এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের কলঙ্কমোচন!

নিজস্ব প্রতিবেদক: অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সব পরিচালক বাদ পড়লেন প্রবাসীদের পাঠানো টাকায় গড়ে ওঠা এনআরবি কমার্শিয়াল (এনআরবিসি) ব্যাংক থেকে। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক চেয়ারম্যান ফরাছত আলী, নির্বাহী কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান তৌফিক রহমান চৌধুরী, পরিচালক এবিএম আবদুল মান্নান ও মো. আমির হোসেন। অভিযুক্ত পরিচালকদের বাদ দিয়ে এনআরবিসির কলঙ্কমোচন হয়েছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল একাধিক পরিচালক।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক পদক্ষেপে তারা পর্ষদ থেকে বাদ পড়েছেন। এসব সিদ্ধান্ত মেনে ওয়েবসাইট থেকে তাদের নাম সরিয়ে ফেলেছে ব্যাংকগুলো। ফলে নতুন এ ব্যাংকটির অনিয়মের সঙ্গে যাদের নাম এসেছিল তারা সবাই বাদ পড়লেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা জানান, যেসব পরিচালক অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, ক্ষমতাশীল হওয়ায় তাদের বাদ দেওয়া যাচ্ছে না। তবে পরবর্তী নিয়োগের সময় যখন তাদের বিষয়ে অনুমোদন চাওয়া হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে সায় দিচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ কৌশলই বেছে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এনআরবিসির কলঙ্কমোচন সম্পর্কে একাধিক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, প্রবাসীদের নাম ভাঙিয়ে অভিযুক্ত পরিচালকরা ব্যাংকটিতে অনিয়মের কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। এতে ব্যাংকটির ইমেজ নষ্ট হয়েছে, বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দুর্নীতিবাজদের বাদ দিয়ে পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্বিক সহায়তার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই এনআরবিসি ব্যাংকের পঞ্চম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) ১৭ জন পরিচালককে নির্বাচিত করা হয়। এর মধ্যে মুনসেফ আলী ছাড়া বাকি ১৬ জনকে পরিচালক পদে নিয়োগের অনুমোদন চেয়ে ২৩ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি দেয় এনআরবিসি ব্যাংক। আইন অনুযায়ী, পরিচালক পদে নিয়োগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ জনকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। বাকি ছয়জনকে পরিচালক হিসেবে অনুমোদন দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন তাদের অনুমোদন দেওয়া হয়নি, তার কারণও চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে।
এনআরবিসি ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, সাবেক চেয়ারম্যান ফরাছত আলীর বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারার আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, এ কারণে তাকে পরিচালক হিসেবে অনুমোদন দেওয়া গেল না। ৪৬ ধারা অনুযায়ী, পরিচালকদের অপসারণ করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এছাড়া তৌফিক রহমান চৌধুরীকে পরিচালক হিসেবে অনুমোদন না দেওয়ার কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, তিনি নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান থাকাকালে বিভিন্ন পরিচালকের স্বাক্ষর জাল করেছেন। সভায় উপস্থিত না থাকার পরও কাগজপত্রে তাদের হাজির হিসেবে দেখিয়েছেন। এছাড়া বিধিবিধান লঙ্ঘন করে এজি গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বেগমগঞ্জ ফিড মিলের ঋণ মঞ্জুর করেন তিনি।
পরিচালক হিসেবে এবিএম আবদুল মান্নান ও মো. আমির হোসেনকে অনুমোদন না দেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, তারা বেনামে এনআরবিসি ব্যাংকের শেয়ার ধারণ করছেন, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে উদ্ঘাটিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এসেছে, এবিএম আবদুল মান্নানের হাতে ব্যাংকটির যে শেয়ার রয়েছে, তার প্রকৃত মালিক মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক ও এজি গ্রুপের কর্ণধার শহীদুল আহসান। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এটি ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ ক (২) ধারার লঙ্ঘন এবং ১৪ ক (৩) ধারা অনুযায়ী এ শেয়ার বাজেয়াপ্ত হওয়ার যোগ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমির হোসেনকে আটলান্টিক রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান দেখিয়ে এসবিএসি ব্যাংকের গুলশান শাখায় ২০ কোটি টাকার ঋণের জন্য আবেদন করা হয়। অথচ দীর্ঘদিন তিনি দেশে আসেননি। আমির হোসেনের নামে আবেদন করার তিন দিনের মাথায় ২০১৭ সালের ২১ জুন তার নামে এসবিএসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২০ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করে। এনআরবিসি ব্যাংকে থাকা আমির হোসেনের শেয়ার লিয়েন বা বন্ধক রাখার শর্তেই এই ঋণ দেওয়া হয়। তবে পরের মাসে শেয়ার লিয়েনের শর্ত থেকে অব্যাহতি দিয়ে ঋণসীমা বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকা করা হয়। এই ২৫ কোটি টাকার ঋণের মাত্র সাত লাখ টাকা গেছে আটলান্টিকের হিসাবে।
প্রবাসীদের উদ্যোগে গঠিত এনআরবিসি ব্যাংকে বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ায় গত বছরের ১০ ডিসেম্বর পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। ফরাছত আলীকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান হন তমাল পারভেজ। তবে ফরাছত আলী পরিচালক হিসেবে বহাল ছিলেন। আর গত ১২ জানুয়ারি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেওয়ান মুজিবুর রহমান অপসারিত হন।