হোম প্রচ্ছদ ঔপনিবেশিক বাংলার গণদারিদ্র্যে রণদা

ঔপনিবেশিক বাংলার গণদারিদ্র্যে রণদা


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

অনাথ শিশুর মতো যার জীবনখানি নিস্তরঙ্গে নিথর হতে পারতোÑনিযুত জীবনের নিঠুর নিয়তিপাশে তিনিই জুগিয়েছেন হৃৎস্পন্দনের খোরাক। দেশের জন্য লড়েছেন। শূন্য জমিনে গড়েছেন ব্যবসাকাঠামো। জীবনের সব অর্জন লিখে দিয়েছেন সাধারণের নামে। তিনিই দেশের সবচেয়ে সফল ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান ‘কুমুদিনী ট্রাস্ট’-এর জনক রণদা প্রসাদ সাহা। নারীশিক্ষা ও চিকিৎসায় নারী-পুরুষ কিংবা ধনী-গরিবের ভেদ ভেঙেছেন। তার জীবনে রয়েছে সসীমকে ডিঙিয়ে অসীমে শক্তিসঞ্চারের প্রয়াস। এ জীবন ও কেতন যেন রোমাঞ্চিত হৃদয়েরই উদ্দীপ্ত প্রেরণা।  পর্ব: ৩

মিজানুর রহমান শেলী: দক্ষিণে সুন্দরবন উপকূল। তারপর বাঁকা পথে ঢাকা, পাবনা, মুর্শিদাবাদ হয়ে উত্তরের লালমাটির নিম্ন সীমারেখা পর্যন্ত উঁচু এক প্রান্তর। এ প্রান্তরের নিচে বিস্তীর্ণ বঙ্গীয় ব-দ্বীপ অঞ্চল। এ বাংলা অঞ্চলে উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে জনসংখ্যা ছিল দুই কোটির কিছু বেশি। তাতে গড়পড়তায় প্রতি কিলোমিটারে ১০০ লোক বাস করত। এখানে ছিল ছোট ছোট কৃষিভিত্তিক গ্রাম। পলিমাটির আবরণে সমৃদ্ধ ফসলি মাঠগুলো দূর অবধি বিস্তৃত ছিল। গাছগাছালিতে ঘেরা দিগন্ত। বনজঙ্গলে মাঠ-ঘাট ছিল অনেকটা আচ্ছন্ন। তাই মোট ভূমির প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ ছিল অনাবাদি। তবে মৌসুমি বাতাস যখন তুঙ্গে, তখন মাঠ জলে ভরে যেত। তাতে প্রকৃতি আর কায়িক শ্রমভিত্তিক কৃষিকাজে আসত জোয়ার। বাংলার ফসলি মাঠে ঢেউ খেলত ধানক্ষেত। আবার শীত মৌসুমের খরিপ শস্য ফলত কিছু কিছু আবাদি জমিতে। বাদবাকি অনাবাদি। তবে এ বাংলায় সব ধরনের ফসল হতো। এ কারণে বহু পণ্ডিতের ভাষায় বাংলা ছিল প্রাচ্যের শষ্যভাণ্ডার। মোগলরা এখানে সেচব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। হাজার বছর ধরে এ প্রান্তরে ধান চাষ হয়েছে।

কুটিরশিল্প ছিল এখানকার অর্থনীতির আরেক সমৃদ্ধ মাধ্যম। সুতাকাটা, কাপড় বোনা আবার দেশ-বিদেশে তার বাজার তৈরিতে বাংলার যশ ছিল মোগল আমল থেকে। বাংলার সিল্ক ও সুতার কাপড়ের কদর ছিল বিশ্বসভার প্রতিটি কোণে। তবে বাংলার এ গ্রামগুলোয় রাস্তা বলতে তেমন কিছু ছিল না। পূর্বাঞ্চলে নৌপথ ছিল একমাত্র অবলম্বন। আর পশ্চিমের রাস্তা ছিল অপেক্ষাকৃত উন্নত। কয়েকটি অসমান মেঠোপথ রাজধানী বা মফস্বল শহরকে যুক্ত করেছিল। এসব রাস্তার বেশির ভাগই জমির আইল হিসেবে গড়ে ওঠা। তার কিছু কিছুতে চাকাওয়ালা গাড়ি চলতে পারত।

