এখনও দুর্বল ভিত্তির ওপর পুঁজিবাজার

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: অবিরাম দরপতনের পর সম্প্রতি কিছুটা চাঙা হয়েছিল দেশের পুঁজিবাজার; কিন্তু তা স্থায়ী হতে পারেনি। কয়েক দিন না যেতেই পুঁজিবাজারে আবারও ছন্দপতন হয়েছে। পাশাপাশি সন্তোষজনক অবস্থায় নেই লেনদেনও। লেনদেন ঘুরপাক খাচ্ছে ৪০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার মধ্যে, যা স্বাভাবিক বাজারের লক্ষণ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আলাপকালে বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, ডিএসইতে গড়ে প্রতিদিন এক হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হওয়া উচিত। কিন্তু বড় পতনের পর বাজার সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন চোখে পড়ে না। তাদের মতে, ডিএসইতে এখন যে পরিমাণ প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত রয়েছে, তাতে কে হাজার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা লেনদেন খুবই স্বাভাবিক।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তারা বলেন, বাজার কিছুদিন বেশ ভালো ছিল। এরপর দর সংশোধন হতেই পারে। কিন্তু লেনদেন হতে হবে সন্তোষজনক। অথচ এ বাজারে যে লেনদেন হচ্ছে, তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এটা দেখে বোঝা যায় বাজারে তারল্য সংকট চলছে। এটা দূর করতে না পারলে বাজার পরিস্থিতি ভালো হবে না বলে মন্তব্য করেন তারা। তবে কেউ কেউ বাজারের এমন পরিস্থিতির কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক বাজার পতনের কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। বাজারে তারল্য সংকট রয়েছে কি না জানাতে চাইলে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে বাজারে তারল্য সংকট কেটে গিয়েছিল। বর্তমানে হয়তো আবার সেই সংকট দেখা দিতে পারে। তবে আমি বলব, বিনিয়োগকারীদের হতাশা থেকেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গতকাল বাংলা নববর্ষের প্রথম কার্যদিবসে স্বল্প লেনদেন হওয়ার পাশাপাশি সূচকের পতন ঘটেছে, যে কারণে বাজার নিয়ে আবারও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, তারা প্রত্যাশা করেন একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল বাজার।
গতকালের বাজারচিত্রে দেখা যায়, দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচকের পতন হয়েছে ৩৯ পয়েন্ট। মোট লেনদেন হয় ৪১২ কোটি টাকা। দিনশেষে সূচক স্থির হয়েছে পাঁচ হাজার ৭৭৩ পয়েন্টে। এ নিয়ে টানা চার কার্যদিবস নি¤œমুখী থাকল ডিএসইর সূচক। এ চার কার্যদিবসে সূচকের পতন হয়েছে ১০৬ পয়েন্ট। লেনদেন সন্তোষজনক হলে এই পতন তেমন কোনো প্রভাব ফেলত না বলে মনে করেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
গত চার কার্যদিবসে সূচক পাঁচ হাজার ৮৭৯ পয়েন্ট থেকে পাঁচ হাজার ৭৭৩ পয়েন্টে নেমে এসেছে। যদিও দরপতনের পর আট কার্যদিবসে সূচক বেড়েছিল প্রায় ৪০০ পয়েন্ট।
বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলেন, সেল প্রেশারের কারণেই গতকাল শেয়ারের দরপতন হয়েছে। তাদের যুক্তি, পতনের সময় যারা শেয়ার কিনেছেন, কয়েক দিন বাজার ভালো থাকায় তারা মুনাফায় ছিলেন। যে কারণে তারা মুনাফা করতেই শেয়ার বিক্রি করছেন। আর এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা, যে কারণে বাজারে হঠাৎ করেই ছন্দপতন হয়েছে। তারা বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে অর্থ না আনলে তারল্য সংকট দূর হবে না। আর এমন চলতে থাকলে লেনদেনও সন্তোষজনক হবে না।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাজারের উত্থান-পতনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনাবেচা তেমন ভূমিকা রাখে না। এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। তারা শেয়ার কেনাবেচা করলেই কেবল বাজারের সার্বিক চেহারা বদলে যায়। তিনি বলেন, এ বাজারে সবাই প্রফিট করতে আসেন। মুনাফা পেলে সবাই শেয়ার বিক্রি করবেনÑএটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি কীভাবে নিরাপদে থাকবে, সেটা তাদেরই ভাবতে হবে।
একই প্রসঙ্গে মডার্ন সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খুজিস্তা নূর-ই-নাহারীন বলেন, পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন থাকবে এটা স্বাভাবিক। এটা মেনে নিয়েই বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা করতে হবে। অকারণে ভেঙে পড়লে চলবে না। পুঁজিবাজার ধৈর্যের জায়গা। তাই এখানে তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তার মাশুল দিতে হয়।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বলেন, পুঁজিবাজার একটি চক্রের হাতে বন্দি হয়ে রয়েছে; যে কারণে বাজার তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে না। তাদের অভিযোগ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের সঠিক ভূমিকা পালন করছেন না। তারা বিমাতাসুলভ আচরণ করছেন। আর তাদের কারণেই নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তারা সঠিক ভূমিকা পালন করলে বাজার সঠিক চেহরায় ফিরে আসবে বলে মন্তব্য করেন তারা।