কঙ্গো ও বঙ্গে নারী নিগ্রহ

অঞ্জন আচার্য: যৌন লালসা পুরো করেই নিজেকে স্বাধীন মনে করতো একশ্রেণির সৈনিক। রক্ষকই যেখানে ভক্ষক, সেখানে নিজের আব্রু বাঁচানোর জন্য কারই-বা দ্বারস্থ হবেন অসহায় নারীরা? রোজ রাতে সৈনিকরা রোডমার্চে বের হতো। যুদ্ধের জন্য নয়, বরং শিকারের জন্য। কীসের শিকার? নারী শিকার। চিত্রটি আফ্রিকার দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর। দেশটির মিনোভা অঞ্চল দখলের নির্দেশ দেওয়া হয় সেনাদের। অধিনায়ক আদেশ দেন, ‘যাও, নারীদের ধর্ষণ করো।’ তবে আগাম জানান দিয়েই শিকারে নেমে পড়ে বিকৃত মানসিকতার জওয়ানরা। সৈনিকরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে আগমনবার্তা পৌঁছে দেয়। তা শুনেই নিজের সম্ভ্রম রক্ষার শেষ চেষ্টায় জঙ্গল, ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে নারীরা। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। এক সৈনিকের ভাষ্য, ‘এটা সত্যি যে আমরা নারীদের ধর্ষণ করি। তাদের দেখি, ধরে নিয়ে যাই; তারপর যা খুশি করি। কখনও কখনও তাদের মেরে ফেলি। ধর্ষণের সময় স্বাধীনতার স্বাদ পাই আমরা।’

মিনোভায় এমন বহু নারীকে পাওয়া যাবে, যারা জওয়ানদের লালসার শিকার। আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথের গবেষণায় উঠে এসেছে, কঙ্গোয় প্রতিদিন এক হাজার ১৫২ নারী ধর্ষণের শিকার হয়। ২০০৩ সালেই কঙ্গোয় শেষ হয়ে গেছে গৃহযুদ্ধ। কিন্তু ধর্ষণ বন্ধ হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ১২ শতাংশ নারী অন্তত একবার ধর্ষিত হয়েছে। এ কারণে এরই মধ্যে ‘ধর্ষণের রাজধানী’ হিসেবে কুখ্যাতি পেয়েছে দেশটি।

কঙ্গোয় মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করেছেন পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্র-নির্মাতা ফিয়োনা লয়েদ ডেভিস। সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিতই তিনি সিএনএনে লিখছেন। সে লেখায়ই উঠে এসেছে কঙ্গোর নারীদের দুরবস্থার কথা। তিনি বলেন সেখানকার নারীরা এমনই দুরবস্থায় যে, বাড়িতে থাকলে না খেয়ে থাকতে হয়; কিন্তু খাবার বা কাজের সন্ধানে বের হলে শিকার হয় ধর্ষণের। সুইডেনের বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী মারগট ওয়ালস্ট্রম এক সময় জাতিসংঘ মহাসচিবের যৌন সহিংসতাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১০ সালে তিনি একবার কঙ্গো সফরে গিয়ে ফেরার পর সফরের বিস্তারিত নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করার সময় ওয়ালস্ট্রম বলেন, বিশ্বে ধর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো আফ্রিকার দেশ কঙ্গো। সেখানে নারীরা অব্যাহত যৌন নির্যাতনের শিকার। তবে এটা এ কারণে নয় যে, তাদের রক্ষাড পর্যাপ্ত আইন নেই। বরং আইন প্রয়োগের অভাবে এসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।

এবার এ বঙ্গের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা যাক। জাতীয় মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১২ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮৪ নারী, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩০ জনকে, গণধর্ষণের শিকার ২৬ জন। ২০১৩ সালে ধর্ষিত হয়েছে ১০৭ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৬ জনকে, গণধর্ষণের শিকার ৩৫ জন। ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার ১৫৩ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৮ জনকে, গণধর্ষণের শিকার ৮৬ জন। ২০১৫ সালে ধর্ষণের শিকার ১৩৪ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৮ জনকে, গণধর্ষণের শিকার ১০৩ জন। ২০১৬ সালে ধর্ষণের শিকার ১৪১ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জনকে, গণধর্ষণের শিকার ৭৭ জন। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার ২০০ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৬ জনকে আর গণধর্ষণের শিকার ৬৬ জন। এ-ছাড়া ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ১১৫, ২০১৫তে ১৪১, ২০১৬তে ১৫৮ ও ২০১৭-এর ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ১৯৯। এ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধর্ষণের ঘটনা কোনো বছর তুলনামূলক কম-বেশি হলেও গণধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৩২৫ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এদের মধ্যে ৪৮ শিশু গণধর্ষণের শিকার; ১৫ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ-ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৫৪ শিশুকে। অন্যদিকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে দুই শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

কেন এত ধর্ষণ? কঙ্গোয় যেমন নারীদের রক্ষায় অনেক আইন আছে; কিন্তু সেসবের প্রয়োগ নেই। তেমনই আমাদের দেশেও ধর্ষণবিরোধী আইন আছে; প্রয়োগ নেই। ফলে প্রায়ই ঘটছে ধর্ষণ ঘটনা। গৃহবধূ, শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কোলের শিশুকেও ধর্ষণ করা হচ্ছে। গত বছর গাজীপুরে ধর্ষণ করা হয়েছে আট মাসের শিশুকে।

বাংলাদেশে হাজারে মাত্র চার আসামি ধর্ষণ ঘটনায় সাজা পায়। পুলিশ সদর দফতরের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ৪৩ হাজার ৭০৬ মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার মামলায় এক লাখ আসামি খালাস পেয়েছে। আর ধর্ষণ মামলায় খালাস পেয়েছে ৮৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ আসামি। নারী নির্যাতন মামলায় খালাসের পরিমাণ ৯৫ শতাংশ। ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুলিশের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঁচ হাজার তিনটি ধর্ষণ মামলা হয়। এর মধ্যে রায় ঘোষণার হার তিন দশমিক ৬৬ শতাংশ আর সাজার হার শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, শান্তিরক্ষার নামে যে দেশেই গেছে, তারা সেখানে যথেচ্ছ যৌনাচারে লিপ্ত হয়েছে। কম্বোডিয়ায় শান্তিরক্ষীদের নামে এ অভিযোগ উঠলে জাতিসংঘের এক উপমহাসচিব মন্তব্য করেছিলেনÑ‘ছেলেপেলেরা এমন এক-আধটু করবেই।’ আমেরিকায় এক সিনেটর ধর্ষণের শিকার এমন মেয়েদের পরামর্শ দিয়েছিলেন ‘ধর্ষণ হলো বৃষ্টির মতো। অভিযোগ না করে উপভোগ করো!’ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছেÑএ অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রধান বলেছেন, ‘আমাদের সৈনিকরা কখনই রোহিঙ্গা মেয়েদের ধর্ষণ করবে না; কারণ ওইসব মেয়ে বড় নোংরা (ডার্টি)।’

ধর্ষণের একটি বড় কারণ রাজনৈতিক। এর এক বড় প্রমাণ যুদ্ধক্ষেত্র। পৃথিবীর তাবৎ যুদ্ধে দখলদার ও আক্রমণকারী বাহিনী দুর্বল প্রতিপক্ষের নারীদের ধর্ষণ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি নারীকে ধর্ষণ করে। এর মাধ্যমে সৈনিকরা যে শুধু যৌন চাহিদা পূরণ করেছে তা নয়, এর মাধ্যমে একটা জাতির মনোবল বিনষ্ট করার চেষ্টা করেছে তারা। পাকিস্তানের জেনারেল খাদিম হোসাইন রাজা তার লেখা ‘আ স্ট্রাঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ বইয়ে লিখেছেন, ‘নিয়াজি ধর্ষণ করার জন্য সেনাদের এত চাপ দিতেন যে, তা সামলে উঠতে না পেরে এক সেনা অফিসার আত্মহত্যা করে বসেন।’ কোনো কোনো মেয়েকে এক-দুবার নয়, এক রাতে ৭০-৮০ বারও ধর্ষণ করা হয়েছে।

ধর্ষণের দুটো দিক রয়েছে। একটি ব্যক্তিগত, অন্যটি সামাজিক। অধিকাংশ সমাজেই পুরুষ নিজেদের অধিক ক্ষমতাবান বলে ধরে নেয়। সেটা শারীরিক ও অর্থনৈতিক দুই অর্থেই। নারীর দেহের ওপর একরকম স্বাভাবিক অধিকার রয়েছে এমন বোধ সে শিশুকাল থেকেই দেখে আসছে সমাজে। অন্যদিকে পুরুষ হলে অপরাধ করে পার পাওয়া যায় এ সত্যটিও তার অতিপরিচিত। সে কারণে পুরুষের চোখে যৌন আগ্রাসন কোনো অপরাধ নয়, এটি যেন তার ক্ষমতার প্রকাশ।

সব ক্ষেত্রেই ধর্ষণের জন্য দোষ বর্তায় মেয়েদের ওপর। ‘এত রাতে বাইরে কেন, ছেলেদের সঙ্গে এত মেলামেশা কেন’ এমন নির্মম যুক্তি মেয়েদের হামেশাই শুনতে হয়। ২০১৬ সালে ধর্ষণ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ওই বছর ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ৫০ জনই অনূর্ধ্ব ছয় বছরের শিশু। আর ১৪৪ জন ৭-১২ বছরের। কোনো সমাজে যদি এরকম মনোভাবের মানুষ থাকে, তাহলে সে সমাজে ধর্ষকের বিচার না হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পুলিশের কাছে গেলেও একই কথা শুনতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে আবার ধর্ষণের শিকার নারীকে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করাতে হয় চারজন সাক্ষী। কী বিচিত্র!

তনুর কথা মনে আছে? না, নেই। রুপার কথা? না। ক্রিকেট, ঈদ ও চলমান রোহিঙ্গা ইস্যুতে সেটাও বিস্মৃত হয়ে গেছে। এভাবে আরও তনু ও রুপারা ধর্ষিত হবে। কিছুদিন আলোচনায় থাকার পর স্মৃতির অতলে বিলীন হয়ে যাবে। পারিবারিক সম্ভ্রমের অজুহাতে খুব কমই ধর্ষণের অভিযোগ পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষক পরিবারের সদস্যও এমন অপরাধ চেপে যায়। উদ্দেশ্য একটাই পুরুষতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণ। এছাড়া ধর্ষণের শিকার নারী মামলার পরও বিভিন্নভাবে ধর্ষিত হয়। ডাক্তারি পরীক্ষা থেকে শুরু করে নানা উপায়ে নারীকে বারবার প্রমাণ করতে হয়, সে ধর্ষিত। এ জন্যই দেখা যায় যত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তত মামলা হয় না। কারণ এ সমাজ যখন ধর্ষিতার দিকে আড়চোখে তাকায়, তখন তা চেপে না গিয়ে সেটার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাহস এত সহজ নয়Ñবলা যতটা সহজ। ‘ধর্ষণ’ অসুখটি আসলে পুরুষতান্ত্রিক অহমিকা বা ক্ষমতা কাঠামোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বলা যায় ‘বাই প্রডাক্ট’। তাই যৌনতার জন্য আসলে যতটা না ধর্ষণ হয়, তার অনেক বেশি হয় ক্ষমতাচর্চার জায়গা থেকে।

প্রাচীন ভারত, গ্রিস ও মিসরে ধর্ষণের জন্য নির্ধারিত শাস্তি ছিল পুরুষদের উপস্থচ্ছেদ বা ক্যাস্ট্রেশন। সোজা বাংলায় যাকে ‘খোজা’ করে দেওয়া বলে। এ প্রক্রিয়ায় পুরুষের যৌনক্ষমতা রহিত করা যায়। বর্তমানে বিশ্বের কিছু দেশে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে খোজা করাকে ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন নির্যাতনের জন্য সমতুল্য শাস্তি বিবেচনার ‘ঐচ্ছিক’ ব্যবস্থা রয়েছে। সেসব দেশে আমৃত্যু কারাদণ্ডের বদলে ধর্ষকদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে স্বেচ্ছায় উপস্থচ্ছেদের। ফলে তারা সমাজে বসবাসের জন্য আর বিপজ্জনক নয় এ বিবেচনায় মুক্তির সুযোগও দেওয়া হচ্ছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ক্যালিফোর্নিয়া ও ফ্লোরিডায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের জন্য শাস্তিপ্রাপ্ত একাধিক ব্যক্তি কারামুক্ত হয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ভাবা যেতে পারে না কি?

 

সাহিত্যিক ও গবেষক