বাড়িগুলো ছিল ৫০০ থেকে ১০০০ বর্গগজের মধ্যে। ফসলি মাঠ থেকে উঁচু। বৃক্ষ, লতা ও গুল্মে ঘেরা। এক এক বাড়িতে গড়ে চারটি ঘর থাকত। দেউড়ি বা প্রবেশদ্বারের পাশের ঘরে বৈঠকখানা। তারপরের ঘরে নারী ও শিশুরা থাকত। আর অন্য দুটির একটি রান্নাঘর, আরেকটি গোলা। মাঝখানে উঠোন। এখানে বসে নারীরা সুতো কাটত, ফসল শুকাত। এভাবেই গ্রামীণ বাংলার জীবনে ছিল কষ্টার্জিত শান্তি।

এরপর আসে কোম্পানি আমল। কোম্পানি আমলে বাংলার মানুষের জীবনে নানামুখী সংকোচ আরও প্রকট হওয়া শুরু করে। ১৭৬৫ সালে কোম্পানি দিল্লির সম্র্রাটের কাছ থেকে দেওয়ানি লাভ করে। দেওয়ানির নামে কোম্পানি বাংলায় শোষণ ও উৎপীড়নের রাজ্য কায়েম করল। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল কর আদায়। জনগোষ্ঠীকে তারা কখনও প্রজা বা মানুষ বলে বিচার করেনি। ফলে কিছুদিন পরেই অর্থাৎ ১৭৬৯ সালে পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর বাংলার বিশাল প্রান্তরজুড়ে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। যেকোনো জেলার মতো টাঙ্গাইলেও আছড়ে পড়ে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট।

এ সময় বাংলার গভর্নর ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। দুর্ভিক্ষে প্রজাদের প্রাণের প্রশ্ন কোম্পানির রাজস্বের হিসাবের কাছে নস্যি হয়ে যায়। তিনি কোম্পানি পরিচালকদের কাছে লেখেন, ‘মন্বন্তরে যে বিপর্যয় ঘটেছে, তাতে রাজস্ব সমহারে কমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কমেনি। কেননা যে কোনোভাবেই হোক আমি রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আগের স্তরে স্থির রাখতে সক্ষম হয়েছি।’ এই প্রয়োজনে ‘নজয়’ নামে একটি কর ব্যবস্থা চালু রাখা হয়। ‘নজয়’ বিধানে পতিত পড়ে থাকা জমিরও কর দিতে হতো।

হেস্টিংস এ নজয়ের ব্যাখ্যায় বলেন, দুর্ভিক্ষে মৃত্যু বা দেশত্যাগের ফলে জনসংখ্যা কমে যায়। ফলে জমিও অনাবাদি পড়ে থাকে। তখন ওই অঞ্চলে যারা জীবত বা টিকে থাকে, তাদের ঘাটতি রাজস্ব পূরণ করতে হয়। হেস্টিংস আরও বলেন, অমানবিক হলেও এ কৌশলই রাষ্ট্রের কোষাগারের ঘাটতি মিটিয়েছে। তাই এটা যৌক্তিক। এমনকি এই করের কারণে জনগণ কাউকে দেশত্যাগ করতে দেয়নি। অন্যদিকে রাজস্ব আদায়কারীরাও দেশত্যাগ বা মৃত্যুর কারণ দেখিয়ে উত্তোলিত রাজস্ব আত্মসাৎ করতে পারেনি। ফলে ইজারাদার বা সিকদারেরা নিজেদের ইচ্ছামতো কর আদায় করতে থাকে।

