একতারায় বাজে জীবিকার সুর

বাউল গানের অন্যতম অনুসঙ্গ একতারা। এ বাদ্যযন্ত্রকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ীর আশেপাশে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে একতারাসহ নানা সামগ্রী। উৎপাদিত এসব একতারা রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। একতারা তৈরি করে এ এলাকার প্রায় আড়াইশ’ পরিবার জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। এ কুঠির শিল্পের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে আর্থিক সচ্ছলতাও ফিরেছে অনেক পরিবারে।

উপজেলার ছেঁউড়িয়া, বিশ্বাসপাড়া, মণ্ডলপাড়া, জয়নাবাদ এলাকার শত শত নারী-পুরুষ এ কাজের মাধ্যমে হয়েছেন আত্মনির্ভরশীল। তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে এ বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে লাভ কিছুটা কম হচ্ছে বলে জানায় এখানকার কারুশিল্পীরা।

একতারা তৈরির মূল উপাদান বাঁশ, কাঠ ও চামড়া। তবে লাউয়ের বশ ও নারকেলের মালই দিয়ে একতারা তৈরি হয়। মুলি বাঁশ মূলত পাশের ঝিনাইদহ ও যশোর থেকে সংগ্রহ করা হয়। লাউয়ের বশ স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে, চামড়া কেনা হয় নাটোর থেকে। ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ীর আশেপাশে প্রায় বাড়িতে গড়ে উঠেছে একতারা কারখানা। এসব কারখানায় প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতুড়ি, বাটাল, কাঁচি দিয়ে কাজ করেন কারিগররা। এক একটি কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ২০০ একতারা তৈরি হয়। একটি একতারার দাম ৪০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে বায়না করে আরও সুন্দর করতে চাইলে দামটা হাজার ছাড়িয়ে যায়। একতারা তৈরি করে স্বাবলম্বী হওয়া একজন ছেঁউড়িয়ার একতারা বাড়ির আমিরুল ইসলাম বাদশা। তিনি একযুগ আগে ছেঁউড়িয়ায় গড়ে তোলেন একতারা বাড়ি নামে একটি কারখানা। তখন মাত্র ১৩শ’ টাকা পুঁজি নিয়ে বাড়িতে একতারা তৈরি শুরু করেন। এরপর আস্তে আস্তে ব্যবসার প্রসার ঘটাতে থাকেন তার। একতারা লাভজনক হাওয়ায় তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আমিরুল ইসলাম বাদশার ‘একতারা বাড়ি’ কারখানায় এখন নিয়োজিত রয়েছে

প্রায় ১৪ জন কর্মচারী। তাদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে ছোট-বড় নানা সাইজ ও ডিজাইনের একতারা।

একতারা বাড়ির মালিক আমিরুল ইসলাম বাদশা জানান, একতারা তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয় তরলা বাঁশ, লাউয়ের খোল, মেহগনি কাঠের তৈরি ছোট-বড় সাইজের খোল, নারকেলের মালাই, ছাগলের চামড়া, স্টিলপাত ও সুরের তার। এছাড়া প্রয়োজন হয় স্ক্রু, ওয়াসার, বোতাম ও রঙ। একতারা বাঙালিদের অন্যতম লোক-বাদ্যযন্ত্র। একতারা বাড়ি কারখানায় কর্মরত নাঈম হাসান জানান, স্থানীয় একটি কলেজে ম্যানেজমেন্টে স্নাতক প্রথমবর্ষে পড়ালেখার পাশাপাশি এ কারখানায় প্রায় এক বছর ধরে কাজ করছি। এখানে কাজ করে লেখাপড়ার খরচ চালানোর পাশাপাশি সংসারে সহযোগিতা করতে পারি। একই কারখানায় কর্মরত ফারুক হোসেন জানান, বছরজুড়েই একতারার ব্যবসা ভালো চলে। তবে বৈশাখ এলে এর বিক্রি আরও বেড়ে যায়। ছেঁউড়িয়ায় লালন একাডেমি মার্কেটে ইমরান শেখ জানান, দেশের বিভিন্ন পর্যটন নগরে তাদের তৈরি এসব একতারা ও লালনের কাঠের খোদাই করা প্রতিচ্ছবি বিক্রি করা হয়। ঢাকার অনেক ব্যবসায়ী পাইকারি কিনে নিয়ে যান। ছেঁউড়িয়ার নীশিতা একতারা কারখানার মালিক নাসির উদ্দিন জানান, এখন শ্রমিকদের মজুরি ছাড়াও সব জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় একতারা বিক্রি করে লাভ কম হচ্ছে। তবে সরকার সহজ শর্তে ঋণ দিলে আমরা আরও বেশি উপকৃত হতে পারতাম। লালনভক্ত বলাই সাঁই জানান, লালনের গান আর একতারার টুংটাং সুরে ভক্ত-অনুসারীরা খুঁজে পান অমৃতের সন্ধান। ভক্তদের তৃষ্ণা মেটাতে কুষ্টিয়া ছেঁউড়িয়ার আশেপাশে কারিগররা একতারা তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এতে করে একদিকে যেমন দেশীয় ঐতিহ্য রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

কুমারখালী উপজেলার নির্বাহী অফিসার মো. শাহীনুজ্জামান জানান, একতারা কারখানায় মালিকরা সরকারের একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের সদস্য হয়ে ঋণ সুবিধা নিতে পারেন। তাছাড়া আমাদের যুব উন্নয়ন, সমবায় ও বিআরডিবি অফিস থেকে ঋণ সুবিধা নিতে পারেন। তারা যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তাহলে আমরা তাদের সুবিধা দিতে পারব।

 

কুদরতে খোদা সবুজ, কুষ্টিয়া