কতটুকু বৈষম্য সহনীয়

রোল্যান্ড কুপার্স: মনে হচ্ছে সবারই আলোচনার বিষয় একই বৈষম্য। গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে একের পর এক নিবন্ধ প্রকাশ হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারাও বক্তব্য ও আলোচনায় অবধারিতভাবে এ বিষয়টি রাখছেন। তারপরও নেতারা এখন পর্যন্ত এমন কোনো উপায় স্থির করতে পারেননি যা দিয়ে বৈষম্যের আদর্শ পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। টমাস পিকেটি ও জোসেফ ই. স্টিগলিৎজের মতো অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য বিস্তর হিসাব-নিকাশ করে গবেষণার মাধ্যমে বৈষম্য ও নীতি-নির্ধারণের মধ্যে যৌক্তিক সম্পর্ক প্রমাণ করেছেন। তবু এ নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি।
বৈষম্যকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া কোনো কাজের কথা নয়। আবার মাত্রাতিরিক্ত বৈষম্য সমাজের গতিশীলতাকে বিঘিœত করে, তৈরি করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। স্টিগলিৎজ প্রায়ই একথা বলেন যে, বৈষম্যের আধিক্য অর্থনৈতিক অগ্রগতিকেও দুর্বল করে দেয়। তা সত্ত্বেও কিছুটা বৈষম্যের প্রয়োজন আছে বৈকি। যথাযথভাবে প্রণোদনা দেওয়া, যুক্তিসংগতভাবে ভালো কাজের পুরস্কার ও প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখার জন্য কিছু মাত্রায় বৈষম্যের প্রয়োজন। এজন্য ঠিক কতটুকু বৈষম্যকে ন্যায্য বলে অভিহিত করা যাবে, তা নির্ধারণ করা ও কাঙ্খিত মাত্রার বৈষম্য অর্জন করার জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টার প্রয়োজন।
কাক্সিক্ষত মাত্রা যা-ই হোক না কেন, সেটা যে বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ অংশে যে বিস্তর বৈষম্য বিরাজমান তারচেয়ে অনেক কমই হবে তা একেবারেই স্পষ্ট। তবুও বৈষম্য হ্রাসের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ বা এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা দূরে থাক, রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্নভাবে বৈষম্য বাড়িয়েই তুলছেন। এর পরিবর্তন একমাত্র তখনই ঘটবে যখন নীতিনির্ধারকেরা বৈষম্যের ব্যাপারটিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করবেন এবং বাস্তবমুখী ব্যবস্থা নেবেন।
এ প্রক্রিয়ায় শুরুতেই তাদের উচিত জিনি সূচককে (জিনি কোয়েফিসিয়েন্ট) আমলে নেওয়া। জিনি সূচক হলো কোনো দেশের আয় ও সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক মাপকাঠি। এটি শূন্য (সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন) থেকে শুরু করে এক (চূড়ান্ত বৈষম্যপূর্ণ) পর্যন্ত মাত্রার মধ্যে খুব সোজাসাপ্টাভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশের বৈষম্য তুলনা করার একটি পদ্ধতি। এ পদ্ধতিটি অবশ্য একেবারে নিখুঁত নয়। কারণ, একটি দেশের আয় ও সম্পদ বণ্টনকে একটি একক সংখ্যায় উপস্থাপন করতে গেলে কিছু গাণিতিক শর্টকাট মেনে নিতেই হয়। তবুও এ পদ্ধতিটি স্পষ্ট, সক্রিয় ও ব্যাপকভাবে গৃহীত।
কিন্তু জিনি সূচকও বিভিন্ন রকম হতে পারে। এটি নির্ভর করে কিসের পরিমাপ করা হচ্ছে তার ওপর আয় বৈষম্যের নাকি সম্পদের বৈষম্যের। এ দু’রকমের বৈষম্যের মধ্যে যথেষ্ট সম্পর্কও রয়েছে বটে। কারণ, আয় থেকেই সম্পদ হয়, ঠিক যেভাবে নদীর পানি গিয়ে জমা হয় হ্রদে। কিন্তু এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বেশিরভাগ সময়ই আয়ের চেয়ে সম্পদের ক্ষেত্রে বৈষম্য অনেক বেশি হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী জাপানে শূন্য দশমিক ৫৫ থেকে শুরু করে জিম্বাবুয়েতে শূন্য দশমিক ৮৫ পর্যন্ত সম্পদের বৈষম্য বিরাজমান (জিম্বাবুয়ের উপাত্তের মান নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন থাকতে পারে)। উন্নত বিশ্বে সম্পদের বৈষম্য বেশ প্রকট। ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে এ হার শূন্য দশমিক ৮। আবার আয়ারল্যান্ড, ইতালি ও স্পেনে সম্পদের বৈষম্য বেশ কমÑশূন্য দশমিক ৫৮।
