মূলধন সংকটে নাজুক এরিস্টোক্র্যাট গ্রুপ

রাষ্ট্রায়ত্ত দুই ব্যাংকের ২৭৮ কোটি টাকা খেলাপি

পলাশ শরিফ: চলতি মূলধন সংকটে ধুঁকছে এরিস্টোক্র্যাট গ্রুপের দুই কোম্পানি। উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ১৫ শতাংশ ব্যবহার করে টিকে আছে প্যাকেটজাত চাল, ফিড মিল ও নন-ওভেন ব্যাগ উৎপাদনকারী দুটি কোম্পানি। তবে কোম্পানি টিকে থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত দুই ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। যে কারণে ঋণখেলাপির খাতায় নাম উঠেছে গ্রুপটির। অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকে গ্রুপটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৭৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক থেকে ২০১৫ সালে প্রকল্প ঋণ নিয়ে পথচলা শুরু করে এরিস্টোক্র্যাট গ্রুপের কোম্পানি এরিস্টোক্র্যাট নন-ওভেন লিমিটেড। একই সময় গ্রুপের অপর কোম্পানি এরিস্টোক্র্যাট এগ্রোর নামেও ঋণ নেওয়া হয়। তবে প্রতিষ্ঠার পরই মূলধন সংকটে পড়ে কোম্পানি দুটি। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে এখন অগ্রণী ব্যাংকের শীর্ষ ঋণখেলাপি এরিস্টোক্র্যাট গ্রুপ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে গ্রুপটির ওই দুই কোম্পানির খেলাপি ঋণ ১৪৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ কারণে এখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে এরিস্টোক্র্যাট গ্রুপ। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকেও খেলাপি ঋণ রয়েছে গ্রুপটির। ২০১৩ সালে নেওয়া ওই ঋণও খেলাপি হয়েছে, যা এরই মধ্যে ১৩৪ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
খেলাপি ঋণ বিষয়ে গ্রুপটির হিসাব বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার আবদুর রউফ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ঋণ বিষয়ে আমরা ব্যাংককে সবকিছু জানিয়েছি। এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এসব বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।’
ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, অগ্রণী ব্যাংকের রংপুর করপোরেট শাখা থেকে ওই ঋণ দেওয়া হয়েছিল। ঋণ আদায় না হওয়ায় ২০১৭ সালের শেষদিকে ঋণগুলোকে ঢাকার প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চে স্থানান্তর করা হয়। বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও আদায় না হওয়ায় খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত রয়েছে তাদের। তারপরও গ্রুপটির কাছ থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা আদায়ের চেষ্টা চলছে।
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এরিস্টোক্র্যাট গ্রুপের ব্যবসায়িক সুনাম রয়েছে। তারা ভালোও করছে। তারপরও ব্যবসায়ে পুরোপুরি দাঁড়াতে না পারায় তারা খেলাপি হয়েছে। তবে ওই ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত আছে। গ্রুপটির সংকট ও খেলাপি ঋণ আদায় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।’
এদিকে চলমান মূলধন সংকট কাটিয়ে লাভজনক হয়ে উঠতে গ্রুপটির আরও প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা দরকার। কিন্তু নতুন করে জামানত দেওয়ার সামর্থ্য না থাকা ও ঋণখেলাপির তকমার কারণে নতুন কোনো ঋণ পাচ্ছে না গ্রুপটি, যা তাদের চলার পথে বড় বাধা হয়ে উঠেছে। এভাবে চললে ঋণ পরিশোধ করা দুষ্কর হয়ে পড়বে।
এরিস্টোক্র্যাট গ্রুপের দায়িত্বশীলরা বলছেন, ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। এরপর কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার মতো চলতি মূলধন সংকট দেখা দিয়েছে। নতুন করে জামানত দিতে না পারায় কোনো ব্যাংক অর্থায়নে এগিয়ে আসছে না। অন্যদিকে পুরোনো ঋণগুলো খেলাপি হওয়ার পর সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতার ১৫ শতাংশ ব্যবহার করে যা আয় হচ্ছে, তাতে কোম্পানিগুলো টিকে আছে। কিন্তু বড় অঙ্কের ঋণ শোধ করতে পারছে না।
উল্লেখ্য, ৯০ দশকের শুরুতে বিদেশ থেকে ফিরে জমানো পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। ১৯৯৮ সালে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার মধ্য দিয়ে এরিস্টোক্র্যাট গ্রুপের পথচলা শুরু। ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে আটটি কোম্পানি গ্রুপের বহরে যুক্ত হয়েছে। ভোগ্যপণ্য, আবাসন, হোটেল, পিপি ওভেন ব্যাগ ও নন-ওভেন ব্যাগসহ ছয় ধরনের ব্যবসার মাধ্যমে দুই দশকে বেশ সুনামও অর্জন করেছে গ্রুপটি। কিন্তু সামর্থ্যরে তুলনায় বড় বিনিয়োগ গ্রুপটিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।