এশিয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও লিঙ্গবৈষম্য সমস্যা

পারভেজ বাবুল: দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কিছু আন্তঃসীমান্ত সমস্যার সম্মুখীন, যা হিন্দু কুশ হিমালয় অঞ্চলের সীমানা অতিক্রম করে আমাদের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করছে। আমরা আঞ্চলিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, অপুষ্টি, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, লিঙ্গ বৈষম্যের সম্মুখীন। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মানুষের মধ্যে নিবিড় ক্রিয়াকলাপ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাসের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের অর্ধেক জলবায়ু ঝুঁকিতে পর্যবসিত। যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা মাত্রা অতিক্রম করে, তাহলে সমুদ্র স্তরের উত্থানের ফলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঘটবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলসহ স্থায়ী অঞ্চলসমূহ এবং অবকাঠামোগুলো স্থায়ীভাবে বিলীন হয়ে যাবে। আর বৈশ্বিক উষ্ণতা এক দশমিক পাঁচের উপরে হলে তা হবে স্থায়ী উন্নয়ন লক্ষ্যের জন্য (এসডিজি) হুমকি। তাছাড়া সীমিত জমিতে অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন এবং পারিবারিক পর্যায়ে খাদ্যের অর্থনৈতিক সুযোগ প্রদানের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভবত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এসব সমস্যা সমাধান করতে আঞ্চলিক সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্য, উপাত্ত ও পরিসংখ্যানগুলো ভাগাভাগি করা খুবই জরুরি। তাছাড়া খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পাবে। নারীরা শহর কিংবা শহরাঞ্চলে অভিবাসন করবে এবং জীবনযাত্রায় সুরক্ষিত হবে না। এমনিতেই জলবায়ু অভিবাসীদের সংখ্যা খুব দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়ে উঠছে। তাই দারিদ্র্য, ক্ষুধা, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং অপুষ্টি, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কমানোর জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। সেইসঙ্গে খরা, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, লিঙ্গ বৈষম্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো এখনই মোকাবিলা করা প্রয়োজন। এবং ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য মজুদ করার পাশাপাশি স্থায়ী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো পৃথিবীর আবাদযোগ্য জমির ১৫ শতাংশেরও কম দখল করে রয়েছে এবং বিশ্বের ২৫ শতাংশ জনসংখ্যার জন্য খাদ্য সরবরাহ করে থাকে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন ধরনের উন্নত ফসল উৎপাদন এবং ফসলের জোগান নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জোরালো উৎপাদনের অনিশ্চয়তা এখনও বিদ্যমান। স্থিতিশীল খাদ্য সিস্টেমের ঊর্ধ্বগতি বুঝে ওঠাও গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনশীলতা দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আমরা জানি, এশিয়া মহাদেশের কৃষি বিশ্বব্যাপী কৃষির মোট দেশীয় পণ্যের (জিডিপি) দুই তৃতীয়াংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই কৃষিজ উৎপাদনশীলতা সম্ভবত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যেমন বৃষ্টিপাতের ধরন। অল্প বৃষ্টিপাতের এলাকার কৃষিজ উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। তুলনামূলক ফলন কম হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে এবং দ্রুত বর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা লক্ষ্য অর্জনে গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টির পথে। তাই কৃষিজ উৎপাদনশীলতার স্থায়িত্ব বৃদ্ধির প্রচেষ্টার পাশাপাশি সময়মতো ও নির্ভুল তথ্য ব্যবহার করে কৃষিজ আবাদ (যেমন ফসল লাগানোর বীজ, ফসলের অবস্থা এবং ফলন মূল্যায়ন), খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া যেন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার চাবিকাঠি।
বর্তমানে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত অবনতির বিষয়গুলো প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চলমান। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পাহাড় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত সমগ্র পানির ওপর প্রভাব পড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়, চরম দরিদ্র, নারী ও শিশুদের জন্য এই পরিবর্তনগুলো নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। তাই প্রভাবগুলো মন্থর করার জন্য সাহায্যের প্রয়োজন। স্থিতিশীল সম্প্রদায়গুলোকে উন্নত করতে এবং অঞ্চলভিত্তিক বাস্তুতান্ত্রিক (ইকোসিস্টেম) পরিসেবাকে শক্তিশালী করার জন্য নীতিনির্ধারকদের সর্বদা প্রচেষ্টা করা উচিত। আবার আবহাওয়া নিদর্শন অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লাখ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায়। ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনগুলো (আজকাল আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকার কারণে কৃষকরা কৃষিজমি নষ্ট করে ইটভাটা, শিল্প-কারখানা ইত্যাদি স্থাপন করছে) নেতিবাচকভাবে পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে এবং বিশেষত পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে পতিত করছে (পাহাড়িরা পাহাড় কেটে বসতি করছে, পাথর উত্তোলন করছে)। অর্থনৈতিক, পরিবেশ, সামাজিক ও লিঙ্গভিত্তিক এসব ক্ষেত্রেও নীতিনির্ধারকদের কাজ করা উচিত।
