হোম প্রচ্ছদ এডিবির প্রতিবেদন: এশিয়ায় বস্তিবাসীর সর্বোচ্চ হার বাংলাদেশে

এডিবির প্রতিবেদন: এশিয়ায় বস্তিবাসীর সর্বোচ্চ হার বাংলাদেশে


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

ইসমাইল আলী: এক বিঘা জমি। তাতেই অর্ধশতাধিক টিনের ঘর। প্রতিটি ঘরে এক বা একাধিক পরিবারের বাস। এতগুলো পরিবারের জন্য টয়লেট হাতেগোনা কয়েকটি। নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। স্থানীয় ওয়াসার পাম্প থেকে টেনে আনতে হয় খাওয়ার পানি। আর গোসল ও কাপড় কাচা চলে পাশের সরকারি জমিতে ছোট একটি পুকুরে। বিদ্যুৎ থাকলেও রান্নার জন্য গ্যাসের কোনো ব্যবস্থা নেই। এটা রাজধানীর অদূরে ডেমরায় গঠে ওঠা বস্তির চিত্র।

শুধু ডেমরা নয়, ঢাকা বা দেশের অন্যান্য শহরের বিভিন্ন এলাকায় এভাবেই গড়ে উঠছে বস্তি। নিম্ন আয় ও অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার লোকজনের প্রধান বাসস্থান এগুলো। যদিও সাম্প্রতিককালে শহর এলাকায় বস্তি উচ্ছেদে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ গড়তে বস্তির জমি ব্যবহারের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। তবে নগরায়ণের বিস্তৃতির পাশাপাশি বস্তি ক্রমেই সম্প্রসারণ হচ্ছে।

20170909_110044

এর প্রমাণ উঠে এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিবেদনে। গতকাল প্রকাশিত ‘কি ইন্ডিকেটরস ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নগর বস্তিবাসীর হার তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের মধ্যে ৫৫ দশমিক ১০ শতাংশই বস্তিতে বাস করে। একই অবস্থা কম্বোডিয়ার। দেশটির বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের মধ্যে ৫৫ দশমিক ১০ শতাংশ বস্তিতে বাস করে। পরের অবস্থানে রয়েছে পাশের দেশ নেপাল। দেশটির বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের মধ্যে ৫৪ দশমিক ৩০ শতাংশ বস্তিতে বাস করে।

নগর বস্তিবাসীর দিক থেকে এশিয়ায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান। দেশটির বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের মধ্যে ৪৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বস্তিতে বাস করে। পরের দুটি অবস্থানে রয়েছে মঙ্গোলিয়া ও মিয়ানমার। দেশ দুটির বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের মধ্যে বস্তিবাসীর সংখ্যা যথাক্রমে ৪২ দশমিক ৭০ ও ৪১ শতাংশ। এছাড়া ফিলিপাইনের ৩৮ দশমিক ৩০, লাওসে ৩১ দশমিক ৪০, ভিয়েতনামের ২৭ দশমিক ২০, চীনের ২৫ দশমিক ২০, থাইল্যান্ডের ২৫, ভারতের ২৪ ও ইন্দোনেশিয়ার ২১ দশমিক ৮০ শতাংশ নগরবাসী বস্তিতে বাস করে।

স্বাভাবিকভাবে সরকারের পরিত্যক্ত বিভিন্ন জমিতেই গড়ে উঠে বস্তি। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে এ প্রবণতায় পরিবর্তন এসেছে। এখন বেসরকারি উদ্যোগে বস্তি গড়ে ওঠার হার বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে ৮০ শতাংশের বেশি বস্তি গড়ে উঠেছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়।

সংস্থাটির তথ্যমতে, ১৯৯৭ সালে দেশে বস্তি ছিল দুই হাজার ৯৯১টি। সে সময় সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা বস্তি ছিল এক হাজার ৫৫৩টি, যা মোট বস্তির ৫২ শতাংশ। সে সময় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা বস্তির সংখ্যা ছিল এক হাজার ৩১১, মোট বস্তির যা ৪৪ শতাংশ। আর ২০১৪ সালে এসে বস্তির সংখ্যা তিন গুণের বেশি হলেও মালিকানার ধরন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এ সময় শহর অঞ্চলে বস্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৯৪৩তে। এর মধ্যে সরকারি জমিতে বস্তির সংখ্যা দাঁড়ায় দুই হাজার ৫৯২ বা মোট বস্তির ১৭ শতাংশ। আর বেসরকারি মালিকানাধীন জমিতে বস্তির সংখ্য দাঁড়ায় ১১ হাজার ৪২৯, মোট বস্তির যা ৮২ শতাংশ।

