ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস আজ

কাজল সরকার: আজ ৪ এপ্রিল ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক একটি দিন। একাত্তরের এ দিনে ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা-বাগান ব্যবস্থাপকের বাংলোয় দেশকে স্বাধীন করার শপথ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানেই রণাঙ্গনকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করেন কর্নেল আতাউল গনি ওসমানী।

মেজর খালেদ মোশাররফ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান আশ্রব আলীকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত যাওয়ার মতো একটি রাস্তা করার নির্দেশ দিলে চা-বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে জঙ্গল কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়। ২ এপ্রিল কর্নেল এমএজি ওসমানী প্রথম সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলায় পৌঁছান। ওইদিন বিকালে ভারতীয় বিএসএফের পূর্বাঞ্চলীয় ব্যাটালিয়ন কমান্ড্যান্ট পাণ্ডেকে তেলিয়াপাড়া হেডকোয়ার্টারে পাঠান। তিনি তেলিয়াপাড়া পৌঁছে লে. কর্নেল এমএম রেজা, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর সাফায়েত জামিলসহ আরও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

৪ এপ্রিল সকালে একটি জিপ ড্রাইভারসহ আশ্রব আলীকে একজন সৈনিক দিয়ে ভারতে পাঠানো হয়। সেখানকার সিদাই থানা থেকে এসে এমএজি ওসমানী তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ম্যানেজার বড় বাংলোয় ২৭ সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ে বৈঠকে মিলিত হন। এ বৈঠকেই পুরো রণাঙ্গনকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করেন আতাউল গনি ওসমানী। বৈঠকে রাজনৈতিক আন্দোলন জোরদার, স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর গুরুত্বারোপ করাসহ যুদ্ধের রণনীতি ও রণকৌশল ম্যাপ রচনা করা হয়।

সেখানে মুক্তিবাহিনীকে প্রথমে ‘মুক্তিফৌজ’ নামকরণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তা ‘মুক্তিবাহিনী’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। ১ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া চা-বাগানকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে টার্গেট করে বাঙালি সেনাবাহিনী দ্বিতীয় ও চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট হেডকোয়ার্টার এখানে প্রথম স্থাপন করা হয়। তেলিয়াপাড়ার এ বাংলো থেকেই ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল এমএজি ওসমানী নিজের পিস্তলের ফাঁকা গুলি ছুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেন। ওয়্যারলেসে পাকবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ ও গোপন তথ্য পাঠানোর অভিযোগে তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের তৎকালীন ব্যবস্থাপক বিহারি জরিপ খানকে গ্রেফতার করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সেদিনের স্মৃতি হিসেবে এবং দুই, তিন ও চার নম্বর সেক্টরের শহীদদের স্মরণে তেলিয়াপাড়া ডাকবাংলোর পাশে নির্মাণ করা হয়েছে বুলেট আকৃতির স্মৃতিস্তম্ভ। কিন্তু সেখানে একটি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের তিন কোটি টাকার প্রকল্প এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১১ সালের ৭ মে তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের আয়োজনে এক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মুর্শেদ খান ও মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক তেলিয়াপাড়াকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যটন এলাকায় রূপান্তরের ঘোষণা দেন। এ সময় তারা ওই স্থানে একটি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। কিন্তু এ প্রকল্প কয়েক বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। সব সমস্যা সমাধান করে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করার দাবি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের।

 

গণমাধ্যমকর্মী