প্রচ্ছদ শেষ পাতা

‘এইও’ সনদ পাচ্ছে বেক্সিমকো ইনসেপটা, স্কয়ার

রহমত রহমান: আমদানি করা পণ্য দ্রুত খালাস করতে অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) ব্যবস্থা কার্যকর করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রথমবারের মতো দেশের প্রথম সারির তিনটি ওষুধ কোম্পানিকে এইও সনদ দেওয়া হচ্ছে। যাচাই ও সব শর্ত পূরণ করায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এ সনদ পাচ্ছে।
আজ আনুষ্ঠানিকভাবে এ সনদ হস্তান্তর করা হবে। এর আগে শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেট তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সভায় আলোচনার পর বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। এ ব্যবস্থার ফলে জাহাজ থেকে খালাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পণ্য সরাসরি আমদানিকারকের নিজস্ব গুদামে চলে যাবে। শুল্ক কর্মকর্তারা সেখানেই পণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। দুই পক্ষের সব যোগাযোগ হবে ই-মেইলে। এর ফলে সময় ও ব্যবসার খরচ দুই সাশ্রয় হবে। ছয় মাস পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালুর পর নিয়মিত করা হবে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, বিশ্বের ৬৭টি দেশ আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া সহজীকরণে এইও প্রক্রিয়া চালু করেছে। এর মধ্যে ১৪টি দেশ কাজ শুরু করেছে। ১৩টি দেশ প্রক্রিয়াধীন, যার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকেই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করে। এনবিআরের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্য খালাস করতে গড়ে ১১ দিন ৯ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট ও রফতানি প্রক্রিয়ায় জাহাজীকরণে সময় লাগে চার দিন ২২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট। তবে এইও চালু হলে পণ্য খালাসে সময় লাগবে মাত্র ৩৮ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট বা এক দিন ১২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট।
এ বিষয়ে শুল্ক মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা কমিশনারেটের কমিশনার ড. একেএম নুরুজ্জামান শেয়ার বিজকে বলেন, ট্রাস্টেড বিজনেসম্যান ও ট্রেডার্স হিসেবে এ তিনটি কোম্পানিকে এইও সনদ দেওয়া হচ্ছে। এতে তারা দ্রুত সময়ে পণ্য খালাস, ওষুধ তৈরি ও রফতানি করতে পারবে। আমদানি-রফতানি সহজ হবে, খরচ কমে আসবে। ফলে অল্প খরচে গুণগত পণ্য সরবরাহের ফলে বাজার সম্প্রসারিত হবে। তিনি বলেন, তিনটি প্রতিষ্ঠানের যাচাই শেষে এ সনদ দেওয়া হচ্ছে। সনদ দেওয়ার পরপরই তারা কাজ শুরু করবে। ভবিষ্যতে আরও প্রতিষ্ঠান আবেদন করলে বিবেচনা করবে এনবিআর।
এইও সুবিধা হলো আমদানি করা পণ্য ট্রাকে করে সরাসরি জাহাজ থেকে পরীক্ষা ছাড়াই আমদানিকারকের গুদামে চলে আসবে। গুদামেই পণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। পণ্য খালাসে কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাছে যেতে হবে না। বর্তমানে যেখানে ২০ ধরনের কাগজপত্র দিতে হয়, তখন পাঁচ ধরনের কাগজপত্র দিলেই চলবে। দুই পক্ষের সব যোগাযোগ হবে ই-মেইলে। তাতে সময় বাঁচবে, ব্যবসা সহজ হবে।
ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অরগানাইজেশন (ডব্লিউসিও’র সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন আমদানিকারককে যে ধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়, সেই একই ধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে অন্য দেশে বন্দরের পণ্য খালাস করতে মাত্র ৬২ ঘণ্টা ২৪ মিনিট বা দুই দিন ১৪ ঘণ্টা ২৪ মিনিট সময় লাগে। সাধারণত নন-অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) প্রতিষ্ঠান এভাবে পণ্য খালাস করে থাকে। তবে বাংলাদেশে এইও প্রতিষ্ঠান নেই। সমীক্ষায় বলা হয়, এইও’র ক্ষেত্রে পণ্য খালাসে সময় লাগে মাত্র ৩৮ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট বা এক দিন ১২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট।
এনবিআর সূত্র জানায়, ২০১২ সালে এনবিআর প্রথম এইও ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়। ছয় বছর পর গত বছরের ২৮ জুন বিধিমালা জারি করে। ডব্লিউসিও’র শর্ত হিসেবে এই ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। বিধিমালা জারির পর থেকে এ সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠান খোঁজার কাজ শুরু করে এনবিআর। ওষুধ খাতের প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রফতানি অনেকটা স্বচ্ছ হওয়ায় প্রাথমিকভাবে ওষুধ খাতের তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হয়। পরে তিনটি প্রতিষ্ঠান শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেটে আবেদন করে। যাচাই শেষে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে এ সনদ দেওয়া হচ্ছে।
এ সনদ থাকলে তিনটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম, মোংলা বা যেকোনো বন্দরে আমদানি সুবিধা পাবে। শুধু নিজ দেশেই নয়, যে দেশে রফতানি পণ্য যাবে, সে দেশেও একই ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে। অবশ্য এজন্য ওইসব দেশের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি থাকতে হবে। এইও নিয়ে এখন পর্যন্ত বিশ্বে ১০০টির বেশি মিউচুয়াল রিকগনিশন অ্যাগ্রিমেন্ট (এমআরএ) আছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যে এসব সমঝোতা চুক্তি হয়েছে।
সূত্রমতে, ২০০৫ সালে পণ্যের নির্বিঘ্ন চলাচলে সেইফ ফ্রেমওয়ার্ক চালু করে ডব্লিউসিও। সেখানে এইও ব্যবস্থা চালুর বিধান রাখা হয়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকে বাণিজ্য সহায়তা চুক্তি (ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্ট) হয়। এতে বাংলাদেশ সই করে। এই চুক্তির ৭ দশমিক ৭ অনুচ্ছেদে এইও ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়। ২০১২ সালে ভারত এই ব্যবস্থা চালু করেছে। ভারতের শতাধিক প্রতিষ্ঠান এই সনদ নিয়েছে। শিল্প উৎপাদক, আমদানিকারক, রফতানিকারক ওয়্যারহাউজ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স, সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দর এই এইও সনদ নিতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন বিমানবন্দরও এ সনদ নিয়েছে।

সর্বশেষ..