ঋণ খেলাপ সমস্যা যেন আরও সংকটের কারণ না হয়

ড. আর এম দেবনাথ: দীনেশ সেনের ‘বৃহৎ বঙ্গ’ বইয়ে একটা বড়ই শিক্ষণীয় বিষয় পড়েছিলাম। বিষয়টি ধার, কর্জ বা লোন নিয়ে। এক ব্যক্তি ঋণদাতার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। আজ দেব, কাল দেব বলে ঋণগ্রহীতা টাকা আর পরিশোধ করছে না। ঋণদাতা ক্ষেপে গিয়ে একদিন বলল আমি অমুুক তারিখে আসছি। টাকা ‘রেডি’ রাখবে। না হলে তোমার একদিন কি আমার একদিন! নির্দিষ্ট দিন ঘনিয়ে আসছে। ঋণগ্রহীতা তার ছেলেদের ডেকে বলল, অমুক তারিখে ‘মহাজন’ আসবে টাকা আদায়ের জন্য। তোমরা ওইদিন ‘চিতা’ সাজাবে। আমি চিতায় উঠব। আগুন জ্বলবে। এসব দেখে ঋণদাতা মহাজন চলে যাবে। আর আমি নকল ‘চিতা’ থেকে উঠে আসব। যা বলা, তা-ই কাজ। মহাজন এসে দেখে, চিতায় তোলা হয়েছে ঋণগ্রহীতাকে। আগুন ধরানো হয়েছে। মহাজনের সন্দেহ হয়। কাছে গিয়ে দেখে জীবন্ত ঋণগ্রহীতা। সে মরার ভান ধরেছে। এ অদ্ভুত কাণ্ড দেখে মহাজন খুবই অবাক হয়। একজন লোক মহাজনের পাওনা না দেওয়ার জন্য চিতায় (মৃত সৎকারের সনাতনী পদ্ধতি) পর্যন্ত উঠতে পারে। এও সম্ভব! এ কথা ভেবে ঋণদাতা সহাস্যে বলে, ‘ভাই, তুমি চিতা থেকে ওঠো। তোমার টাকা ফেরত দিতে হবে না। তুমি ঋণ ফেরত না দেওয়ার জন্য যখন মরতে পর্যন্ত প্রস্তুত, তখন তোমার দৃঢ় প্রত্যয় দেখে আমি টাকা মাফ করে দিলাম।’
এ কাহিনি পড়ে আমি যারপরনাই মজা পেয়েছিলাম এবং এর সঙ্গে মেলাচ্ছিলাম আমাদের ঋণ খেলাপ সমস্যা। তাই তো, বাঙালি তো ঋণের টাকা ফেরত দিতে চায় না। এর প্রমাণ কী? প্রমাণ আছে। ছোটবেলায় যখন গুরুজনদের সঙ্গে বাজারে যেতাম, তখন দোকানে দোকানে দেখতাম একটা সতর্কবার্তা টাঙানো। তাতে লেখা: ‘আজ নগদ কাল বাকি, বাকির নাম ফাঁকি।’ আমরা যদি বাকিতে (ক্রেডিট/লোন) বিশ্বাস করতাম, তাহলে তো এমন বাণী দোকানে দোকানে লেখা থাকত না। ‘বাকি’র প্রতি অনাস্থা বাঙালির মননে; তার মনোজগতে ‘বাকি’ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এই ‘বাকি’র কারবারটাই করে ব্যাংক। তারা ‘লোন’-এর ব্যবসা করে, টাকা ধার দেওয়ার ব্যবসা করে। এও আশা করে, ওই ধার দেওয়া টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। জানি না অন্যদের কী অভিজ্ঞতা, বহু বন্ধুর কাছে শুনেছি, বয়স্কদের কাছে শুনেছি টাকা এমন জিনিস, যা যার কাছে যায় তার কথাই বলে। আত্মীয়দের ধার দিয়ে, বন্ধুদের টাকা ধার দিয়ে, নিকটজনকে ধার দিয়ে ফেরত পাওয়ার সুখকর অভিজ্ঞতা কয়জনের আছে; আমার খুবই জানতে ইচ্ছা করে। এখানে কথা আছে। নিজের টাকা ধার দেওয়া আর পরের টাকা ধার দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য একটা আছে। নিজের টাকা ধার দিয়ে ‘ঘষা’ খেতে পারে একজন, এটা তার ব্যক্তিগত ক্ষতি। কিন্তু আরেকজন বিশ্বাস করে টাকা রেখেছে ব্যাংকে; সেই টাকা থেকে ব্যাংকঋণ দিয়েছে একজনকে। এখন ওই টাকা ফেরত আসে না এর ওষুধ কী? ওষুধ একটা আছে। একটা কেন, অনেক ওষুধ আছে। এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য শক্তি প্রয়োগ পর্যন্ত করে, বিচার