প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

এমডি হওয়ার যোগ্য নন আলী রেজা ইফতেখার!

মাসুম বিল্লাহ ও শেখ শাফায়াত হোসেন: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী না হলে কোনো ব্যক্তি দেশের কোনো তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হতে পারবেন না। ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) বর্তমান এমডি আলী রেজা ইফতেখার স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী নন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী। সুতরাং নতুন করে তার কোনো ব্যাংকের এমডি হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু তারপরও তাকে নতুন আরও তিন বছরের জন্য এমডি হিসেবে পুনঃনিয়োগের বিষয়ে সম্প্রতি অনাপত্তি জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মাধ্যমে নিজেদের তৈরি করা নির্দেশনা নিজেরাই ভঙ্গ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ইফতেখারের ক্ষেত্রে এই ‘নমনীয়তার’ কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে দেনদরবার করে এই অনাপত্তি বাগিয়েছেন আলী রেজা ইফতেখার।
জানা গেছে, আলী রেজা ইফতেখার ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ ৩৪ বছরের ক্যারিয়ারে ইফতেখার ব্যাংক ইন্দোসুয়েজ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এবং এবি ব্যাংকসহ বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি ২০০৪ সালে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ইস্টার্ন ব্যাংকে যোগদান করার পর ২০০৬ সালে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০৭ সালের ২৯ আগস্ট তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পান। এর আগে সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৫ জুন তাকে তিন বছরের জন্য ব্যাংকটির এমডি হিসেবে পুনঃনিয়োগের বিষয়েও অনাপত্তিপত্র দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই দফার নিয়োগের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২৮ আগস্ট। ওই তারিখে আলী রেজা ইফতেখারের বয়স হবে ৫৮ বছর চার মাস।
জানা গেছে, গত ২৪ এপ্রিল ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখারের পুনঃনিয়োগের বিষয়ে অনাপত্তি চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন পাঠায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ওই আবেদনে ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ইস্টার্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৬৪৪তম পর্ষদ সভায় ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখারকে ২৯ আগস্ট ২০১৯ তারিখ থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য পুনঃনিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন চাওয়া হয়।
ওই অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে আলী রেজা ইফতেখারের দীর্ঘ ৩৪ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করে ‘স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ধারণ’-এর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার ‘নমনীয়’ দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে।
২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে ‘ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী নিযুক্তি ও দায়-দায়িত্ব সম্পর্কিত বিধি-বিধান’ প্রসঙ্গে ওই সার্কুলার জারি করা হয়। সার্কুলার লেটারে ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর একই বিভাগ থেকে জারি করা অন্য এক সার্কুলার লেটারে প্রধান নির্বাহী নিযুক্তির বিধানাবলির আওতাধীন অভিজ্ঞতা ও উপযুক্ততা সংক্রান্ত ‘অ (২) (খ)’ অনুচ্ছেদের নির্দেশনাটি প্রতিস্থাপন করা হয়।
প্রতিস্থাপিত নির্দেশনায় বলা হয়, ‘কোনো ব্যক্তি এমডি হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে তাকে কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিযুক্তি বা পুনঃনিযুক্তির ক্ষেত্রে অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং, ব্যবস্থাপনা কিংবা ব্যবসা প্রশাসন বিষয়ে উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়েই তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না।’ ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে ওই সার্কুলার লেটার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক; যা অবিলম্বে কার্যকর বলেও ঘোষণা করা হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম গতকাল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সার্কুলারের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এটা ঠিক যে, দেশের ব্যাংক খাতে অনেক এমডি রয়েছেন, যাদের এমবিএ বা পিএইচডি ডিগ্রি থাকলেও কর্মদক্ষতা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। আলী রেজা ইফতেখার একজন স্বনামধন্য ব্যাংকার। এই বিবেচনায় তাকে এমডি হিসেবে পুনঃনিয়োগ দেওয়া যেতেই পারে।’ তাহলে সার্কুলারে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারণের বিষয়টি কেন রাখা হয়েছে সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আগেই বলেছি সার্কুলারের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে সেখানে এমন কিছু বিষয় নিশ্চয়ই রয়েছে, যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতাকেও মূল্যায়ন করার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে বলা হতে পারে।’
এদিকে অনাপত্তি পাওয়ার পরপরই ইস্টার্ন ব্যাংকের বিজ্ঞাপনী এজেন্সি থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এমডি আলী রেজা ইফতেখারের পুনঃনিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়। এতে বলা হয়, আলী রেজা ইফতেখার ব্যাংক খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, করপোরেট কমপ্লায়েন্স এবং রেগুলেটরি বিষয়ে ব্যাপক অভিজ্ঞতার অধিকারী। তিনি ২০১৪-১৫ মেয়াদে দেশের ব্যাংকিং পেশাদারীদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের (এবিবি) চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ২০১২ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড প্রোগ্রামে তাকে ‘সিইও অব দ্য ইয়ার’ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
জানতে চাইলে আলী রেজা ইফতেখার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্যাংকের এমডি হওয়ার জন্য কোনো ব্যক্তিকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে এমন নির্দেশনাকে আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয় না। কেননা স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে কাজের তেমন কোনো সম্পর্ক থাকে না। অনেকে এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়েও সরকারি চাকরিতে বড় পদে থাকছেন। এতে আমি কোনো অসুবিধাও দেখি না।’
শিক্ষাজীবনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকে গুরুত্ব না দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে জারির পর বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন কি না জানতে চাইলে আলী রেজা ইফতেখার বলেন, ‘এখন আমি এই বুড়ো বয়সে কি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য লেখাপড়া শুরু করব?’
জানা গেছে, ইবিএল কর্তৃপক্ষ আলী রেজা ইফতেখারের পুনঃনিয়োগের অনাপত্তির আবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০১৬-১৭ মেয়াদে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচকগুলোয় (ঋণের প্রবৃদ্ধি, শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ হ্রাস, আমানত সংগ্রহ প্রভৃতি) উন্নতি হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় ইফতেখারের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি না থাকার বিষয়টি নমনীয় দৃষ্টিতে দেখা যায় এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি পদে পুনঃনিয়োগের বিষয়টি ইতিবাচক বিবেচনা করা যায় বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে এই ব্যাংক এমডি মাসে ১৬ লাখ ১০ হাজার টাকা বেতন-ভাতা প্রাপ্ত হচ্ছেন। পুনঃনিয়োগের ক্ষেত্রে মূল বেতন ১৪ লাখ টাকাসহ মাসিক মোট বেতন ১৮ লাখ টাকা বেতন-ভাতা প্রদানের প্রস্তাব করেছে ইবিএল কর্তৃপক্ষ।

 

সর্বশেষ..