একুশ শতকের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ভাবনা

বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশকে বলা হয় পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ। এদেশের আবহাওয়া-জলবায়ুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মাটি ও প্রকৃতির গঠন প্রকৃতি। ফলে চলতি শতকে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাকেও এ বদ্বীপ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। নদী, সাগর আর পলিমাটির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই ২১০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের এ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাব করছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। এরই মধ্যে এর খসড়া প্রস্তুত হয়েছে, যা বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা-পর্যালোচনার জন্য প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেশী অঞ্চলের সঙ্গে অভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা, সমুদ্র উপক‚লের সম্ভাবনাময় নীল অর্থনীতি আর আধুনিক কৃষিভিত্তিক সামাজিক অবস্থাকে মূল ভিত্তি ধরেই করা হচ্ছে এ পরিকল্পনা। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা (ডেল্টা প্ল্যান)-২১০০’। দেশের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলো, সরকারের ভিশন-২০২১, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-২০৩০ এবং ভিশন ২০৪১-এর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশকে দীর্ঘ মেয়াদে একটি পথনির্দেশ দেওয়া হবে এ পরিকল্পনার মাধ্যমে।

হিমালয়ের পাদদেশের তিনটি আন্তসংযুক্ত নদী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা। এ তিন নদীর সমন্বিত বেসিন (জিবিএম) থেকেই গড়ে উঠেছে ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ ডেল্টা। এতে রয়েছে ৭০০ নদীর প্রবাহ, যার মধ্যে ৫৪টি আন্তদেশীয় নদী ভারতের সঙ্গে এবং তিনটি মিয়ানমারের সঙ্গে সংযুক্ত। এ নদীগুলোই পুরো বাংলাদেশ ডেল্টাকে জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে পলিমাটির আস্তরণে। আর এর সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি করেছে হিমালয়ের সঙ্গে সমুদ্রের সংযোগ। এ ভ‚প্রকৃতির মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক অর্থনীতি, যা এদেশের উন্নয়নের মূল সূত্র। এ বাস্তবতাকে মাথায় নিয়েই করা হয়েছে ডেল্টা প্ল্যান।

পরিকল্পনার খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশের উর্বর জমি, বিপুল নদী, অবারিত সমুদ্রের সঙ্গে যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার নদীপথ, সুন্দরবন ও সম্ভাবনাময় ইকোসিস্টেম রয়েছে বাংলাদেশের। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের তারতম্যের ভিন্নতা বৃদ্ধি, বন্যার প্রবণতা বৃদ্ধি, খরা, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস, জলাবদ্ধতার পাশাপাশি আন্তসীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে বাংলাদেশের। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মাধ্যমে সম্ভাবনাগুলোর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণের জন্যই নেওয়া হয়েছে ডেল্টা প্ল্যান।

এ পরিকল্পনায় দেশকে ছয়টি আলাদা এলাকায় বিভাজিত করা হয়েছে। এতে উপক‚লীয়, খরাপ্রবণ, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অচেনা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নদী ব্যবস্থা ও নগরগুলোকে আলাদা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়। এসব অঞ্চলের স্বাতন্ত্র্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে তার জন্য আলাদা উদ্যোগ ও পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় ঝুঁকিগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাকেই ভিশন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এজন্য ২০২১, ২০৩০ ও ২০৪১-এর পাশাপাশি সুদূরপ্রসারীভাবে ২১০০ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।

হটস্পটভিত্তিক আলাদা পরিকল্পনার পাশাপাশি সার্বিকভাবে জিবিএম বেসিনের আওতাভুক্ত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নদীর পানিবণ্টন ও ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, আন্তসীমান্ত নদীগুলোর অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে ধাপে ধাপে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। বহুমাত্রিক পানি-ক‚টনীতির দিকে অগ্রসর হতে হবে, যাতে দ্ব›দ্বগুলো নিরসন করা যায়। এছাড়া তিস্তা নদীর পানিবণ্টনে চুক্তি সম্পন্নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। পরিকল্পনায় সীমান্তবর্তী নদীগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত বেসিন ব্যবস্থাপনা স্কিমের প্রস্তাবের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের সক্রিয় সম্পৃক্ততার কথাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়া সমুদ্রের ‘নীল অর্থনীতিকে’ উন্নয়নের নতুন দ্বার হিসেবে উল্লেখ করে তার জন্য কোস্টগার্ডের আধুনিকায়ন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এজন্য শাসন কাঠামোর সঙ্গে একে যুক্ত করার পাশাপাশি মৎস্য ও অন্যান্য জলজসম্পদের সদ্ব্যবহারের ভাবনা ব্যক্ত করা হয়েছে।

 

জাকারিয়া পলাশ