এলএনজি উৎপাদনে কাতারকে টপকাতে চায় রাশিয়া

শেয়ার বিজ ডেস্ক : তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশ কাতারকে টপকাতে চায় রাশিয়া। এ লক্ষ্যে সাইবেরিয়ান আর্কটিকে দুই হাজার ৭০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এলনজি কারখানা চালু করেছে দেশটি। শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এর উদ্বোধন করেন। খবর এএফপি।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে পাঁচ দশমিক পাঁচ মিলিয়ন টন এলএনজি উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে দেশটি। ২০১৯ সালের শুরুতে এ উৎপাদন ক্ষমতা ১৬ দশমিক পাঁচ মিলিয়ন টনে উন্নীত করা হবে।

উদ্বোধনকালে ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, এটি রাশিয়ার জন্য বড় আকারের একটি প্রকল্প। এর মাধ্যমে আমরা বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি। এ প্রকল্পের জন্য আমাদের সব প্রস্তুতি আছে।

বর্তমানে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রফতানিকারক দেশ। অন্যদিকে বিশ্বে প্রাকৃতিক গ্যাসের সবচেয়ে বড় রফতানিকারক দেশ রাশিয়া। দেশটিও এলএনজির বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। রাশিয়ার গ্যাজপ্রম চীনে গ্যাস রফতানি করতে নতুন পাইপলাইন করছে। এ পাইপলাইনে ২০১৯ সাল নাগাদ গ্যাস রফতানি শুরু হবে।

প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে ইয়ামাল এলএনজি। মাইনাস ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বাইরে এ প্রথম প্রকল্প থেকেই প্রথম চালান বরফাচ্ছাদিত ট্যাংকারে যোগ হবে।

এ প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার বেসরকারি গ্যাস উৎপাদনকারী কোম্পানি নোভাটেক চীনের সিএনপিসি ও ফ্রান্সের টোটালের সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে করেছে। ক্রিস্ট্রোফার মারগেরির নামে প্রথম চালান বহনকারী ট্যাংকারের নামকরণ করা হয়েছে। মারগেরি ছিলেন টোটালের প্রধান নির্বাহী, যিনি ২০১৪ সালে মস্কো বিমানবন্দরে রানওয়ে দুর্ঘটনায় মারা যান।

ইয়ামাল এলএনজি নামে এ প্রকল্পের মাধ্যমে এশিয়ার বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে যাচ্ছে রাশিয়া। এছাড়া আর্কটিকের বিশাল রিজার্ভ কাজে লাগাতে এ কারখানা ভূমিকা রাখবে। যদিও এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রকল্পের প্রথম উপপরিচালক দিমিত্রি মোনাকভ বলেন, ভূগর্ভস্থ হিমায়িত অঞ্চলে উষ্ণ অঞ্চলের তুলনায় এলএনজি উৎপাদন সহজ। সেক্ষেত্রে কাতারের তুলনায় এ প্রকল্পে উৎপাদন সহজ হবে। এছাড়া গ্যাসক্ষেত্রের পাশেই প্রকল্প হওয়ায় পরিবহন খরচও তুলনামূলক কম লাগছে। প্রকৃতি আমাদের অধিক কার্যকর গ্যাস উৎপাদনে সহায়তা করছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়েছে, তারপরও ঝুঁকি থেকে যায়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লসাকের উড ম্যাককেনজি বলেন, আর্কটিকে আবহাওয়াগত কারণে উৎপাদন অনেকটা চ্যালেঞ্জিং। এছাড়া উত্তর সাগর দিয়ে যে, রুটে পরিবহন করা হবে, তাও ততটা উন্নত না।

বিশ্বে জ্বালানি চাহিদার ৭০ শতাংশই রয়েছে এশিয়ায়। বিশেষ করে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতসহ শিল্প সম্ভাবনাময় দেশগুলোর প্রচুর জ্বালানির প্রয়োজন। সেই সঙ্গে পরিবেশদূষণমুক্ত রাখার দাবিও রয়েছে। আর সে কারণেই চাহিদা পূরণে তুলনামূলক পরিশুদ্ধ এলএনজির দিকে ঝুঁকছে দেশগুলো। তাই তো এলএনজির সবচেয়ে বড় রফতানিকারক দেশ কাতারের ৬০ শতাংশ গ্যাসই আসে এশিয়ায়।

সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশগুলোর অবরোধের মুখে এলএনজি উৎপাদন ৩০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে কাতার। এতে দেশটির বছরে এলএনজি উৎপাদন হবে ১০০ মিলিয়ন টন, যা বিশ্ববাজারে বর্তমানে সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশ। এ উৎপাদন অব্যাহত থাকবে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত। দেশটির এলএনজির শীর্ষ ক্রেতা দেশগুলো হচ্ছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য ও চীন। ইন্টারন্যাশনাল গ্যাস ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে কাতার ৭৭ মিলিয়ন টন এলএনজি রফতানি করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কাতারের এ ঘোষণায় এ বাজারে নতুন যুদ্ধ শুরু হবে। কাতারকে সরিয়ে বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি রফতানিকারক হতে চায় যুক্তরাষ্ট্রও। দেশটির পরিকল্পনায় থাকা ৩০টি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে ছয়টির নির্মাণকাজ চলছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রফতানি ছিল ৩৩০ হাজার টন। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশটির টার্মিনালগুলো নির্মাণ হলে এলএনজি রফতানি সক্ষমতা ৩০০ মিলিয়ন টন অতিক্রম করবে।

এদিকে বিশ্বে এলএনজির দ্বিতীয় রফতানিকারক দেশ অস্ট্রেলিয়াও রফতানিতে শীর্ষে আসতে চায়। বর্তমানে রফতানি সক্ষমতা রয়েছে ৩২ দশমিক আট মিলিয়ন টন। দেশটি নতুন করে পাঁচটি টার্মিনাল নির্মাণ করছে, আর আটটি পরিকল্পনায় রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকা ইরানও এখন এলএনজি উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে ফ্রান্সের টোটাল ও চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিএনপিসির সঙ্গে চুক্তি করেছে।