বিবিএসের হিসাবে, সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি বস্তি রয়েছে ঢাকা বিভাগে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বোচ্চ বস্তি রয়েছে চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে। আর বস্তির সংখ্যা তুলনামূলক কম বরিশাল, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে। এসব বস্তির বেশিরভাগ ঘরই টিনের তৈরি বা কাঁচা। বাকিগুলো সেমি-পাকা ঘর অথবা ঝুপড়ি।

নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে সেটা করা সম্ভব হয়নি। সরকারের গৃহায়ণ ও নগরায়ণ নীতিমালার মধ্যে নিম্নবিত্তদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সবসময়ই ক্ষমতায় আসীনদের উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি জমি পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন স্থানে বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এসব কারণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে ঘর বানিয়ে এসব মানুষকে ভাড়া দিচ্ছে। এক্ষেত্রে একশ্রেণির মানুষ বাণিজ্য করছে।

বিবিএসের তথ্যমতে, জীবনযাত্রার ক্ষেত্রেও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত এসব বস্তিবাসী। মাত্র ৫২ দশমিক ৪৮ শতাংশ বস্তিতে নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় গড়ে ওঠা বস্তিগুলোয় নলকূপ আরও কম। পানির উৎস হিসেবে বাকিদের নির্ভর করতে হয় ট্যাপ, কূপ, পুকুর বা আশপাশের নদীর পানির ওপর। তবে বস্তির পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও খারাপ। মাত্র ২৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বস্তিতে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট রয়েছে। বাকিদের মধ্যে ৪২ শতাংশ অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ও ২১ শতাংশ টিন দিয়ে ঘেরা আচ্ছাদন ব্যবহার করে। অন্যরা আশপাশের ঝোপঝাড় ও খোলা জায়গাকে টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করে।

বস্তিগুলোর বেশিরভাগেরই বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। মাত্র ১০ শতাংশ বস্তিতে বাতি জ্বালাতে কেরোসিন ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ পৌঁছানোয় প্রায় ৪৮ শতাংশ বস্তিবাসীর ঘরেই টেলিভিশন রয়েছে। রেফ্রিজারেটরও রয়েছে সাত শতাংশ বস্তিঘরে। আর জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা সেলফোন রয়েছে ৮৪ শতাংশ বস্তিঘরেই। তবে রান্নার ক্ষেত্রে গ্যাস সংযোগ রয়েছে মাত্র ৩৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ বস্তিতে। বাকিদের বড় অংশকেই রান্নার কাজ সারতে হয় কাঠ পুড়িয়ে।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর বলেন, সরকারি জমির পাশাপাশি মালিকানা নিয়ে বিবাদ রয়েছে, এমন জমিতে প্রভাবশালীরা বস্তিঘর বানিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ভাড়া দিচ্ছে। তবে যে প্রক্রিয়ায় ৩০-৪০ বছর আগে বস্তি গড়ে উঠত, একই প্রক্রিয়ায় হচ্ছে এখনও। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে; যাতে গ্রাম থেকে মানুষ শহরে এসে কাজ শেষে আবার গ্রামে বা উপশহর এলাকায় নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারে। পাশাপাশি সরকারের নীতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থানের বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

বস্তিতে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষের অধিকাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। বিবিএসের হিসাবে, এদের প্রায় ১৭ শতাংশ রিকশা বা ভ্যানচালক। মুদি দোকান বা অন্যান্য ছোটখাটো ব্যবসা করে ১৬ শতাংশ। এছাড়া বস্তিবাসীর ১৪ শতাংশ পোশাক শ্রমিক, ১৪ শতাংশ বিভিন্ন সেবামূলক কাজে নিয়োজিত, সাত শতাংশ পরিবহনকর্মী, আট শতাংশ নির্মাণ শ্রমিক, আট শতাংশ মুটে বা সাধারণ শ্রমিক এবং তিন শতাংশ হোটেল শ্রমিক। এর বাইরে কিছু বস্তিবাসী আছে, যারা কৃষিকাজ বা কুটির শিল্প গড়ে তুলেছে। কেউ আবার হকার বা ভিক্ষাবৃত্তি করেও জীবিকা নির্বাহ করে।

বস্তির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সবার জন্য গৃহায়ণ নিশ্চিত করতে সরকারের যেসব নীতিমালা রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান নিম্ন আয়ের মানুষকে কাজে নিয়োগ দিচ্ছে, তাদের উচিত কর্মীদের জন্য এমন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, যাতে তারা ভালো বাসস্থান পান।