‘এইচআর কনসেপ্টের গুরুত্ব উদ্যোক্তারাও বুঝতে পারছেন’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সাফল্য। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ মানবসম্পদ (এইচআর) ব্যবস্থাপক মো. মাইনুল ইসলাম চিশতী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. মাইনুল ইসলাম চিশতী ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ
মানবসম্পদ (এইচআর) ব্যবস্থাপক। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর এমবিএ করেছেন। ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন বিভিন্ন বহুজাতিক শিপিং কোম্পানিতে। একসময় জাতীয় পর্যায়ের টেবিল টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে জিতেছেন অনেক শিরোপা। এছাড়া আন্তর্জাতিক টেবিল টেনিস ফেডারেশনের একজন লেভেল-২ কোচও তিনি। কর্মজীবনের ব্যস্ততায় বর্তমানে খেলাধুলা না করলেও বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা সময়ে স্পোর্টস অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করেন

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ার গড়ার পেছনের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই।

মো. মাইনুল ইসলাম চিশতী: আমার জন্ম পুরোনো ঢাকায়। বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে অদ্যাবধি সপরিবারে পুরোনো ঢাকায় আছি। ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষার শুরু। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করি। এরপর বিশ্বের সর্ববৃহৎ শিপিং কোম্পানি মায়ের্স্কে যোগ দিই। শিপিং প্রতিষ্ঠানে হাতেখড়ি হয় আমার। মায়ের্স্ক একটি ড্যানিশ শিপিং কোম্পানি, যেটি তথ্যপ্রযুক্তি ও কাজের ধরনের দিক দিয়ে আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে বহুগুণ এগিয়ে। ওইখানকার সবকিছুই অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক ও গুছানো। প্রায় দু’বছর কাজ করার পর ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠান ড্যামকোতে চলে আসি। এখানে কিছুদিন দায়িত্বপালনের পর গ্রিনল্যান্ড গ্রুপে হেড অব এইচআর হিসেবে যোগ দিই। প্রায় দুই বছর কাজ করার পর ২০১৪ সালে জাপানি শিপিং কোম্পানি এনওয়াইকে লাইনে হেড অব এইচআর হিসেবে যোগদান করি। ২০১৮ সালে এনওয়াইকে লাইন বিশ্বব্যাপী আরও দুটি শীর্ষ জাপানি শিপিং কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসায়িক কৌশলগত কারণে মার্জিং করে একটি নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে, যার নাম ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ শাখার প্রধান মানবসম্পদ (এইচআর) ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে এইচআরকে কেন বেছে নিলেন?

মাইনুল ইসলাম: মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের কাজ হলো মানুষকে জানা, তাকে নিয়ে কাজ করা। ব্যক্তিগতভাবে আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ও মিশতে পছন্দ করি। পেশা হিসেবে এইচআরকে বেছে নেওয়ার এটা একটি কারণ। দ্বিতীয় কারণ হলো, যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে দক্ষ ও কর্মঠ কর্মীবাহিনী। সেক্ষেত্রে মানবসম্পদের উন্নয়ন তথা ডেভেলপমেন্ট অত্যন্ত জরুরি। সেই উন্নয়নের লক্ষ্যে এইচআর পেশাজীবীদের কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলেই এইচআরকে বেছে নিয়েছি।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ এইচআরের গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন…

মাইনুল ইসলাম: মানবসম্পদ তথা এইচআর বিভাগ মানুষকে নিয়েই কাজ করে। একসময় এইচআরের কাজ শুধু কর্মী ছাঁটাই ও বাছাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ের সঙ্গে এখানে কৌশলগত অনেক পরিবর্তন এসেছে। কর্মপরিধি বেড়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, এইচআরকে এখন ব্যবসার কৌশলগত অংশীদারও বলা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের কর্মিবাহিনীকে সুসংগঠিত করা, কর্মী বাছাই, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের পর তাদের উন্নত করা এইচআরের কাজ। এছাড়া কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো, ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা ও সঠিক জায়গায় নিয়োগ দেওয়া মানবসম্পদ বিভাগের কাজ। কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠানের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক।

শেয়ার বিজ: শিপিং কোম্পানিতে এইচআর ম্যানেজারকে কোন কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়?

মাইনুল ইসলাম: শিপিং কোম্পানির আয়ের মূল উৎস হচ্ছে গ্রাহক থেকে আদায় করা ফ্রেইট চার্জ। সুতরাং এইচআর ম্যানেজারকে গুণগত মানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সংখ্যাগত বিষয় বোঝা ও ম্যানেজমেন্টকে বোঝানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করতে হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের উন্নতির কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য কী ধরনের মানবসম্পদ প্রয়োজন তার সুষ্ঠু পরিচালনা পদ্ধতি তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিতে হয়। শিপিংয়ের সব বিভাগের কাজ সম্পর্কে (পোর্ট অপারেশন্স, ফ্রেইট কালেকশন, কমার্শিয়াল প্রভৃতি) প্রাথমিক পর্যায়ের ধারণা রাখা জরুরি।

শেয়ার বিজ: শিপিং কোম্পানিতে দায়িত্ব পালনে এইচআর ম্যানেজারকে কোন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়?

