এক বছরে ‘সিস্টেম গেইন’ ২৭২ কোটি টাকা!

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে প্রতিবছর আবাসিক, শিল্প-কলকারখানা, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে বাড়ছে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা। এর বিপরীতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (কেজিডিসিএল) গ্যাস বিতরণ সক্ষমতা প্রতি বছর কমছে। বর্তমানে মোট চাহিদার মাত্র ৩৯ শতাংশ সরবরাহ করতে পারে সংস্থাটি। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ এ সময়ে সংস্থাটি গ্রাহক ঠকিয়ে ‘সিস্টেম গেইন’-এর নামে বাড়তি আয় করেছে ২৭২ কোটি টাকা।

কেজিডিসিএল সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল) বিতরণের জন্য গ্যাস কিনছে দুই হাজার ৩০৭ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ঘনফুট আর বিক্রি করে দুই হাজার ৫৪০ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে সিস্টেম গেইন বা অতিরিক্ত গ্যাস বিক্রি ছিল ২৩২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে সংস্থাটির নিট মুনাফা হয়েছে ৩৫৭ কোটি ৩২ লাখ ১০ হাজার টাকা। আর গড়ে প্রতি ঘনফুটের দাম ১২ টাকা ৩৮ পয়সা হিসাব করলে এ সিস্টেম গেইনের মুনাফা হয় ২৮৮ কোটি ১৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এটি সংস্থাটির এক বছরের অর্জিত নিট মুনাফার চেয়েও কিছু কম, যা রীতিমতো বিস্ময়কর।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মামুন। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, এ সিস্টেম গেইনের কারণ নিয়ে পেট্রোবাংলা কাজ করছে; তাদের কাজ শেষ হলে বিষয়টি জানা যাবে। তবে আপনার গড়মূল্য হিসাবটা ঠিক নেই। কারণ সার, বিদ্যুৎক্ষেত্রে তো মূল্য অনেক কম। আর সিএনজিতে গ্যাসের মূল্য বেশি হলেও তার ব্যবহার সীমিত।

বিক্রয় বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে কোম্পানিটি গ্যাস কেনে ২১৩ দশমিক শূন্য ৯ মিলিয়ন ঘনফুট। আর বিক্রি করে ২৩১ দশমিক ৫৯  মিলিয়ন ঘনফুট। আর এতে সিস্টেম গেইন হয় ১৮ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। একইভাবে ফেব্রুয়ারি মাসে সিস্টেম গেইন হয় ৩০ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট। মার্চে সিস্টেম গেইন হয় ১৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন ঘনফুট, এপ্রিলে ২১ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট, মে মাসে ১৮ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট, জুনে ২৯ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট, জুলাইয়ে ১০ দশমিক ১০ মিলিয়ন ঘনফুট, আগস্টে ১৫ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ঘনফুট, সেপ্টেম্বরে ২৫ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট, অক্টোবরে ১৬ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট, নভেম্বরে ২০ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ডিসেম্বরে হয় ১২ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এভাবে পুরো বছরের গেইন হয় ২৩২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ঘনফুট।

বিক্রয় হার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি বছর কেজিডিসিএলের অতিরিক্ত গ্যাস বিক্রির হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ গ্যাস বাড়তি বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি, যা আগের বছর ছিল ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরের অতিরিক্ত গ্যাস বিক্রির হার ছিল ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ, ২০১২-১৩ সালে ৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ২০১১-১২ সালে ৬ দশমিক ৭৫ এবং ২০১০-১১ সালে ৩ দশমিক ৯০ শতাংশ। ধারাবাহিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির গ্যাস ক্রয়ের চেয়ে বেশি বিক্রি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনও (বিইআরসি)। কয়েক বছর আগে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য কমিশনে জমার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিক নির্দেশে তৎকালীন কমিশন চেয়ারম্যান এআর খান এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য কমিশনের কাছে জমা দিতে বলেন, পাশাপাশি কীভাবে বাড়তি গ্যাস বিক্রি সম্ভব হচ্ছে, তার ব্যাখ্যাও দিতে বলেন।

সংস্থাটির প্রতিবেদন মতে, বর্তমানে কোম্পানির শিল্প, বাণিজ্য ও আবাসনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ক্রমপুঞ্জিত গ্রাহক সংযোগ দাঁড়ায় মোট ছয় লাখ দুই হাজার ৭৯টি। আর তাদের গ্যাসের চাহিদার ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ রয়েছে ১৭৮ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি দাঁড়ায় ২৭২ মিলিয়ন ঘনফুট। আর চাহিদা দ্বিগুণ হলে কেজিডিসিএলের গ্যাস সরবরাহ তেমন বাড়েনি। উল্টো সক্ষমতা না থাকার পরও পাঁচ বছরে সংযোগ প্রদান করেছে দুই লাখ ৩২ হাজার ৩৭১টি। আর এ অতিরিক্ত সংযোগে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য কখনও বিতরণে রেশনিং করা হলেও তার চেয়ে বেশি গ্যাসের প্রেসার কমিয়ে কিংবা কোনো অঞ্চলে কয়েক ঘণ্টা সরবরাহ বন্ধ করে রাখা হয়। ফলে কেজিডিসিএল প্রতিবছর গ্যাস ক্রয়ের চেয়ে বেশি বিক্রি করছে। আর এতে গ্রাহকরা ন্যায্য সরবরাহ না পেয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এক্ষেত্রে আবাসিক গ্রাহকরা ভোগান্তিতে বেশি পড়ছে। অথচ গ্রাহকরা তাদের নির্ধারিত বিল পরিশোধ করছে। কিন্তু বছরে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়, যাকে ‘সিস্টেম গেইন’ বলে আয় বাড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রামের কেজিডিসিএলের একাধিক গ্রাহক শেয়ার বিজকে বলেন, প্রয়োজনে অনেক সময় গ্যাস পান না। অনেকটা বাধ্য হয়ে বিকল্প উপায়ে রান্নার কাজ করতে হয়, কিংবা দোকান থেকে খাবার কিনে আনতে হয়। এখন তো সংকট আরও প্রকট। অথচ প্রতি মাসে নির্ধারিত বিল প্ররিশোধ করে আসছি।

ক্যাব চট্টগ্রামের সভাপতি এম নাজের হোসাইন শেয়ার বিজকে বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক। কেজিডিসিএল চট্টগ্রামে গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে; সেখানে সিস্টেম গেইনের নামে লুটপাট কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিবছর যেখানে গ্যাস সরবরাহ কমছে, সেখানে কেজিডিএলের লাভের অঙ্ক বাড়ছে, বিষয়টি রহস্যজনক। চট্টগ্রামসহ দেশের সর্বত্র দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস দিতে না পারলেও বিল কিন্তু আদায় করা হচ্ছে। এটা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।

গত পাঁচ বছর গ্রাহকদের কম গ্যাস সরবরাহ করে ৬৪২ কোটি ৩১ লাখ ২৩ হাজার টাকা মুনাফা করেছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল)। অথচ গত পাঁচ বছরে বাড়েনি সংস্থাটির গ্যাস সরবরাহ করার সক্ষমতা। কিন্তু এ পাঁচ বছরে গ্যাস বিতরণ সংস্থাটি গ্রাহক সংযোগ দিয়েছে দুই লাখ ৩২ হাজার ৩৭১টি। গ্রাহকদের গ্যাস কম দিয়ে এবং সক্ষমতা না থাকার পরও অতিরিক্ত সংযোগ দিয়ে এ অতিরিক্ত মুনাফা করা হয়।