প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ঋণ বিতরণে রক্ষণশীল ভূমিকায় ব্যাংক

এডি রেশিও সমন্বয়

শেখ আবু তালেব: আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে ঋণ-আমানত (এডি) রেশিও নির্ধারিত সীমায় নামিয়ে আনতে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি হওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
অপরদিকে আমানত প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত মানে না হওয়ায় ব্যাংকের হাতেও পর্যাপ্ত তারল্য নেই। এমন অবস্থায় এডি রেশিও নির্দিষ্ট মানে নামিয়ে আনতে ঋণ বিতরণে রক্ষণশীল ভূমিকায় নেমেছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। এতে সংগৃহীত আমানত জমা রাখতে বাধ্য হচ্ছে তারা। আর ঋণ কমে যাওয়ায় কলমানিতে টাকার চাহিদা কমে গেছে। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধের (জানুয়ারি-জুন) ঘোষিত মুদ্রানীতিতে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে সাড়ে ১৬ শতাংশ। কিন্তু গত জুলাই থেকে এপ্রিল শেষে ১০ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র আট দশমিক ৮৬ শতাংশ।
অথচ আলোচিত সময়ে পূর্ববর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে চার দশমিক ৭৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। গত মার্চ শেষে এ পার্থক্য ছিল চার দশমিক ৩৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
গত মার্চে ব্যাংকের মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও এপ্রিলে এসে কমে গেছে। এপ্রিলে বেসরকারি খাতে ব্যাংকের বিনিয়োগ ঋণ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়েছে। অবশ্য এপ্রিল শেষে গত এক বছরের হিসাবে গড়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এই সময়ে আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ২৩ শতাংশ।
সামনের দিনগুলোতেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিতে আশা জাগানোর মতো কোনো লক্ষণ নেই বলে দাবি করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়ে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে চার ধরনের সুবিধা নিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে ব্যাংকগুলো। এই অর্থেও ঋণ বিতরণ শেষ। এখন অধিকাংশ বেসরকারি খাতের ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। ফলে সবাইকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে না। মূলত বেরসকারি ব্যাংকগুলো প্রভাবশালীদের ঋণ দিচ্ছে। এতে ব্যাংকের অনিয়ম হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, আমানত প্রবৃদ্ধিও কাক্সিক্ষত মানের না হওয়ায় ব্যাংকগুলো ভবিষ্যতে আর এ রকম ঋণ দিতে পারবে না। ফলে অর্থবছর শেষের হিসাবে দেখা যাবে মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়িত হবে না। বিনিয়োগে গতি আসার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমলেও সরকারি ব্যাংকগুলো আগ্রাসী ব্যাংকিং শুরু করেছে। এতে সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগের চিত্র কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে। তবে এসব ঋণের ভবিষ্যৎ ভালো হবে না।
অপরদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ চাহিদা কমে আসায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে সরকার। দুটোকেই ভালো বলছেন না অর্থনীতিবিদরা। এটি অর্থনীতিতে উদ্বেগ তৈরি করছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
সার্বিক বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনকে দায়ী করা হয়েছে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষতভাবে না হওয়াকে। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে সরকার। গত জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে দুই দশমিক ৫২ শতাংশ, যা মার্চে ছিল দুই দশমিক ১৭ শতাংশ, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এই সময়ে কমেছিল ২০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ৯৫ শতাংশ। এপ্রিল শেষে সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরের (২০১৮-১৯) ১০ মাসে তা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে আট দশমিক ৮৬ শতাংশ। অথচ পূর্ববর্তী অর্থবছরের এই সময়ে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক তথ্য বলছে, গত মার্চ শেষে ব্যাংকগুলো থেকে বিনিয়োগ ঋণ গেছে এক লাখ ৭৬ হাজার ৯৮৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এপ্রিল শেষে তা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি মাস-টু-মাসের হিসাবে ঋণাত্মক হয়েছে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। অবশ্য গত এক বছরের হিসাবে ব্যাংক খাতে এপ্রিল শেষে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এই সময়ে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ২৩ শতাংশ।
বেসরকারি খাতের প্রভাবে দেশের মোট বিনিয়োগও কমে গেছে। তথ্য বলছে, গত এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সার্বিক (সরকারি-বেসরকারি) বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ চার হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা, যা গত জুন শেষে ছিল ৯ লাখ ৭২ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা।
ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর তারল্য চাহিদাও কমে গেছে। ফলে কলমানি মার্কেটেও সুদের নেমে গেছে। এক মাস আগেও যেখানে গড় সুদহার ছিল চার টাকা ৫৬ পয়সা, এখন তা নেমে দাঁড়িয়েছে দুই টাকা ২৪ পয়সায়। লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে না কমলেও কমে গেছে সুদেও হার।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, মূলত অত্যাবশ্যক না হওয়ায় ব্যাংকগুলো অর্থ ধার করতে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে দরদাম করছে বেশি। ফলে তারল্য উদ্বৃত্ত থাকা ব্যাংকগুলোও কম সুদে টাকা ধার দিচ্ছে।
প্রসঙ্গত, আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের জের হিসেবে ব্যাংকগুলোকে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রচলিত ধারার এডি রেশিও ৮৩ দশমিক পাঁচ শতাংশে ও ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোকে ৮৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ ১০০ টাকার আমানত সংগ্রহ করলে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো ৮৩ দশমিক ৫০ টাকা এবং ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৮৯ টাকার ঋণ দিতে পারবে।

সর্বশেষ..



/* ]]> */