক খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলে ধরে এগুলোর প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করা হয়েছে।

ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ভবনে বা কার্যালয়ে প্রবেশপথের এলইডি স্ক্রল, ব্যবহার্য ফরম খামে এসব ছড়া সেøাগান হিসেবে ব্যবহার করে। ওয়ান ব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত যাত্রীছাউনিতে লেখা আখতার হুসেনের ছড়াÑঅন্যায় করে পার পেতে পারো/জানবে না কেউ কিছু/কিন্তু তোমার বিবেক রয়েছে/ছাড়বে না সে তো পিছু। কয়েক দিন আগে পত্রিকায় প্রকাশিত উত্তরা ফাইন্যান্সের বিজ্ঞাপনেও দেখি ছড়াটি ব্যবহার হয়েছে।

ছড়া আছে ১০০টি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মিলিত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। ফলে কোনো ছড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সেøাগান হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। জানি না, এজন্য ছড়াকারকে কোনো রয়্যালটি দেওয়া হয় কি না। দুটি ছড়া আলোচ্য বইয়ে স্থান পেয়েছে, এমন একজন ছড়াকার জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দুই হাজার টাকা পেয়েছেন কড়কড়ে নতুন ২০ নোটের।

বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান বলেছেন, ‘শুদ্ধাচার মানেই সুশাসন। আর সুশাসন মানেই স্বচ্ছতা। আমরা ব্যাংকগুলোকে সেই আলোর নিচে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি।’ সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো এখনও ‘অন্ধকারে’ রয়ে গেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এদেরকে এখনও সম্পূর্ণ ডিজিটাইজড করা সম্ভব হয়নি।

বইটির প্রাক্-কথনে ড. আতিউর রহমান বলেছেন, ‘… সুশাসনের জন্য দরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অংশীদারত্ব। সমাজের সব ক্ষেত্রে এগুলো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। আর সবচেয়ে জরুরি হলো শিশুদের মধ্যে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা করা।’

সম্প্রতি একক ব্যক্তির বৃহত্তম ঋণ কেলেঙ্কারিতে যে ব্যাংকটির নাম উঠে এসেছে, সেই জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের প্রবেশদ্বারের এলইডি স্ক্রলে ফারুক নওয়াজের উপরিউক্ত ছড়ার পাশাপাশি আরেকটি ছড়া রয়েছে। সেটি হলোÑন্যায্য বিচার উচিত কথা/সত্য পথে চলায়/ফুলের মালা দাও পরিয়ে/ঐ লোকটার গলায় (নাসের মাহমুদ)। ব্যাংকটির কাগজপত্রে সাগর আশরাফের উল্লিখিত ছড়ার পাশাপাশি রহীম শাহ রচিত একটি ছড়া ব্যবহার করেÑ শুদ্ধাচারে ফুটে উঠুক/শুদ্ধতম হাসি/আমার সোনার বাংলা আমি/তোমায় ভালোবাসি।

শুদ্ধাচার কী, নাগরিক মাত্রেই জানেন। এটি এমন নয়, যে একেক জনের ক্ষেত্রে একেক মানদণ্ড। একটি ব্যাংকের সাধারণ কর্মী ও সর্বোচ্চ নির্বাহী যদি অর্থ আত্মসাৎ করেন, তাহলে কি বলা যাবে এদের একজন ভুল করছেন অন্যজন করেননি। প্রভাবশালী হওয়ায় কিংবা ক্ষমতাসীনদের সুদৃষ্টির কারণে এ ধরনের অপরাধী আইনের আওতায় না এলেও তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধাবোধ কমে।

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল, ২০১২-তে শুদ্ধাচারের ধারণায় বলা হয়েছে, ‘শুদ্ধাচার বলতে সাধারণভাবে নৈতিকতা ও সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকর্ষ বোঝায়। এর দ্বারা একটি সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদণ্ড, নীতি প্রথার প্রতি আনুগত্যও বোঝানো হয়। ব্যক্তিপর্যায়ে এর অর্থ হলো কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততা তথা চরিত্রনিষ্ঠা। এ দলিলটিতেও শুদ্ধাচারের এ অর্থটিকে গ্রহাণ করা হয়েছে। ব্যক্তির সমষ্টিতেই প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয় এবং তাদের সম্মিলিত লক্ষ্যই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রতিফলিত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তিপর্যায়ে শুদ্ধাচার অনুশীলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; সমন্বিত রূপ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধাচার অনুশীলনও জরুরি।’

শুদ্ধাচার কৌশল অনুযায়ী শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন করতে হবে এমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হলো নির্বাহী বিভাগ ও জনপ্রশাসন, জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেল, সরকারি কর্মকমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল, দুর্নীতি দমন কমিশন ও স্থানীয় সরকার।

আবার শুদ্ধাচার কৌশল অনুযায়ী শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন করতে হবে এমন অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হলো রাজনৈতিক দল, বেসরকারি খাতের শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও সুশীল সমাজ, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম।

শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে সব রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শুদ্ধাচার বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপট, চ্যালেঞ্জ, লক্ষ্য, স্বল্পমেয়াদি সুপারিশ, দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশসহ কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।