সম্প্রতি এশিয়ান দুর্যোগ প্রস্তুতি কেন্দ্রের (এডিপিসি) সহযোগিতায় নেপালের কাঠমান্ডুতে খরা সম্পর্কিত একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। এখানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূমি পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি এবং প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, গবেষক এবং বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেন। আইসিআইএমডিডির জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেমের (জিআইএস) বিশেষজ্ঞ বীরেন্দ্র বাজরাচার্য উল্লেখ করেন, আমাদের আঞ্চলিক অংশীদারিত্বকে শক্তিশালী করতে হবে। কার্যকর পানি ব্যবহারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং জলবায়ু স্থিতিশীল চাষাবাদে কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগুলোর বাস্তবায়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক-অর্থনৈতিক, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এবং অবকাঠামোগত তথ্যের সঙ্গে ‘রিমোট সেন্সিং’ভিত্তিক বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত সম্প্রদায়গুলোকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সামাজিক ও লিঙ্গ দৃষ্টিকোণ: গবেষণায় দেখা গেছে, লিঙ্গ সম্পর্কিত ‘ক্রস কাটিং ইস্যু’ শীতকালীন ফসল উৎপাদনে ব্যর্থতা কৃষককে পরিবার ও পরিবারের সদস্যদের জন্য আশপাশের শহরগুলোয় বা অন্যান্য দেশে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করছে। পুরুষের অনুপস্থিতিতে নারী ও শিশু পরিবার পরিচালনা করে। খামারের দায়িত্ব এবং বাড়ির বাইরের উভয় কাজ নারীদের করতে হয়। অথচ এই কাজগুলো আগে পুরুষরা অনায়াসে করত। আবার বর্ষা মৌসুমে জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষকদের সঙ্গে মহিলাদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এতে নারীদের কাজের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। এছাড়া নারীদের পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবের কারণে শ্রমবাজারে তাদের সম্পৃক্ততা নেই; ববং তাদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অপব্যবহার করা হয়। এতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পায়। এটা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বৃদ্ধির নেতৃস্থানীয় ঘটনা। এরকম লিঙ্গ সংবেদনশীল সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে আঞ্চলিক সহায়তা প্রয়োজন।
সম্পদ প্রান্তিককরণ, খাদ্য অভ্যাস এবং নেতিবাচক প্রভাবগুলো নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। অভিবাসন এবং জোরপূর্বক অভিবাসন কৃষি উৎপাদন হ্রাস করছে এবং পুরুষদের চাকরিপ্রাপ্তির সুযোগের জন্য দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়। লিঙ্গগুলোর ভূমিকা পরিবর্তনের কারণেই অন্যদের মধ্যে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা বেড়ে ওঠে। বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘কৃষি জমিগুলো ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তাই আমাদের পরিসেবা সরবরাহের নিখুঁত উপায় নির্বাচন করে সত্যিকারের তথ্য নিশ্চিতকরণ এবং গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য সাফল্য এবং ব্যর্থতার প্রভাবগুলো পরিমাপ করতে হবে। তথ্য ব্যবহার করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়গুলোর দ্বারা প্রকল্প মালিকানা তৈরিতে উৎসাহের প্রয়োজন।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগগুলো জীবন ও জীবিকার জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বিপর্যয়গুলো প্রতিরোধ ব্যয় বাড়াচ্ছে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিচ্ছে। ফলে মাথাপিছু ভূমি প্রাপ্যতা এবং পানি প্রাপ্যতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। তাছাড়া উচ্চপর্যস্ত নীতিগুলো সর্বদা উপযুক্ত নয়। হিমালয় হিন্দুকুশ অঞ্চলের সরকারি ও বেসরকারি উভয় সংস্থাগুলোকে (এনজিও) সামাজিক সুরক্ষায় কাজ করতে হবে, যাতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারে।

পারভেজ বাবুল: গণমাধ্যমকর্মী
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মোহাম্মদ অংকন