মাইনুল ইসলাম: প্রথমত, শিপিং একটি স্পেশালাইজড ফিল্ড। এখানে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে শত শত শিপিং বা ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠান থাকলেও দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে এবং নির্ভুলভাবে কাজ করার মতো দক্ষ জনবলের বেশ অভাব দেখা যায়। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হয়। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক কর্মী ও মালিকের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেন। কর্মী ও মালিক উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপককে এগিয়ে যেতে হয়।

শেয়ার বিজ: বহুজাতিক কোম্পানিতে এইচআর প্র্যাকটিস সম্পর্কে বলুন।

মাইনুল ইসলাম: মূলত প্রতিটি বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে একটি করপোরেট হেডকোয়ার্টার্স থাকে। আর বিভিন্ন দেশে রিজিওনাল সেগমেন্ট থাকে। তাদের প্যারেন্ট কোম্পানির নিজস্ব কিছু এইচআর গাইডলাইন থাকে। প্রতিষ্ঠানে যারা সম্পূর্ণভাবে করপোরেট কালচার প্রতিষ্ঠা করতে চান, তারা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এর উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন। বহুজাতিক কোম্পানির পাশাপাশি দেশীয় কিছু প্রতিষ্ঠানও এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছে। আজকাল প্রায় সব বড় ধরনের প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগ রয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানেই যে সঠিক চর্চা হয়, তা বলা যাবে না। সুখের বিষয় হলো, দেশীয় প্রতিষ্ঠান এখন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই দক্ষ মানবসম্পদ পেশাদারের বেশ চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে এইচআর ম্যানেজারকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মাইনুল ইসলাম: অত্যন্ত সম্মানজনক একটি পেশা। এ পেশার মাধ্যমে ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অন্য সব বিভাগের ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানা যায়। একটা সময় মানবসম্পদ বিভাগকে অ্যাডমিন বলা হতো, তারপর পারসোন্যাল, এরপর হিউম্যান রিসোর্স। এখন আবার এটা পরিবর্তিত হয়ে হিউম্যান ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে। এই পরিবর্তনটা উন্নত দেশেই প্রথম হয়। কয়েক বছর পর আমাদের দেশে শুরু হয়। তাদের সঙ্গে আমাদের কেবল সময়ের পার্থক্য। তবে পরিবর্তন আসছে, এইচআর কনসেপ্টের গুরুত্ব উদ্যোক্তারাও বুঝতে পারছেন।

শেয়ার বিজ: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

মাইনুল ইসলাম: তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির কারণে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ধৈর্য, অধ্যবসায় ও আগ্রহের যথেষ্ট কমতি দেখা যায়। গুগলের আবির্ভাব হওয়ায় বই পড়ার আগ্রহ এখন একেবারেই কমে গেছে। ফলে কোনো বিষয়ে সামগ্রিক জ্ঞানের অভাব প্রকটভাবে দৃশ্যমান। মূল বিষয় হলো, নিজেকে সবসময় সব ক্ষেত্রে আপ-টু-ডেট রাখতে হবে, নইলে পিছিয়ে পড়তে হবে। কিছু মৌলিক বিষয়, যেমন সংশ্লিষ্ট আইন, মানবাধিকার, শ্রম আইন প্রভৃতি সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান থাকলে এক ধাপ এগিয়ে থাকবেন। এ পেশায় যারা ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের আন্তরিক সাধুবাদ জানাই। নতুনদের উদ্দেশে বলতে চাই, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে আনন্দের সঙ্গে ভালোবেসে কাজ করতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন, তাকে নিজের সম্পদ ভাবতে হবে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাতে নৈর্ব্যক্তিকভাবে প্রদর্শন করতে হবে। নিজের সত্তাকে যেন বিকিয়ে না দেওয়া হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। যথাসময়ে সঠিক নিয়মে কাজ করতে হবে।

শেয়ার বিজ: কর্মজীবনে সফল হতে হলে আপনার পরামর্শ কী?

মাইনুল ইসলাম: পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। সফল হওয়ার জন্য পড়ালেখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে হবে। জ্ঞানার্জন করতে হবে। সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হতে হবে। দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া শিখতে হবে। সৎ ও সময়নিষ্ঠ হতে হবে। সর্বদা শেখা ও জানার আগ্রহ থাকতে হবে। ধৈর্য হারালে চলবে না। প্রায়ই দেখা যায়, বস বা সুপারভাইজার কোনো কারণে বকাঝকা করলে অনেকে খুব হতাশ বা ডিমোটিভেটেড হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে মনে রাখতে হবে, এগুলো কর্মক্ষেত্রের অংশ এবং একে ইতিবাচকভাবে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সর্বোপরি ধৈর্য ও উপস্থিত বুদ্ধির মাধ্যমে পরিস্থিতিকে সামাল দিতে হবে।