কীভাবে শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে পথনির্দেশনাও উল্লেখ রয়েছে শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে। এতে বলা হয়েছে ‘জাতীয় শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন ইউনিট’ শুদ্ধাচার সম্পর্কিত সব প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও সমন্বয় করে জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করবে। বাস্তবায়ন ইউনিট জাতীয় পরিষদের সব নির্দেশনা ও পরামর্শ মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য ইউনিটকে অবগত করবে এবং তাদের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ করবে। পরিবীক্ষণ ও পর্যালোচনার জন্য বাস্তবায়ন ইউনিট প্রয়োজনবোধে কোনো উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানকেও নিয়োগ দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে গবেষণা পরিচালনা, বিশেষ প্রয়োজনে তথ্য সংগ্রহ, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও পদ্ধতির উন্নয়ন এবং লোকবলের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য জাতীয় ইউনিট যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্র অনুসারে শুদ্ধাচার বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। সরকারই এটিকে উপেক্ষা করেছে বলে প্রতীয়মান। শুদ্ধাচার কৌশলপত্রেই ন্যায়পাল ও তার দফতরে শুদ্ধাচার চর্চার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদের আওতায় ন্যায়পাল আইন পাস হয়েছে। অথচ ন্যায়পাল নিয়োগ এবং ন্যায়পালের দফতর প্রতিষ্ঠা এখনও অসম্পন্ন রয়েছে।

ব্যাংকগুলোয় জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের ফোকাল পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে। জনতা ব্যাংকে মহাব্যবস্থাপক পদবিধারী এক কর্মকর্তা এ ফোকাল পয়েন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও রয়েছে ন্যাশনাল ইন্টিগ্রিটি স্ট্র্যাটেজি ফোকাল পয়েন্ট। শুদ্ধাচার রক্ষায় এত আয়োজন-আনুষ্ঠানিকতার পরও জনতা ব্যাংক ‘একক ব্যক্তির ঋণে বৃহত্তম কেলেঙ্কারি’তে জড়িত হয়ে আলোচনায় উঠে আসে। একটি জাতীয় দৈনিকে ওই শিরোনামের প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলোÑএক. এক গ্রাহককেই পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ। দুই. নিয়মের বাইরে মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ। তিন. সাবেক চেয়ারম্যান আবুল বারকাতের সময়ে অনুমোদন। চার. জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন দুই হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে। পাঁচ. এক গ্রাহক ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পেতে পারেন না।

তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াল। আমাদের জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্র আছে, আছে বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তবায়ন কমিটি। কিন্তু পাশাপাশি বড় বড় দুর্নীতি-কেলেঙ্কারিও আছে। আমরা কিনা শিশুদের মধ্যে নৈতিকতা জাগ্রত করতে আমরা শিশুতোষ বই প্রকাশ করছি। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের নৈতিকতা রোধে উদ্বুদ্ধ করা জরুরি। কিন্তু নৈতিকতায় আমরা কী দৃষ্টান্ত রাখছি। কেবল ছড়া দিয়ে কি শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ কেলেঙ্কারিতে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবুল বারকাতের বড় ভূমিকা রয়েছে। অর্থমন্ত্রীও স্বভাবসুলভ ভাষায় বলে দিয়েছেন, ‘জনতা ব্যাংক একসময় সেরা ব্যাংক ছিল। কিন্তু আবুল বারকাতই ব্যাংকটি শেষ করে দিয়েছেন।’

ব্যাংকপাড়ায় আলোচিত নতুনভাবে জনতা ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির মূল ব্যক্তি আবুল বারকাত। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে অনেকটা নিশ্চুপ তিনি। এড়িয়ে যাচ্ছেন ইস্যুটি। নানা কৌশলে আড়াল করছেন নিজেকে। কায়িকভাবে নিজেকে আড়াল করা মানে দায় স্বীকার করে নেওয়া। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ তো তার গবেষণাকে আকর হিসেবে নেয়। কেলেঙ্কারি তো তার অর্জনকে ম্লান করে দেবে।

বছর দশেক আগে ‘গ্রামীণফোনের রাজস্ব ফাঁকি ও কলচার্জ প্রতারণা’ শীর্ষক লেখা পাঠিয়েছিলাম একটি পত্রিকায়। চিঠি পাঠিয়ে ডেকে নিলেন সম্পাদক, লেখা নিয়ে কথা বলবেন। তিনি জানালেন, ‘আপনি যেভাবে লিখেছেন, আমি ধরে নিয়েছি ড. আবুল বারকাতের মতো কোনো খ্যাতনামা ব্যক্তির গবেষণা থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়েছেন।’ তাকে বিনয়ের সঙ্গে বলি, তিনি তো এ বিষয় নিয়ে গবেষণা করবেন না। তিনি বললেন, হয়তো তা-ই।