অন্যদিকে আইসল্যান্ডে শূন্য দশমিক ২৫ থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকায় শূন্য দশমিক ৬৪ আয় বৈষম্য রয়েছে। অবশ্য করারোপের আগে ও পরে হিসাব করলে আবার এ সূচকের হারে পার্থক্য দেখা যাবে। প্রতিটি দেশই করারোপের মাধ্যমে কিছু আয়বণ্টন করে থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বেশি বৈষম্যের দেশগুলোতে করের অনুপাতে ব্যাপক ভিন্নতা দেখা যায়। এসব দেশে এখন আরও বেশি বণ্টনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পুনর্বণ্টনের হার অর্থাৎ করের অর্থ কোন কোন খাতে, কী অনুপাতে খরচ হচ্ছে তা অবশ্য পুরোপুরি নীতি-নির্ধারণের ফল। সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক অনেক ফ্যাক্টরও পুনর্বণ্টনের পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে থাকে।
মোদ্দাকথা হলো, অন্তহীন তুলনা বা গাণিতিক রহস্যের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং এ ব্যাপারটি তুলে ধরতে চাই যে, বৈষম্য বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে বাস্তব পরিমাণনির্ভর ও অর্থপূর্ণ আলোচনা করা সম্ভব এবং এটি জরুরিও বটে। যদি লক্ষ্য নির্ধারণটা সঠিকভাবে করা যায়, তাহলে বৈষম্যের সঠিক মাত্রাবিষয়ক আলোচনাও যথাযথভাবে এগোবে।
বর্তমানে বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে যে, বাস্তবে যতটা বৈষম্য বিরাজ করছে তার চেয়ে কম বৈষম্য রয়েছে বলে মানুষেরা বিশ্বাস করতে চায়। কিন্তু যতটুকু বৈষম্য সম্পর্কে তারা অবগত তাও তাদের মাপকাঠিতে অনেক বেশি বলে বিবেচিত হচ্ছে। বেশিরভাগ দেশে এটিই সত্য এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও যেখানে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য বিরাজ করছে। অবশ্য নরওয়ের মতো এমন কিছু দেশও আছে যেখানকার মানুষের মধ্যে আরও বাস্তবমুখী ধারণা আছে। মানুষের মধ্যে এ ভুল ধারণাগুলো বদলাতে পারলে পুনর্বণ্টন নীতি সম্পর্কে তাদের চিন্তাভাবনাও বদলে যাবে।
উপরন্তু, বৈষম্যবিষয়ক আলোচনায় অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ব্যাপারও আসা উচিত। মনে রাখা দরকার, বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদই মনে করেন যে, অনেকে যাকে বৈষম্যের আদর্শ পরিমাণ বলে ভাবেন, তাতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন হার নির্ধারণ করা হলে তা সবার জন্যই ক্ষতিকারক হবে। সুতরাং, এরকম জটিল বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদেরকে নাগরিকদের প্রত্যাশা ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের মধ্যে সুষম সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য যেহেতু থাকবেই (থাকা উচিতও) সেহেতু নাগরিকদেরও কিছু বক্তব্য থাকবে।
বৈষম্য কখনই কোনো অর্থনীতির অপরিহার্য বা অনিয়ন্ত্রণযোগ্য উপাদান নয়। এটি পুরোপুরি নীতি নির্ধারণসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাপার। বৈষম্য যদি প্রকট আকার ধারণ করে, তাহলে প্রচলিত নীতি পরিবর্তন করা উপযুক্ত নীতি গ্রহণ করাই নেতাদের দায়িত্ব।

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড্ স্টাডিজ
আমস্টারডাম

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট হতে ভাষান্তর
শামসুন নাহার রাখী