ঋণ জালিয়াতির হোতাদের আনুন আইনের আওতায়

বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির এক মামলায় প্রতিষ্ঠানটির অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতীসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পুলিশের বিশেষ শাখায় চিঠি দিয়ে তদন্তের মুখে থাকা ব্যাংকটির আরও ১৭ কর্মকর্তা ও গ্রাহকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে সম্প্রতি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, এই গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম শুরুতে কোনো বাধা রইল না। প্রত্যাশা থাকবে, অভিযুক্ত অন্যদেরও শিগগিরই আনা হবে আইনের আওতায়। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক যা-ই হোক না কেন, সে ক্ষেত্রে তার অপরাধকেই নেওয়া হবে বিবেচনায়। ব্যক্তির বিচারের ক্ষেত্রে আইনকে চলতে দেওয়া হবে নিজস্ব গতিতে। এটি করা গেলে আমানত নিয়ে ফারমার্স ব্যাংকের যেসব গ্রাহক দুশ্চিন্তায় রয়েছেন, তাদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে।

গ্রেফতারের সময় অভিযুক্ত বাবুল চিশতী সাংবাদিকদের বলেছেন, একটি ব্যাংকে একজন পরিচালকের এককভাবে কিছু করার নেই। তার এ বক্তব্যে সত্যতা আছে বৈকি। এ কথা তিনি শুধু নিজেকে বাঁচানোর জন্যই বলেননি; বস্তুত ব্যাংকে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের বিধিবদ্ধ পদ্ধতি এটিই। এ থেকে বোঝা যায়, ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতিতে তার সঙ্গে জড়িত আছেন আরও অনেক রাঘববোয়াল। এদের কাউকে গ্রেফতারের খবর অবশ্য এখনও পাওয়া যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে আইন যদি একইভাবে কার্যকর না হয়, তাহলে তারা ভিন্ন কোনো উপায়ে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারে। সেই সুযোগ তারা যাতে নিতে না পারেন, সেটি নিশ্চিত করা হোক আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে।

শুধু ফারমার্স ব্যাংক নয়, এ খাতের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি ঘটেছে নিকট অতীতে। এটা এখন স্পষ্ট, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ক্ষমতাসীনদের কাছাকাছি থাকা একশ্রেণির পরিচিত মুখ। তাদের আইনের আওতায় আনার সে রকম কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। বস্তুত এমন পরিস্থিতিতে যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে এ ধরনের কার্যক্রমে অন্যরাও উৎসাহিত হবে। সে ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়বে ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি ঠেকানো। এজন্য পুরো খাতের শুদ্ধি নিশ্চিতের স্বার্থেই কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত হবে না। মনে রাখা দরকার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ খাতে লুটপাটের প্রবণতায় অপরাধীদের উৎসাহ জুগিয়েছে। এখান থেকে বেরোনোর জন্যও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সব পর্যায়ের কর্মকর্তা, নির্বাহী ও পরিচালনা পর্ষদ সদস্যের উপযুক্ত শাস্তি চাইব আমরা। তাদের কাছ থেকে গ্রাহকের আমানত উদ্ধারেও চালাতে হবে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা।

দেশের ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের যেসব সদস্য ঋণ জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েছেন, তাদের সিংহভাগই নিয়োগ পেয়েছেন রাজনৈতিক বিবেচনায়। দেখা যায়, অনেকের নিয়োগের ক্ষেত্রে অনুসৃত হয় না বিধিবদ্ধ পন্থা। ন্যূনতম শেয়ার ধারণের বিধান থাকলেও ঘাটতি রয়েছে সে ক্ষেত্রেও। এসব বিধানের পরিপালন নিশ্চিতের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ছাড় দিয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। পরিপালন নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোয় এ ধরনের অনেক সমস্যাই এড়ানো যেত। এখন এ প্রশ্নও উঠবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওইসব প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দিয়েছিল কোন স্বার্থে? নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখতে হবে যে, তাদের প্রধানতম দায়িত্ব হলো গ্রাহকের আমানত সুরক্ষা। এজন্য পরিপালন নিশ্চিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি যত কঠোর হওয়া প্রয়োজন, ততটাই কঠোর তাকে হতে হবে। সম্প্রতি এও দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের কিছু দাবির প্রতি অকারণে নমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ও অর্থনীতির সামগ্রিক বাস্তবতার পরিবর্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনাকে। এমন মনোভাব প্রদর্শনের কারণে ভবিষ্যতে ঋণ জালিয়াতি যদি আরও বেড়ে ওঠে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নীতিনির্ধারকরাও তার দায় এড়াতে পারবেন না।