এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চট্টগ্রামপ্রীতি

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশের ব্যাংক খাতে ঝুঁকি বাড়িয়েছেন চট্টগ্রামের ঋণগ্রহীতারা। একারণে বেশকিছু ব্যাংক চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের নতুন করে ঋণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে। কিন্তু চতুর্থ প্রজন্মের এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চট্টগ্রামপ্রীতি ব্যাংকারদের ভাবিয়ে তুলেছে। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে ঋণ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। আর রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ব্যাংকটি ঋণ দেয় বাকি ৩৫ শতাংশ। একটি বিভাগে অস্বাভাবিক ঋণ প্রদান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকের উদ্যোক্তারা।
২০১৩ সালের ২৩ অক্টোবর কার্যক্রমে আসে প্রবাসীদের মালিকানায় এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকটি গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণ বিতরণ করে পাঁচ হাজার ৯৩২ কোটি ৮৩ লাখ ৮২ হাজার ৬১৯ টাকা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ঋণ দেয় তিন হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৬৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে ঢাকা বিভাগের উদ্যোক্তাদের ঋণ হিসেবে দেওয়া হয় দুই হাজার ৭৯ কোটি ২২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬৯ টাকা, মোট ঋণের মধ্যে যা প্রায় ৩৫ শতাংশ। বাকি বিভাগগুলোকে নামমাত্র ঋণ দিয়েছে ব্যাংকটি। এর মধ্যে খুলনা বিভাগে ছয় কোটি ৬৫ লাখ ৭৮ হাজার ৪১৩ টাকা, রাজশাহী বিভাগে দুই কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৯৮৩ টাকা এবং সিলেটে ৯৪ লাখ ২২ হাজার ৫৫ টাকা। আর বরিশাল, রংপুর এবং ময়মনসিংহ বিভাগে শাখা না থাকায় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করেনি এনআরবি গ্লোবাল।
এদিকে ব্যাংকটি চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ দিয়েছিল দুই হাজার ৭৭ কোটি ৩০ লাখ ৭৬ হাজার ২৭৬ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ বাড়ে এক হাজার ৭৬৫ কোটি ৭৯ লাখ ৪৬ হাজার ৩২৩ টাকা।
খেলাপি ঋণবিষয়ক টাস্কফোর্স মতে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত, অবলোপনকৃত ও আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা ঋণ ২৫ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকাই খেলাপি। সে হিসাবে চট্টগ্রামে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ১৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ খেলাপি। এ হার ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের গড় হারের চেয়েও বেশি।
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেন, চট্টগ্রামে যেভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে তাতে এ অঞ্চলে ঋণ বেশি দেওয়ায় ব্যাংকটি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এছাড়া দেশের বিনিয়োগে অবদান রাখতে অনিবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগে তিনটি এনআরবি ব্যাংক অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে অভিবাসীরা দেশের বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের একটি প্ল্যাটফর্ম পায়। এছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স আহরণেও এসব ব্যাংক বিশেষ অবদান রাখবে, কিন্তু এসব উদ্দেশ্যের কোনোটিই প্রত্যাশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে পারেনি। প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে প্রবাসীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই তিন ব্যাংক। প্রতিষ্ঠার চার বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও রেমিট্যান্স আহরণে দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি ব্যাংকগুলো। শুধু রেমিট্যান্সেই নয়, ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণ বিতরণেও চোখে পড়ার মতো কার্যক্রম নেই। তবে আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণে এগিয়ে যাচ্ছে এনআরবি ব্যাংকগুলো। এখনও ব্যাংকগুলোকে সঠিক পথে পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য সব পক্ষকে কাজ করতে হবে।
চট্টগ্রামে ঋণখেলাপির হার বেশি হওয়ার পরও কেন বেশি ঋণ বিতরণ করেছেনÑএমন প্রশ্নের উত্তরে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম সারওয়ার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে অনেক ভালো ব্যবসায়ী আছেন। আর চট্টগ্রামে ঋণের চাহিদা বেশি থাকার কারণে আমরা ঋণ বেশি দিয়েছি। অন্য কোনো কারণ নেই। তবে আগের বছরের তুলনায় খেলাপি ঋণ বাড়ায় প্রভিশন সংরক্ষণও বেশি করতে হয়েছে। ফলে নিট মুনাফাও কমেছে।’
উল্লেখ্য, প্রবাসী ও দেশীয় উদ্যোক্তাদের ব্যাংক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের গত বছরের কর ও প্রভিশন-পরবর্তীতে নিট মুনাফা ছিল ৩৮ কোটি ৯৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৪২ কোটি ৩০ লাখ দশ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির মুনাফা কমেছে তিন কোটি ৩৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এছাড়া গত বছরের ব্যাংকটিতে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৭৭ কোটি ৪৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যা আগের বছর ছিল ১৪ কোটি ৬৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬২ কোটি ৮৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। আর খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ব্যাংকটির গত বছর প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় ৩৩ কোটি ২৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা, যা আগের বছরে ছিল মাত্র এক কোটি ৯৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রভিশন সংরক্ষণ বাড়াতে হয়েছে ৩১ কোটি ৩৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা।