কফি আনানের প্রয়াণে আমরাও শোকাহত

মানবতা ও নিপীড়িতের স্বজন, জাতিসংঘের দুই মেয়াদের মহাসচিব, শান্তিতে নোবেলজয়ী কফি আনানের প্রয়াণে বিশ্বের শান্তিকামী জনতার সঙ্গে আমরাও শোকাহত।
১৯৩৮ সালে ঘানায় জন্ম নেওয়া কফি আনান প্রথম আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে জাতিসংঘের মহাসচিব হন। জাতিসংঘের সঙ্গে চার দশক কাজ করেছেন। বিশ্ব সংস্থাটির কর্মীদের মধ্যে তিনিই প্রথম মহাসচিব হন। প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ মহাসচিব তিনি। জাতিসংঘকে রাষ্ট্রপুঞ্জের সংগঠন নয়, জনগণের সংগঠনে পরিণত করতে কাজ করেছেন জনাব আনান। জাতিসংঘের ভূমিকায় সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। তবে এর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই দায়িত্ব শেষ করেননি, সর্বাত্মক চেষ্টাও চালিয়েছেন সেজন্য। হয়তো সফল হননি; কিন্তু দায়িত্বে থেকে কাজটি শুরুর কৃতিত্ব তারই। এতে বিশ্বমোড়ল, বিশেষত নিরাপত্তা পরিষদ সদস্যদের পাশে পাননি তিনি। আত্মজীবনী ‘ইন্টারভেনশন: আ লাইফ ইন ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এ তিনি লিখেছেন, জাতিসংঘকে এমনভাবে গড়তে চেয়েছি, যাতে বিশ্ব সংস্থাটি কেবল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নয়; জনগণের স্বার্থও দেখবে।
১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকে মানবাধিকার রক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেন কফি আনান। নানা ধরনের নিপীড়ন থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় জাতিসংঘকে শক্ত ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। মানবাধিকার রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। রুয়ান্ডায় গণহত্যা ও মুসলিমদের ওপর সার্ব গণহত্যা রোধে তার উদ্যোগ বৈশ্বিক চিন্তাধারাকে নতুন আকার দেয়। বিশ্ব মানবাধিকার রক্ষায় সামনে থেকে নেতৃত্বদানের জন্য ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তাকে। ওই বছরই বাংলাদেশ সফর করেন। মহাসচিব হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে অবশ্য কিছুটা অনুজ্জ্বল ছিলেন। বিশ্বমোড়লদের অসহযোগিতা তার দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করে বলেই ধারণা। জাতিসংঘকে চাঁদা কমিয়ে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপরও মানবাধিকার রক্ষায় তার অবদান চিরস্মরণীয়।
অবসরের পরও কিন্তু নিভৃতে চলে যাননি কফি আনান। মানবতার সেবাকে যিনি অভ্যাসে পরিণত করেছেন, তিনি তো বসে থাকতে পারেন না। নিপীড়িতের পাশে থাকতে গঠন করেন কফি আনান ফাউন্ডেশন। বিশ্বের যেখানে মানবতা বিপন্ন হয়েছে, সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি ও তার সংগঠন। শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় জীবনভর সংগ্রাম করেছেন তিনি। গভীর সমবেদনা দিয়ে হƒদয় ছুঁয়েছেন বহু মানুষের। মহাসচিবের দায়িত্ব ছাড়ার পর সিরিয়া সংঘাতের সমাধান খুঁজতে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিশ্বনেতাদের গ্রুপ ‘দি এলডারস’ প্রতিষ্ঠা হলে এর সদস্য হন কফি আনান। ২০১৩ সালে ওই গ্রুপের চেয়ারম্যান হন তিনি। কফি আনান রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমার সরকার গঠিত কমিশনের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ‘আনান কমিশন’ নামে পরিচিতি পাওয়া ওই কমিশন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৮৮টি সুপারিশ করে। গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গার নিরাপদ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনে আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বনেতারা বরাবরই বলে আসছেন, রাখাইন সমস্যার সমাধানে আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নই যথেষ্ট।
মানুষের জন্য কিছু করতে পেরে আত্মতৃপ্তিতে ভুগতেন না কখনও; এ কাজে ক্লান্তিও ছিল না জনাব আনানের। তার বড় সাফল্য হলো, দুর্বল ও দরিদ্র দেশগুলোর মানুষের মন জয় করেছেন। বাংলাদেশের মানুষেরও প্রিয় ছিলেন তিনি। মানবাধিকার, শান্তি রক্ষা ও স্থিতিশীলতা আনয়নে ভূমিকার জন্য বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের কাছে নমস্য হয়ে থাকবেন কফি আনান।