এ দুর্ভিক্ষের ভয়াল চিত্রকে স্টিভ ডগলাস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গণহত্যা আখ্যা দিয়েছেন। উপরন্তু ব্রিটিশের শোষণকেই এ দুর্ভিক্ষের একমাত্র কারণ বিবেচনা করেছেন তিনি। তাই ব্রিটিশ আমলের পুরো সময়কালকে গণহত্যার সময়কাল বলতেও দ্বিধা করেননি। উল্লেখ্য, এ দুর্ভিক্ষে বাংলায় এক কোটি মানুষ নিহত হয়। ডব্লিউ হান্টার এ সংখ্যাকে মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ বলেছেন। অর্থাৎ বাংলায় মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষের মৃত্যু হয়! অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, আগের দিনে কৃষকরা উদ্বৃত্ত ফসলের ১০-১৫ শতাংশ খাজনা দিত। কিন্তু কোম্পানি তাদের কাছ থেকে ৪০-৫০ শতাংশ খাজনা তুলতে থাকে। তাছাড়া এ হার প্রায়ই বিভিন্ন শর্তে বাড়তে থাকত।

১৭৬৫-৬৬ অর্থবছরে তারা ২২ লাখ ৫৮ হাজার ২২৭ পাউন্ড আদায় করল। এর পরের বছরেই রাজস্ব বেড়ে দাঁড়াল ১.৬৭ গুণ। অবশ্য রাজস্ব বৃদ্ধির এ পরিমাণ পরবর্তী সময়ে প্রায় একই হারে চলমান থেকেছে। অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার। দুর্ভিক্ষের মধ্যে ১৭৬৯-৭০ ও ১৭৭০-৭১ অর্থবছরে তারা ৩৩ লাখ ৪১ হাজার ৯৭৬ ও ৩৩ লাখ ৩২ হাজার ২৪৩ পাউন্ড রাজস্ব আদায় করে।

ডব্লিউ হান্টার ‘এনাল অব রুরাল বেঙ্গল’ বইতে লেখেন, দুর্ভিক্ষের পরে জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় কৃষক ও জমিদারের মধ্যে সম্পর্কে পালাবদল ঘটে। একসময় আবাদি জমির তুলনায় কৃষক ছিল বেশি। কিন্তু এ সময় আবাদি জমি বেড়ে যায়, কিন্তু কৃষকের সংখ্যা কমে যায়।

এরপর ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়। ফলে ব্রিটিশদের আয় ও শাসন ক্ষমতা নিশ্চিত হলো। এ বিধান মোতাবেক সব জমির মালিক হন জমিদাররা। হিন্দু ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইন মোতাবেক জমিদারের মৃত্যুর পরে জমির মালিক হন জমিদারের উত্তর-পুরুষরা। তবে এ আইনে জমিদাররাও লাভবান হতে পারেননি। কেননা কোনো জমিদার যথাসময়ে রাজস্ব পরিশোধ করতে না পারলে, তার জমি নিলামে উঠত। উপরন্তু এ ব্যবস্থায় কৃষি ও শিল্প উভয়েরই উন্নয়ন হবে বলে ইংরেজরা ধারণা করেছিল। কিন্তু তা হয়নি।

এদিকে ১৭৭০ ও ১৭৮০ সালে তাঁতিদের ওপর নেমে আসে আরেক জবরদস্তিমূলক আইন। এ আইনে কোম্পানি জোর করে তাঁতিদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিত। গোপনে পণ্য বিক্রি করলে তাঁতিদের শাস্তি ভোগ করতে হতো। ফলে তাঁতি সম্প্রদায় কারিগরি ছেড়ে কৃষি বা দিনমজুরিতে চলে গেল। এর ফলে ১৮২০-১৮৪০ সালে ল্যাঙ্কশায়ারের সুতা ও কাপড় ভারতের বাজার দখল করে নেয়। আবার ব্রিটিশরা ভারতের বাজার পুরোপুরি দখল নেওয়ার জন্য ১৮১৩ ও ১৮৩৩ সালে মাঠজরিপ করে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করল। তাছাড়া দেশি পণ্যে বিভিন্ন শুল্ক ও কর আরোপ করা হয়। তাতে মসলিনের মতো নানা পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলো

বলা হয়, এ সময় ভারত বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে জড়িয়ে পড়ে। ভারতে তখন বি-শিল্পায়ন বলতে যা হয়েছিল, তাকে নিরেট বাণিজ্যঘেঁষা অর্থনীতি বলা যাবে না। বরং এটা ছিল গ্রামীণ কায়দায় গড়ে ওঠা শিল্পকাঠামোর পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকাঠামো। ফলে শিল্পপণ্যের দাম কমতে থাকে। একই সঙ্গে, কারিগর শ্রেণি কৃষিকাজে নিয়োজিত হয়। এসব কারণে বিশ্ববাজারে বাংলার অবস্থান অধঃপতিত হলো। বাংলা কাপড় রফতানি না করে আমদানি করতে শুরু করে। তাঁতিরা বেকার হয়ে পড়ে। শুরু হয় দারিদ্র্য।

আর. সি দত্ত দাবি করেন, ১৮ শতকে ভারত ছিল বিশাল এক শিল্প-উৎপাদনমুখী ও কৃষিনির্ভর দেশ। ভারতের উৎপাদিত লুম বা পশম এশিয়া ও ইউরোপের বিশাল বাজারে সরবরাহ হতো। আঠারো শতকের শেষের দশক ও উনিশ শতকের শুরুর দশকে ব্রিটেন ভারতে কিছু নীতিমালা প্রয়োগ করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারত হবে গ্রেট ব্রিটেনের শিল্প-কারখানার দাস এবং ভারতের জনগণ কেবল ভারত থেকে লুম বা পশম ও কল-কারখানার কাঁচামাল গ্রেট ব্রিটেনে পাঠানোর কাজে ব্যবহার হবে। তাছাড়া আর. পাল্মি দত্তের ভাষায়, বি-শিল্পায়নের মাধ্যমে প্রাচীন কুটিরশিল্পকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। মিল-কারখানার অগ্রগতির মাধ্যমে প্রাচীন কুটিরশিল্পের চাহিদা মিটমাট করা হয়েছিল। কার্যত উনিশ শতকের ধ্বংস প্রক্রিয়া বিশ শতক ও যুদ্ধপরবর্তী সময় পর্যন্ত এগিয়ে চলেছিল। এভাবেই গণদারিদ্র্য শুরু হয় বাংলায়।

তির্থঙ্কর রায়ের বয়ান ঠিকমতো বুঝলে বলা যায়, সবচেয়ে গরিব লোকটির বাজারের পোঁটলাখানির আয়তন নির্ধারণ করেছিল ব্রিটিশ সরকার, যাকে বলে দারিদ্র্যসীমা। অথচ ভারতের গণমানুষের বাজারের থলি এই দারিদ্র্যসীমার চেয়েও ছোট হয়ে এসেছিল। এটা ১৮৭৫ সালের পরের কথা।

ঠিক এ সংকটকালের মধ্যেই রণদা প্রসাদ সাহার জš§। ক্ষুধা-দারিদ্র্যের কোলে নিষ্পেষিত হয়েই তিনি কলকাতা গিয়েছেন। সেখানে তিনি কুলি-মজুরের কাজ করে দিনাতিপাত করতেন। ভাগ্যানুসন্ধানী রণদার জীবনের ব্যথা যেন পুরো বাংলার ব্যথার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তখন কলকাতায় শিক্ষিত বেকার গোষ্ঠীর হƒদয়ে অভিমানের বারুদ জ্বলছিল। এ সময় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের ডাকে রণদা প্রসাদ সাহা সাড়া দেন। আস্তে আস্তে স্বদেশি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।

স্বদেশি আন্দোলনের মূলমন্ত্রই ছিল দেশি পণ্যের বাজার সৃষ্টি। স্বদেশের মৃতপ্রায় শিল্প আবার জাগিয়ে তোলা। এই আপন শক্তি বাড়িয়ে তোলার প্রেরণাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভিন্ন নামে ডেকেছেন। তিনি একে আত্মশক্তি বলেছেন। তিনি বলেনÑ“আমাদের গ্রামের, আমাদের পল্লীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পথঘাটের উন্নতি, সমস্তই আমরা নিজে করিতে পারিÑযদি ইচ্ছা করি, যদি এক হই, এজন্য গবর্মেন্টের চাপরাস বুকে বাধিবার কোনো দরকার নাই।” তিনি আরও বলেন, “দেশের শিল্পবাণিজ্যকে স্বাধীন করিয়া নিজের শক্তি অনুভব করিব, দেশের বিদ্যাশিক্ষাকে স্বায়ত্ত করিব, সমাজকে দেশের কর্তব্যসাধনের উপযোগী বলিষ্ঠ করিয়া তুলিব।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অবধি চিন্তার সঙ্গে রণদার মতো প্রান্তিক মানুষ বা স্বদেশিদের চিন্তার মিল ছিল।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্বদেশিদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও কৌশলে বিভেদ সৃষ্টি হলো। রণদাও তাই সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গে যুক্ত হন। কেননা ওই সময় রবিঠাকুরের পরিবার ছিল জমিদার পরিবার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায় উদ্যোক্তা হয়েছিলেন। অবশ্য এ কৌশল ঠাকুর পরিবারে দ্বারকানাথের প্রপিতামহ পঞ্চানন কুশরীরর হাত ধরে রপ্ত হয়। তাছাড়া জমিদারির উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে রবিঠাকুরের পরিবারের জন্য ব্যবসায় উদ্যোগ নেওয়াটা ছিল সহজতর ব্যাপার। এ পরিপ্রেক্ষিত থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরবর্তী সময়ে আহ্বান করলেন, “…ইহা (বাঙালিদের আত্মশক্তি অর্জন) করিতে গেলে ঘরে পরে দুঃখ ও বাধার অবধি থাকিবে নাÑসেজন্য অপরাজিত চিত্তে প্রস্তুত হইব; কিন্তু বিরোধকে বিলাসের সামগ্রী করিয়া তুলিব না। দেশের কাজ নেশার কাজ নহে; তাহা সংযমীর দ্বারা যোগীর দ্বারাই সাধ্য।” এ চিন্তা স্বদেশি আন্দোলনকারী প্রান্তিক বা অগঠিত মানুষের জন্য মেনে নেওয়া ছিল নিতান্ত কষ্টকর। কেননা তাদের হাতে তো আর জমিদারির উদ্বৃত্ত অর্থ ছিল না। তারা সারাটা জীবন সংযম করে কাটাবে, আর যাদের জমিদারির মতো উদ্বৃত্ত অর্থ ছিল তারা ব্রিটিশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ব্যবসায় উদ্যোগ গড়ে তুলবে।

কার্যত পুঁজিই ছিল ব্রিটিশ ভারতে বাঙালিদের ব্যবসায় উদ্যোগ গড়ে তোলার পেছনে প্রধান অন্তরায়। তারপরে আসে সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি। তাই বাঙালির কাছে গণদারিদ্র্য কাটিয়ে ওঠাই ছিল মুখ্য। আন্দোলন সংগ্রাম ছাড়া তার কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। রণদা প্রসাদ সাহা ছিলেন এ পরিপ্রেক্ষিতের মাঝে বেড়ে ওঠা একজন সফল ব্যবসায় উদ্যোক্তা। উন্নত মডেল। প্রথমে তিনি পুঁজি গঠন করেছেন। ব্যবসায় অংশীদার হয়েছেন। তারপর স্বাধীন বণিকে উত্তীর্ণ হয়েছেন। দিন দিন অনেক কিছুই অধিগ্রহণ করেন। বলা চলে, তিনি ওই ঔপনিবেশিক বাংলার গণদারিদ্র্যের যুগে শূন্য থেকে শেখরে ওঠার মন্ত্র-পথ দেখিয়েছেন।

গবেষক, শেয়ার বিজ

mshelleyjuÑgmail.com