প্রচ্ছদ শেষ পাতা

এফডিআরের সুদে মুনাফায় উল্লম্ফন

পলাশ শরিফ: ব্যাংক ঋণের সুদের হারে ভর করে পিছিয়ে পড়া ঠেকিয়েছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম। সেসঙ্গে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মুনাফার রেকর্ডও গড়েছে কোম্পানিটি। ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরে আগের বছরে তুলনায় কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ২৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এবার মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মুনাফার উল্লম্ফনের মূল চালিকাশক্তি ব্যাংকের গচ্ছিত আমানতের সুদের হার। সর্বশেষ আর্থিক বছরে কোম্পানিটির এফডিআরের সুদ আয় ১২৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বা প্রায় ৬২ শতাংশ বেড়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের পরিচালন আয় প্রায় ৪১ কোটি ৩২ লাখ টাকা বেড়ে ২৭৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এবার আয়ে ১৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে কোম্পানিটির অপরিচালনই ছিল তুলনামূলক বেশি। এ খাতের আয় পরিচালন আয়ের চেয়ে প্রায় ২২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি।
গত হিসাববছরে মেঘনা পেট্রোলিয়াম অপরিচালন আয় করে ৩৩৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এ আয়ের ওপর ভর করে পাঁচ বছর পর সর্বোচ্চ ৩৬০ কোটি ৪১ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা করেছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম।
এদিকে গত হিসাববছরে কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফা এর আগের আর্থিক বছরের তুলনায় ৫৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা বা প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। আর কর-পরবর্তী মুনাফা প্রায় ২৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ বা প্রায় ৬২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বেড়েছে।
মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বিষয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের বিপণন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আহমেদ শহীদুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়াতে ব্যয় কমানোসহ বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এবার এফডিআরের সুদের আয় কোম্পানির মুনাফায় বড় প্রভাব ফেলেছে। ওই আয় প্রায় ৩৩৭ কোটি ৫১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ কারণে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মুনাফা হয়েছে।’
এর আগে, আয়-ব্যয়ে অসঙ্গতির কারণে এর আগের তিন বছরে মুনাফায় পিছিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত মেঘনা পেট্রোলিয়াম। কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় কমলেও পরিচালন ব্যয় ৩৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা বেড়েছিল। এর জের ধরে পিছিয়ে পড়েছিল কোম্পানিটি। জ্বালানি তেলের বাজারের মন্দাবস্থা, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল বিক্রিতে ভাটা, অপরিচালন আয় কমে যাওয়ার বিপরীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও গ্র্যাচুয়িটি সংরক্ষণ করতে গিয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়ামকে এমন অবস্থার মুখে পড়তে হয়েছে। এমন অবস্থার মধ্যেই এফডিআরের সুদ আয় কোম্পানিটিকে এগিয়ে নিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১২-১৩ আর্থিক বছরে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মোট আয় ছিল ১৫২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা পরের অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছিল ১৪৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকায়। সর্বশেষ সমাপ্ত অর্থবছরে আয় আরও এক কোটি ৯৪ লাখ কমে ১৪২ কোটি দুই লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আয় কমার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। তিন বছর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় ছিল ৬২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ছিল। আয়-মুনাফা কমলেও এর আগের তিন বছরে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের পরিচালন ব্যয় ৩৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা বেড়েছে। এদিকে আয়-ব্যয়ে অসঙ্গতির কারণে ২০১৬-১৭ আর্থিক বছরে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কর-পরবর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৮৫ কোটি দুই লাখ টাকায় নেমেছিল।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রি, বিতরণ ও প্রশাসনিক খরচ এবং কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য গ্র্যাচুয়িটি সঞ্চিতি বৃদ্ধির কারণে কয়েক বছর ধরে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কর-পরবর্তী মুনাফা কমেছে। ২০১৪ সালের জুন শেষে কোম্পানিটি ২৩৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা করেছিল। যা কমে ২০১৭ সালের জুন শেষে ২১৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় নেমেছিল। বিভিন্ন গ্যাসফিল্ডে উৎপাদিত পণ্য (কনডেনসেট) বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে কেনাকেও পিছিয়ে পড়ার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। দায়িত্বশীলরা বলছেন, এর আগে ওই গ্যাসফিল্ডগুলোর কাছ থেকে সরাসরি কেনার সুযোগ ছিল। পরবর্তীতে গ্যাস ক্রয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ কারণে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের পণ্যেও মার্জিন কমেছে।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১০ কোটি ৮২ লাখ শেয়ার রয়েছে। এর মধ্যে ৫৮ দশমিক ৮৬ শতাংশের মালিক বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এছাড়া ৩৩ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও আট দশমিক ১৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীর হাতে রয়েছে। মুনাফার উল্লম্ফনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কিছুটা বেড়েছে। আর ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল সর্বশেষ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মেঘনা পেট্রোলিয়ামের প্রতিটি শেয়ার সর্বশেষ ২০৩ টাকা ৫০ পয়সা দরে লেনদেন হয়েছে।

সর্বশেষ..