এলাকাবাসীর স্বপ্ন মহেশখালী হবে সিঙ্গাপুর

সাইফুল আলম: চট্টগ্রামের মহেশখালীতে দুই লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগে আগামী ১০ বছরের মধ্যে হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও কয়েকটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল। অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে এসব খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী জাপান, চীন, তাইওয়ান, মালয়েশিয়াসহ আরও কিছু দেশ। এতে আধুনিক একটি শিল্পাঞ্চলে রূপ নিতে যাচ্ছে এ দ্বীপটি। আর এমন সব কর্ম উদ্যোগে সৃষ্টি হবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। এসবেই এলাকাবাসীর স্বপ্নের ভিত্তি মহেশখালী হবে সিঙ্গাপুর।

সূত্রমতে, তিনটি ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত মহেশখালী উপজেলা। এগুলো হলো- সোনাদিয়া, মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা। সব মিলিয়ে মহেশখালী দ্বীপের আয়তন ৩৬২ দশমিক ১৮ বর্গকিলোমিটার। কক্সবাজার থেকে দ্বীপটির দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। উপজেলার উত্তর-পূর্বে চকরিয়া উপজেলা, দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজার সদর, দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পশ্চিমে কুতুবদিয়া উপজেলা। উপজেলার উত্তর-দক্ষিণমুখী মহেশখালী চ্যানেল দ্বারা মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এ দ্বীপকে কেন্দ্র করে ১০ থেকে ১৫টি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আর যেগুলো আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে। এর মধ্যে রয়েছে দশটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, তিনটি এলএনজি টার্মিনাল ও চারটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল। এছাড়া সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেল পরিবহনে করা হচ্ছে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল। কয়লা খালাসের জন্যও বড় টার্মিনাল হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন, রাস্তাঘাট, আবাসনসহ নানা প্রকল্পের মাধ্যমে মাতারবাড়ীকে সিঙ্গাপুরের আদলে একটি অত্যাধুনিক পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এর মাঝে ৩৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজার সদর থেকে সড়কপথে ৪০ কিলোমিটার ও নৌপথে চার কিলোমিটার দূরে মহেশখালী উপজেলার ছোট মহেশখালী, পাহাড় ঠাকুরতলা ও গোরকঘাটা, উত্তর নলবিলা ও ধলঘাটা মৌজায় চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ অঞ্চলগুলোয় যথাক্রমে মহেশখালী ও মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া যাবে। দেশের দুই সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে এর নৌ যোগাযোগও ভালো। এছাড়া মাতারবাড়ী ইউনিয়নকে একটি অত্যাধুনিক টাউনশিপ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, কয়লা আমদানির জন্য জেটি নির্মাণ, মাতারবাড়ী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন, কক্সবাজার থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত চার লেনের মহাসড়কসহ সমুদ্রের ওপর সেতু নির্মাণ করা হবে।

তবে মহেশখালীর উন্নয়নে স্থানীয়রা ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছেন। এমনই একজন মাতারবাড়ীর স্থায়ীয় বাসিন্দা ইকবাল বাহার। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতারা ও সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্বপ্নের সিঙ্গাপুরের গল্প শুনালেও অনেকটা হতাশ মাতারবাড়ীবাসী। কারণ মাতারবাড়ী যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম উত্তর নলবিলা জনতাবাজার-মাতারবাড়ী জিসি সংযোগ সড়ক জন্মলগ্ন থেকেই রোগাক্রান্ত। শুরুতেই পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ না হওয়ায় বর্ষাকালে প্লাবিত হয়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয় এতে। ফলে বারবার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

এলাকাবাসীর মতে, মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর পর থেকে এলাকার বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত মানুষগুলো এখন বেকার বসে সময় পার করছে। হয়তো এদের মধ্যে কেউ শ্রমজীবী, কেউ পেশাজীবী আর কেউ কৃষিজীবী ছিল। অনেকেই জমির ওপর লবণ চাষ কিংবা চিংড়ি চাষ করে জীবন ধারণ করতো। কিন্তু প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কারণে মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘পরিকল্পনা অনুসারে সরকার মহেশখালী বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করেছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এর ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু হবে। এ কাজ শেষ হলেই আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের মূল কাজে যাবো। এরই মধ্যে আমরা একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য টেন্ডারে গিয়েছি। যৌথভাবে আরেকটি টেন্ডারকাজ প্রক্রিয়াধীন। ইতোমধ্যে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য চুক্তি হয়ে গেছে। এর অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে আসছে সেপ্টেম্বরে। এতে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আশা করছি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ শেষ করবে ২০১৮ সালের মার্চে। ’

উল্লেখ্য, বর্তমানে মাতারবাড়ী এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ভবনের নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে চলেছে। এ জায়গায় পাশাপাশি আরও দুটি ভবন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া এলাকাটিতে সরকারের অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বেজা) পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

 

চট্টগ্রাম