জমায় গ্রামে। অনেকে আদালতে মামলা করে। সেই মামলা ঝুলে থাকে দশক ধরে। ব্যাংক কি পারে না শক্তি প্রয়োগ করতে? এখানেই মুশকিল। ব্যাংক মামলা করে, দেওয়ানি মামলা (সিভিল মামলা)। এটা ডোরা সাপের কাপড়ের মতো। ঋণখেলাপির কিছু হয় না। তবে যদি ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি (পিডিআর) অ্যাক্ট’-এর আওতায় মামলা করা যেত আর কৃষকদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের মতো ঋণখেলাপির কোমরে দড়ি দিয়ে তাদের থানায় আনা যেত, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। এত তোয়াজ করতে হতো না। মুশকিল হচ্ছে, এই হতভাগা দেশে কৃষকের জন্য, গরিবের জন্য এক আইন টাকা উদ্ধার ক্ষেত্রে আর সবলের জন্য অন্য আইন।
ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, আমদানি-রফতানি জাতীয় বড় ব্যবসা করার জন্য ব্যাংক থেকে যারা ঋণ নেয়, তাদের কাছ থেকে পাওনা আদায় করতে হলে মামলা করতে হয় ‘অর্থঋণ আদালতে’। সময়ের ব্যাপার। আর যদি এ মামলার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে ‘রিট’ করা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। ঝুলবে মামলা দশক ধরে। এ অবস্থায় খেলাপি ঋণ আদায়ে কি ফৌজদারি মামলার ব্যবস্থা করা যায়? দেশে এটি করলে হইচই শুরু হবে। শিল্পায়নের প্রশ্ন, উন্নয়নের প্রশ্ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন। অতএব, টাকা আদায়ে এখন কড়াকড়ি কীভাবে করা যাবে? তাহলে উপায়? উপায় খুঁজছেন নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বৃহস্পতিবার খবরের কাগজে দেখলাম, তিনি ব্যাংকে ব্যাংকে ‘অডিট করবেন’। কারা আসল ব্যবসায়ী, কারা দুই নম্বরি ব্যবসা করে; তা খুঁজে বের করা হবে। ভালো ও মন্দ দুই ভাগ। ভালোর জন্য ভালো ব্যবহার। খারাপের জন্য আলাদা ব্যবহার। তিনি বলেছেন আইনের সংস্কার করবেন, যাতে খেলাপি ঋণ আদায় সহজ হয়। এও বলেছেন, এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবেন। সেখানে খেলাপি ঋণগ্রহীতার পক্ষে টাকা নিয়ে বিদেশে গিয়ে আনন্দ করার সুযোগ নেই। বাইরে যাওয়া নিষেধ। ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেওয়া একটা অপরাধ। এসব জনগণের টাকা। তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। বলেছেন, স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া উচিত নয়। শাস্তির কথাও বলেছেন। যেসব ব্যাংক অসাধু ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করে, তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি অডিট করে জানাবেন ঋণের টাকায় যন্ত্রপাতি এসেছে কি না, উৎপাদন হচ্ছে কি না, ব্যবসা চলছে কি না। দেখবেন, ভর্তুকির টাকার জন্যই কেবল রফতানি বিল তৈরি করা হয় কি না। খবরের কাগজে এসব পড়ে মনে হলো, তিনি আন্তরিকভাবে খেলাপি ঋণ সমস্যাকে দেখতে চান। অতএব, তাকে কয়েকটা কথা বলি। ‘অডিট’ করলে একশবার করুন। সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা কাজ করেন। প্রত্যেক ব্যাংকের ঋণের ওপর ব্যাংকগুলোর