ঐতিহ্যবাহী বটতলা হাট

উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গবাদিপশুর হাট বটতলা। দেশি গরুসহ গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও কবুতরের জন্য হাটটি বিখ্যাত। দেশের অন্যতম বৃহৎ গরুর হাট এটি।  নামকরণের পেছনে দুশো বছরের পুরোনো বটগাছের অস্তিত্ব এখন আর নেই। জনশ্রুতি মতে, যে জায়গায় বটগাছটি ছিল, সেখানে এখন রয়েছে বহুতল ভবন। শুরুর দিকে কোন ধরনের পণ্য কেনাবেচা হতো আর কবে থেকে গবাদিপশুর হাটে রূপান্তরিত হয় তা নিশ্চিত করা যায়নি। জনজীবনে ব্যবহৃত সব পণ্যের সমাহার থাকলেও এটিকে এখনও গরুর হাট নামেই ডাকা হয়। শাড়ি, লুঙ্গি, মাছ, কাঁসা-পিতল, মাটির তৈরি গৃহস্থালির আসবাবসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য পাওয়া যায় এ হাটে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের অসংখ্য মানুষ গরু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। গৃহপালিত আর বিদেশি গরু কিনতে দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীর ভিড় দেখা যায় এখানে। ৮০’র দশকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার গরু ব্যবসায়ীরা প্রতি হাটে আসতেন। বিভিন্ন কারণে এ হাটের কদর কমলেও এখনও ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ী আসেন এ হাটে। শুরু থেকেই শুক্র ও মঙ্গলবার বসে এ হাট। গবাদিপশু এ হাটের মূল আকর্ষণ।

পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডে (রাজারামপুর মৌজা) হাটটির অবস্থান। জনশ্রুতিমতে, ১৮০০ সালের প্রথম দিকে হাটটির যাত্রা শুরু। সে সময়ের বটগাছটি ব্রিটিশ আমলে বিলুপ্ত হয়ে যায়। হাটটির খুব কাছে মহানন্দা নদী। এক সময় নৌকা ও গরুর গাড়িতে করে হাটে আসতেন ক্রেতা-বিক্রেতা।

সোনালি আঁশ হিসেবে পরিচিত উৎপাদিত পাট, কৃষিপণ্য, ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নির্ভরযোগ্য হাট বটতলা। এ হাটে বিভিন্ন পণ্যের স্থায়ী বিক্রেতার সংখ্যা দু’শতাধিক। ১৯০৩ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভায় রূপান্তরের আগে সব কাঁচা রাস্তা ছিল। ক্রেতা-বিক্রেতাদের পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল গরুর গাড়ি। গরুর গাড়িতে করেই বিক্রেতারা পণ্য নিয়ে আসতেন। ক্রেতারাও নিত্যপ্রজোনীয় পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন গরুর গাড়িতে। এক সময় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলনও ছিল এ এলাকায়।

মাঝারি শহর উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর অধীনে ২০০১ সালে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার্থে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় এ হাটের। পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ৯০ দশকের দিকে এ হাটটির ইজারামূল্য ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা। পার্শ্ববর্তী জেলা রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জে করিডোর আর সীমান্ত এলাকায় বিট খাটাল স্থাপনের পর গরুর হাটটিতে জনসমাগম কমতে থাকে। জনসমাগম কম হওয়ায় বর্তমানে বার্ষিক ইজারামূল্য মাত্র ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। ৯০’র দশকে এ হাটের ইজারামূল্য ছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকা।

একাধিক প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে আলাপে জানা যায়, এক সময় এখানকার বেশিরভাগ বিক্রেতা ছিলেন নারী। নারী ক্রেতাদের সমাগমও ছিল বেশ। সদর উপজেলার গ্রামাঞ্চলের পাঁচ ইউনিয়নের মানুষ এক সময় এ হাটের ওপর নির্ভরশীল ছিল। দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতা আসতেন এখানে।

খুব সকাল থেকেই বিক্রেতারা হাটে আসতে শুরু করেন। ক্রেতারাও খুব সকালে আসেন কেনাকাটা করতে। সকাল  থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা।  মাংস,  মাছ,  সবজির বেচাকেনা দুপুরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। গরু, ছাগল, হাঁস, কবুতর, শাড়ি, লুঙ্গিসহ অন্যান্য পণ্যের বেচাকেনা চলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। বাঁশ বা বাঁশের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হতো, যা এখনও পাওয়া যায় এ হাটে। চাহিদা কমতে থাকায় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন শিল্পটি বিভিন্ন কারণে পরিসর কমলেও এখনও এ হাটে পাওয়া যায় মাটির তৈরি সামগ্রী।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল বারেক জানান, ব্রিটিশ আমলে এ হাটে ঘোড়া বেচাকেনা হতো। এ এলাকায় বিয়েসহ বিভিন্ন ধরনের ভোজ অনুষ্ঠানের দিন-তারিখ ঠিক করা হতো হাটবারের সঙ্গে মিল রেখে। শুক্র বা মঙ্গলবারের পরদিন নির্ধারিত হতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দিন-তারিখ, যেন হাট থেকে পণ্য কিনে অতিথি আপ্যায়ন করা যায়।