এসডিজি বিষয়ে গবেষণা:দুর্নীতির কারণে বাস্তবায়নে ঝুঁকি দেখছে টিআইবি

 

নিজস্ব প্রতিবেদক: টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার ১৭টি অভীষ্ট রয়েছে। এর মধ্যে ১৬তম অভীষ্টকে (এসডিজি-১৬) সুশাসনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়। এই অভীষ্ট অর্জনে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যথেষ্ট পরিপুষ্ট। এজন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতিও ইতিবাচক। কিন্তু আইন প্রয়োগ ও চর্চায় দুর্বলতা এবং ঘাটতি রয়েছে। আইনের অপব্যবহার ও রাজনৈতিক বিবেচনায় আইনের প্রয়োগ হচ্ছে। ফলে এসডিজি-১৬ বাস্তবায়নে ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ১৬: দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যের ওপর বাংলাদেশের প্রস্তুতি, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার টিআইবির ধানমন্ডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. ওয়াহিদ আলম এবং এএসএম জুয়েল মিয়া।

সুলতানা কামাল বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্যে নানামুখী পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও বিভিন্ন জরিপ ও তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, এর সুফল সব ক্ষেত্রে জনগণ পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সব পরিকল্পনা, কার্যক্রম ও কর্মসূচিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’

গুণগত এ গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশে দুর্নীতি ও ঘুষ, অর্থ পাচার, মৌলিক স্বাধীনতার ব্যত্যয় ও মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কাঠামোর জন্য প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলো প্রত্যাশিত পর্যায়ে কার্যকর নয় এবং দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, নির্বাহী বিভাগ ও প্রশাসনের আধিপত্য চলছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই জনগণের কাছে জবাবদিহির কোনো কাঠামো নেই এবং এসব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ব্যবস্থাও দুর্বল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশও পর্যাপ্ত নয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

এসডিজি-১৬-এর চারটি লক্ষ্য রয়েছে, যা হলো ২০৩০ সালের মধ্যে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো, ব্যবহƒত সম্পদের পুনরুদ্ধার ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং সব ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলা করা, সব ধরনের দুর্নীতি ও ঘুষ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করা, সব স্তরে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানের বিকাশ এবং জাতীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির ভিত্তিতে তথ্যপ্রাপ্তির অবাধ সুযোগ ও মৌলিক স্বাধীনতার সুরক্ষা করা।

এ গবেষণা অনুযায়ী, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে অন্যদেশে এবং অন্য দেশ থেকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর রাজনীতিকরণ, দুর্নীতিতে রাজনৈতিক-প্রশাসনিক আঁতাত, সিকিউরিটিজ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের রাজনীতির সঙ্গে ত্রিমুখী সম্পৃক্ততা প্রভৃতিকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের নির্বাহী কমিটি বা বোর্ডে রাজনৈতিক নিয়োগ, অর্থ পাচারসংক্রান্ত মামলার তদন্ত ও নিষ্পত্তিতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের শুরুতে কার্যকরভাবে অর্থ পাচারসংক্রান্ত অপরাধের তথ্য যাচাই না করা, অবৈধ অর্থের উৎস সন্ধান ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি; দুদক ও এনবিআর’র মতো নিয়ন্ত্রক ও তদারকি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ঘাটতি ও নিজস্ব মামলা পরিচালনা ইউনিটের অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়।

গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশের ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে সন্তোষজনক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পাশাপাশি সক্ষমতা ও প্রস্তুতি বিবেচনায় বাংলাদেশ সঠিক পথে রয়েছে, তবে গবেষণায় উদ্্ঘাটিত ঘাটতি ও উদ্বেগের বিষয়গুলো নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হলে অভীষ্ট অর্জনের পথ থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করা, সংবিধানের ৭০ ধারা সংশোধন করে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া সংসদ সদস্যদের নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা, অধস্তন আদালতের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণমূলক ধারা বাতিল করা, সরকারি কর্মচারীদের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, অধিকার ও দক্ষতা নিশ্চিতকরণে পাবলিক সার্ভিস আইন প্রণয়নের পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া পুলিশকে জনবান্ধব করার জন্য পুলিশ আইন ১৮৬১ সংস্কার এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর ৫৪ ধারা বাতিল করা, এমপিদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় উপদেষ্টা করার বিধান বাতিল, তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০১৩’র ৫৭ ধারা বাতিলকরণ এবং বৈদেশিক অনুদান আইন ২০১৬’র ১৪ ধারার নিবর্তনমূলক অংশ বাতিল করার দাবি করা হয়।