নিজস্ব অডিট রিপোর্ট আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট রিপোর্ট, তাদের বিশেষ রিপোর্টও আছে। সরকারের কমার্শিয়াল অডিটের রিপোর্টও আছে। এসব একটু পর্যালোচনার ব্যবস্থা হোক। তাহলে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। অবিলম্বে উচ্চ আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে রিটগুলোর ত্বরিত ডিসপোজের ব্যবস্থা দরকার। দরকার স্পেশাল বেঞ্চ একটি নয়, পারলে একাধিক। খুব বেশি গবেষণার দরকার নেই। খেলাপি ঋণের সমস্যা কর্মরত ব্যাংকাররা জানেন। তাদের সাহায্য নেওয়া দরকার। কারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি আর কারা অনিচ্ছাকৃত, তা ব্যাংকে পা দিলেই বোঝা যায়। মুশকিল হচ্ছে, বড়রাই বড় খেলাপি। এসব কাজ হোক। অতি সত্বর যা দেখা দরকার, তা হচ্ছে ঋণের কনসেনস্ট্রেশন বন্ধকরণ। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক নির্দেশনা আছে। তা কেউ মানেন না। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণগ্রহীতা এখন প্রচুর। এদের কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত মূলধন বলতে গেলে নেই। ঋণনির্ভর এসব কোম্পানি এখন ক্যাশ জেনারেশন করতে পারছে না। খেলাপি হচ্ছে। ঋণ পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা হয়েছিল ভালো ঋণগ্রহীতাদের সাহায্য করার জন্য। অপব্যবহার করে এটাকে শেষ করা হয়েছে। হয়েছিল ঋণ পুনর্গঠন (রিস্ট্রাকচারিং) ব্যবস্থা। এটিও অকার্যকর হচ্ছে। লোন অ্যাগেইনস্ট ইমপোর্টেড মার্চেন্ডাইজের (এলআইএম) ব্যবস্থা হয়েছিল হঠাৎ করে বিপদগ্রস্ত আমদানিকারকদের বাঁচানোর জন্য। এটিও অকার্যকর হয়েছে। করা হলো টিআর (ট্রাস্ট রিসিট)। পণ্য আমদানি হবে। তা বিক্রি হবে। বিক্রির জন্য ব্যাংক টাকা ছাড়াই ডকুমেন্ট দেবে। বিশ্বাসের শর্ত, বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করবে। এ ব্যবস্থার চূড়ান্ত অপব্যবহার হচ্ছে। এসবও রূপান্তরিত হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ‘কোলেটারেল’ নেই বললেই চলে। এখন সবচেয়ে বড় কথা, যা করার করুন। অডিট করবেন করুন। কিন্তু এ মুহূর্তে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে মূলধন বাড়াতে বলুন। এক লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনি কোম্পানি শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করে। এটা দারুণ অনুচিত কাণ্ড! এসব বন্ধ করতে পারলে ঋণ খেলাপ সমস্যা আর গভীর হবে না। বর্তমান সমস্যাকে ভবিষ্যৎ থেকে আলাদা করুন। আজ থেকে কী করা যাবে না, তা ঠিক করা দরকার। এটা হলে ঋণ খেলাপের প্রবণতা কমবে। বাকি থাকে বর্তমান সমস্যাগুলো। তা আলাদাভাবে মোকাবিলা করা যেতে পারে। যা-ই করা হোক, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প বন্ধ যাতে না হয়। লোকেরা যেন কর্মচ্যুত না হয়। উৎপাদন, বেচাকেনা, রফতানি যাতে চালু থাকে। সাপও মরে, লাঠিও যেন না ভাঙেÑএই হওয়া উচিত নীতি।

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক