ঋণ সহায়তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করুন

বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে আগামী পাঁচ বছরে ৩২ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন। এটা সামনে রেখে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালায় সংস্কার এনেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা দূর করতে এবং দ্রুত অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত নিতে সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের ক্ষমতা বাড়িয়েছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাটি। রোববার ঢাকায় অনুষ্ঠিত ব্যবসায়িক সম্ভাবনাবিষয়ক সেমিনারে এ তথ্য জানায় এডিবি। গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত খবরটি আশাব্যঞ্জক বৈকি।
সেমিনারে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন পারকাশ বলেছেন, দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ এখন খুবই সম্ভাবনাময়। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করলেই দ্রুত অর্থ ছাড় সম্ভব হবে। মানসম্মত, অভিজ্ঞ ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া গেলে দ্রুত বাস্তবায়নও সম্পন্ন করা যাবে। এর মাধ্যমে টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে সহজ।
উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে এডিবি আমাদের দীর্ঘদিন সহায়তা জুগিয়ে আসছে। পদ্মা সেতু ইস্যুতে বিশ্বব্যাংক সরে গেলেও অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ দিয়ে পাশে থেকেছে এডিবি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আর্থিক সহায়তা জুগিয়েছে এডিবি। সংস্থাটি মূলত জ্বালানি, পরিবহন, পানি ও নগর অবকাঠামো, শিক্ষা, আর্থিক, কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং গ্রামীণ উন্নয়ন খাতে সহায়তা দিয়ে আসছে। এ অবস্থায় এডিবিপ্রধানের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গেই নিতে হবে।
আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কম, এ অভিযোগ পুরোনো। এডিবির এ-দেশীয় প্রধান নির্বাহীর বক্তব্যে বোঝা যায়, এ সম্পর্কে তারা ভালোই অবহিত। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করলেই দ্রুত অর্থ ছাড় দেবে এডিবি। কিন্তু কেবল সহায়তা পেতে নয়, অবকাঠামোর উপযোগিতা আর আয়ুষ্কাল বাড়াতেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দরকার। সংস্থাটির ঋণ কম সুদের হলেও তা কিন্তু পরিশোধ করতে হবে। লাভবানও হতে হবে এতে।
উন্নয়নকাজে ধীরগতির কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ার দৃষ্টান্তও কম নেই আমাদের। এমনও ঘটে প্রকল্প অনুমোদনের আগেই বাড়াতে হয় এর বরাদ্দ। যোগ্য ঠিকাদারই যথাসময়ে নির্মাণ সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে আমাদের। প্রকল্প তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পেরিয়ে যায় সাত-আট বছর। তারপরও শেষ হয় না কাজ। কোথাও দরপত্রে জটিলতা, ঠিকাদারের অবহেলা, কোথাও ভূমি অধিগ্রহণে সমস্যায়ও দফায় দফায় পিছিয়ে যায় বাস্তবায়ন। নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, প্রকল্প কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বাড়তি ব্যয় ও পূর্তকাজ বৃদ্ধিতে ব্যয় বাড়ে। যথাযথ পরিকল্পনার অভাবেও বাড়ে সময় ও ব্যয়। বাড়তি সময় আর অর্থ ব্যয় তো হচ্ছেইÑস্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকায়ও কাজের মান নিম্ন হয়। অনুমোদনের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয় না অনেক ক্ষেত্রে। বারবার প্রকল্প পরিচালক ও প্রকৌশলী বদল, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ইত্যাদি হয়। আবার নকশা অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণ হয় না। এসব বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীরাও যথেষ্ট অবহিত আর সেটা তাদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়। তারাও জানেন, এসব সমস্যা দক্ষভাবে মোকাবিলা করে নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করা গেলে যে কোনো অবকাঠামোই প্রাক্কলিত ব্যয়ে নির্মাণ করা সম্ভব। প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সহজ মানে ঋণ বেড়ে যাওয়া। এ অবস্থায় প্রকল্প ঝুলে যেতে বা বাতিলও হতে পারে। সাধারণত যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে বাড়তি অর্থ জোগান দিতে চায় না দাতা সংস্থা। অথচ আমাদের প্রয়োজন সামনে রেখে বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালা সংস্কার করেছে এডিবি। এখন ঋণ বা সহায়তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের লক্ষ্যে এর গ্রহীতা হিসেবে আমাদেরও ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনতে হবে; এ-সংক্রান্ত সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।