প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ এফডিআই বাংলাদেশে

ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০১৯

ইসমাইল আলী: প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বরাবরই পিছিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে গত বছর সে চিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। এ সময় বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৬৭ দশমিক ৯০ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এতে প্রথমবারের মতো সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে বিদেশি বিনিয়োগ। এর প্রভাবে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মধ্যে ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০১৯’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে। আজ বিশ্বব্যাপী প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গত বছর বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহের পরিমাণ ছিল তিন দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সালে এর পরিমাণ ছিল দুই দশমিক ১৫ বিলিয়ন ও ২০১৬ সালে দুই দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ২০১৭ সালে দেশে এফডিআই প্রবাহ কমে গিয়েছিল সাত দশমিক ৮০ শতাংশ। তবে ২০১৬ দেশে এফডিআই প্রবাহ বেড়েছিল চার শতাংশ।
২০১৮ সালে এফডিআই প্রবাহে বড় উল্লম্ফনের কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছে জাপান টোব্যাকো কোম্পানির দেড় বিলিয়ন ডলারে ঢাকা টোব্যাকো কোম্পানি অধিগ্রহণ। এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গত তিন বছরে এটি ছিল জাপানের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় বৃহৎ অধিগ্রহণের ঘটনা। এছাড়া গত বছর তৈরি পোশাক খাত ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতেও বড় বিনিয়োগ এসেছে।
এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গত বছর শীর্ষ ১০টি গ্রিনফিল্ড (নতুন) বিনিয়োগ প্রকল্পের দুটি ছিল বাংলাদেশে। এগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি ও চায়না হুদিয়ান করপোরেশনের জ্বালানি তেলভিত্তিক দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। কোম্পানি দুটি এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবে যথাক্রমে ৩০০ কোটি ও ৯৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
এর বাইরে জেনারেল ইলেকট্রিক আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চার দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই করে গত বছর। এছাড়া জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণের আরেকটি প্রকল্পে তিন বিলিয়ন ডলারের এফডিআই আকর্ষণ করেছে বাংলাদেশ। জেনারেল ইলেকট্রিক, জাপানের মিতসুবিশি ও সামিট সিঙ্গাপুর যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এগুলোর প্রভাবে চলতি বছরও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে বলে মন্তব্য করা হয়েছে আঙ্কটাডে।
এদিকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে দুই দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আসে। সে বছর প্রবৃদ্ধি হয় ৪৪ শতাংশ। আর ২০১৪ সালে এক দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ও ২০১৩ সালে এক দশমিক ৬০ বিলিয়ন এফডিআই এসেছিল। অর্থাৎ ২০১৪ সালে এফডিআই প্রবাহ তিন শতাংশ কমেছিল।
যদিও এক বছর বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে খুব বেশি আনন্দিত হওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অবকাঠামো ঘাটতিতে অন্যান্য এলডিসিভুক্ত দেশের তুলনায় বাংলাদেশ আশানুরূপ বিদেশি বিনিয়োগ পাচ্ছিল না। তবে এখন অবকাঠামো খাতেই বিশেষত বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগ আসছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক, ইস্পাতসহ অন্যান্য শিল্পেও বিনিয়োগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। অবশ্যই বিষয়টি ইতিবাচক। তবে এ প্রবাহ আরও বাড়াতে সরকারের নীতি সহায়তার পাশাপাশি ভৌত অবকাঠামো, বিশেষত সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বন্দর অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর এফডিআই আকর্ষণে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে ছিল যথাক্রমে মিয়ানমার ও ইথিওপিয়া। দেশ দুটিতে এ সময় এফডিআই প্রবাহ ছিল যথাক্রমে তিন দশমিক ৫৫ ও তিন দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। চতুর্থ অবস্থানে থাকা কম্বোডিয়ায় ২০১৮ সালে এফডিআই প্রবাহ ছিল তিন দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা মোজাম্বিকে গত বছর এফডিআই প্রবাহ ছিল দুই দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার।
আঙ্কটাডের তথ্যমতে, টানা তৃতীয় বছরের মতো ২০১৮ সালেও বিশ্বে মোট বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল নিন্মমুখী। এ সময় বিশ্বব্যাপী এফডিআই প্রবাহ ছিল প্রায় এক দশমিক ২৯ ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) ডলার। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল প্রায় এক দশমিক ৪৯ ট্রিলিয়ন ডলার ও ২০১৬ সালে এক দশমিক ৯২ ট্রিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী রেকর্ড দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এফডিআই প্রবাহ ছিল।
এদিকে বিনিয়োগ প্রবাহে বড় উল্লম্ফনে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে শীর্ষ থাকা ভারতে গত বছর বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল ৪২ দশমিক ২৮৬ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া তৃতীয় অবস্থানে নেমে যাওয়া পাকিস্তানে দুই দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ও চতুর্থ অবস্থানে থাকা শ্রীলঙ্কায় এক দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার এফডিআই যায়।
আঙ্কটাড বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ বাড়লেও তা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ছয় শতাংশ। ফলে এফডিআই-জিডিপি অনুপাতে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তলানিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির জিডিপির ৩৯৭ শতাংশ এফডিআই।
আগামীতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছে আঙ্কটাড। তাই এ বছরের প্রতিবেদনের প্রতিপাদ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল’। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আঙ্কটাড বলছে, বিনিয়োগ আকর্ষণে ২০১৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩৯টি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। আরও ৬০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। এর মাধ্যমে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান ও ৯ দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার এফডিআই আকর্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে আটটি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) রয়েছে। এগুলোতে ৭২ শতাংশ এফডিআই যাচ্ছে। এছাড়া দেশের মোট রফতানির ২০ শতাংশই ইপিজেডগুলো থেকে হয়। তবে এসব অঞ্চলে হাইটেক প্রযুক্তির কোনো শিল্প গড়ে ওঠেনি। মূলত তৈরি পোশাক খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় ইপিজেডগুলোতে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে সব ধরনের শিল্প গড়ে তোলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা অন্যান্য খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া নীতি সংস্কারের মাধ্যমে চলতি বছর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) তিন দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিবন্ধন করাতে পারবে বলে প্রত্যাশা করছে।
এদিকে বাংলাদেশে এফডিআই স্টক বাড়ছে বলে উল্লেখ করেছে আঙ্কটাড। এতে দেখা যায়, ২০০০ সালে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের আন্তঃপ্রবাহের স্টক ছিল দুই দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ছয় দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার। আর গত বছর তা আরও বেড়ে ১৭ দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ স্টক বাড়ছে, এতে খুশির কিছু নেই। বিনিয়োগ বাড়লেই যে দারিদ্র্য কমবে কিংবা কর্মসংস্থান তৈরি হবে, এমন কোনো কথা নেই। বিনিয়োগ যেটা হচ্ছে, তা কোন কোন খাতে, সেটা দেখার আছে। সামনে বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়বে, কিন্তু এতে মানুষের জীবনমানের কতটা উন্নতি হচ্ছে, দারিদ্র্যের পকেটগুলো থেকে মানুষকে বের করে আনা যাচ্ছে কি না, প্রবৃদ্ধি কতটা অর্জিত হচ্ছে এ বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে।

সর্বশেষ..