বিশেষ বিষয়ে গবেষণায় আগ্রহ আবুল বারকাতের। এমন গবেষণা করেছেন, যেন সেটিই দেশের মৌলিক সমস্যা। তার একটি গবেষণা হলো মৌলবাদের অর্থনীতি নিয়ে। ড. আবুল বারকাত লিখেছেন, ‘ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস, ইন্স্যুরেন্স, শিক্ষা, মেডিক্যাল সার্ভিস, এনজিও থেকে উপার্জিত অর্থের সর্বমোট নিট আয় বছরে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ অর্থ থেকেই যাবতীয় ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের আর্থিক জোগান দেওয়া হচ্ছে।’ এর পর আলোচ্য সম্পাদকের পত্রিকার ‘মুক্তধারা’ শীর্ষক কলামে প্রকাশ হয় ‘ড. আবুল বারকাতের বক্তব্য কতটা সত্যনির্ভর’ শিরোনামের একটি লেখা। ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো দলের সঙ্গে জড়িত নই একজন প্রফেশনাল ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লিখছি’ উল্লেখ করে লেখক আলী জামান বলেছেন, আয়ের পরিমাণ ও উৎস নিয়ে ড. বারকাতের বক্তব্য ঠিক। তবে এ প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে পরিচালনার অর্থ উপার্জন করছে। এসব কোম্পানির কয়েকটি শেয়ারবাজারে এনলিস্টেড। এ প্রতিষ্ঠানগুলো যে লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে, বার্ষিক প্রতিবেদনেই তা প্রমাণ হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীর আস্থা যথেষ্ট, যারা এগুলোয় বিনিয়োগ করছেন তারাও সমানভাবে লাভবান হচ্ছেন। শেয়ারবাজারে লিস্টেড থাকায় ড. বারকাত সাহেবও এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন। তাছাড়া কোম্পানিগুলোর প্রকাশিত আর্থিক বিবরণীর মাধমে এগুলোর পরিচালনার নাড়ি-নক্ষত্র জানতে পারেন তিনি। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্জিত আয় দেশের ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার হচ্ছেÑএ কথা মেনে নেওয়া কোনো বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া ড. বারকাতসহ অন্য যেসব প্রগতিশীল অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী রয়েছেন, তারা কি পারেন না প্রয়োজনীয় পুঁজি সংগ্রহ করে এরূপ আর্থিক, বাণিজ্যিক বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে।

বলা যায়, আলী জামানের চ্যালেঞ্জে অকৃতকার্য হয়েছেন ড. বারকাত। পুঁজি সংগ্রহ করে আর্থিক, বাণিজ্যিক বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা তো পরের কথা, চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়ে একটি সেরা ব্যাংকে ‘শেষ’ করে দিয়েছেন। কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ কেলেঙ্কারির কথা আমরা জেনেছি, কিন্তু এ ধরনের ঘটনা তো আরও ঘটতে পারে।

সন্ত্রাসে অর্থায়ন নিয়ে তত্ত্ব দিয়েছেন ড. বারকাত, তাও অসার প্রমাণ হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছেÑএমন অভিযোগ পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সাত বছর তদন্ত করলেও কোনো প্রমাণ মেলেনি। (প্রথম আলো, ১৩ জানুয়ারি ২০১৮)। এটি নিজের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও প্রতিবাদ করেননি ড. বারকাত।

জনতা ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি সংঘটিত হওয়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. আতিউর রহমান। এ ঋণের বিষয় তারও কিছু বক্তব্য থাকতে পারে। প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির। সম্প্রতি সংগঠনটি নৈতিকতার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। গত ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত অর্থনীতি সমিতির ২০তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘অর্থশাস্ত্র ও নৈতিকতা’। উল্লেখ্য, সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অধ্যাপক আবুল বারকাত।

এ সম্মেলনে ড. আতিউর রহমান বলেছেন, ‘আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এ স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে না, এটি এখন বহুল আলোচিত। ব্যাংকের আমাদের ১০ শতাংশও উদ্যোক্তাদের নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ৯০ শতাংশ অর্থের জোগান দেওয়া আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী করছে। জনগণের অর্থের নিরাপত্তায় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, এটি নৈতিকতার বিষয়। না হলে ব্যাংকিং সেবা ব্যাহত হবে। আরও শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে।’

সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ সংশোধনপূর্বক ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল, ২০১৭ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। জাতীয় সংসদ ২৮ জানুয়ারি ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০১৮ নাম দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে। ব্যাংকমালিকদের স্বার্থেই এ আইন করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী ভূমিকা রখেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এ বিষয়ে সাবেক সহকর্মীদের সঙ্গে হয়তো কথা বলেছেন ড. আতিউর রহমান।

শেষ করতে চাই ড. আতিউর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়েই। ছড়ায় ছড়ায় শুদ্ধাচারের প্রাক্-কথনে তিনি বলেছেন, ‘ভালো কথা সবাই বলতে পারে। কিন্তু ভালো কাজ সবাই করতে পারে না।’ শুদ্ধাচার কেবল কাগজ-কলমে না থাকুক, ভালো কাজ করতেও পারি, সে প্রমাণ রাখতে হবে আমাদেরই।

 

গণমাধ্যমকর্মী

amchy9Ñgmail.com